দুই শিশু হত্যার ঘটনায় মামলা

স্ত্রী পপীর বিচার চান বিপ্লব

রাজধানীর গোড়ানে নিজের দুই শিশুসন্তানকে খুনের ঘটনায় আখতারুন্নেসা পপীর ফাঁসি চেয়েছেন স্বামী মোজাম্মেল হোসেন বিপ্লব। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি চাই এমন নিষ্ঠুর মায়ের যেন ফাঁসি হয়। আর কোনো সন্তানকে যেন এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হতে না হয়। আমার বড় মেয়ে মেহেজাবিন আলফি সব সময় আমার পক্ষে থাকত। আমি অভাবের মধ্যেও যে টাকা দিতাম সেই টাকাতেই তার মাকে সন্তুষ্ট থাকার কথা বলত।’

তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল মেয়েদের বিসিএস ক্যাডার বানাব। আমার দুই মেয়েই মেধাবী ছিল। তারা ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ত। ছোট মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস প্রথম শ্রেণিতে পড়ত। ক্লাসে প্রথম ছিল সে। আর বড় মেয়ে মেহেজাবিন আলফি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। সে ক্লাসে তৃতীয় ছিল।’

গত শনিবার সকালে রাজধানীর খিলগাঁও দক্ষিণ গোড়ানে মোল্লা ভবনের চতুর্থ তলার এক ফ্ল্যাট থেকে মেহেজাবিন আলফি (১২) ও জান্নাতুল ফেরদৌস (৭) নামের দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই সঙ্গে শিশু দুটির মা আখতারুন্নেসা পপীকে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাট থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে। নোট ও পপীর স্বামী মোজাম্মেল হক বিপ্লবের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে পুলিশের ধারণা, আর্থিক অনটন থেকে দাম্পত্যকলহের জেরে দুই মেয়েকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন পপী।

এ ঘটনায় শিশুদের মা পপীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বাবা বিপ্লব। গত শনিবার রাতে মোজাম্মেল হক বিপ্লব বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে দাম্পত্যকলহকে দায়ী করেছেন শিশুদের বাবা মোজাম্মেল হোসেন বিপ্লব। বিপ্লব সব টাকা মা-বাবার পেছনে খরচ করে স্ত্রী পপীর এমন সন্দেহ থেকেই তাদের দাম্পত্যকলহের সূত্রপাত। এ ছাড়া আর্থিক অনটনের কারণে ঢাকায় না থেকে গ্রামের বাড়িতে যেতে বলায় ক্ষিপ্ত হন স্ত্রী পপী।

খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শনিবার রাতে মোজাম্মেল হোসেন বিপ্লব বাদী হয়ে শিশু দুটির মা আখতারুন্নেসা পপীকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। মামলার পরপরই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পপীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’

মামলার এজাহারে মোজাম্মেল হোসেন বিপ্লব উল্লেখ করেন, “আমার স্ত্রী পপীর ধারণা আমি আমার সমস্ত টাকাপয়সা শ্রীনগরে মা-বাবা-ভাই-বোনদের পেছনে খরচ করি। আমাদের ব্যবসায়িক কারণে ৪০ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছি। আমি ২২ লাখ টাকা মূল্যের একটি জমি ক্রয় করি। কিন্তু টাকা পরিশোধ হওয়ার পরও জমির মালিক আমাকে জমি রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছে না। ফলে আমার স্ত্রী মনে করে সকল টাকা আমি আমার মা-বাবা-ভাই-বোনদের পেছনে খরচ করি। এই সমস্ত বিষয় নিয়ে আমাদের দাম্পত্যজীবনে প্রায় সময়ই ঝগড়াবিবাদ লেগে থাকত। বর্তমানে আমার ব্যবসার অবস্থা ভালো না থাকায় টানাপড়েনের মধ্যে ছিলাম। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সর্বশেষ বাসায় আসি। পরদিন শনিবার আমি ব্যবসার কাজে গ্রামের বাড়ি চলে যাই। এরপর গত ৬ মার্চ রাত আনুমানিক ৯টার সময় আমার স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় সাংসারিক আলোচনার একপর্যায়ে বলেছিলাম আমার ব্যবসার অবস্থা ভালো না। তুমি মেয়েদের নিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়ি শ্রীনগরে চলে আসো। কিন্তু সে আমাকে জানায় ঢাকায় থাকতে চাই। এরপর ৭ মার্চ সকাল আনুমানিক ১০টার সময় আমার শ্বশুর আবু তালেব আমার মোবাইল নম্বরে ফোন করে বলে, ‘তোমার বাচ্চা দুইটা আর জীবিত নাই, আমার মেয়ে পপী জবাই করে মেরে ফেলেছে এবং তার নিজের শরীরেও আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেছে।’ এই সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা চলে আসি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আমার মেয়েদের লাশ দেখে শনাক্ত করি। রমিজ ব্যাপারী ও আমার মা সেলিনাসহ লাশ দেখে বিভিন্নভাবে জানতে পারি যে, আমার খিলগাঁও থানাধীন ৩৯৭ নম্বর বাসায় গত ৬ মার্চ রাত আনুমানিক ১১টা ৫৯ মিনিট থেকে ৭ মার্চ সকাল ৯টার মধ্যে যেকোনো সময় স্ত্রী পপী আমার দুই সন্তানকে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে আগুনে ঝলসে দিয়েছে। পরে সে নিজেও শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে থানা-পুলিশ আমার বাসায় গিয়ে দুই মেয়ের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। আমার স্ত্রী আমাদের পারিবারিক কলহের কারণে দুই সন্তানকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।”