করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসায় সরকার দেশজুড়ে আইসোলেশন ইউনিট খোলার কাজ শুরু করেছে। ঢাকায় চারটি হাসপাতালকে চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এগুলো হলো মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। এ ছাড়া রাজধানীর সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকেও ইউনিট খুলতে বলা হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ইউনিট খোলার কাজ শুরু করেছেন সিভিল সার্জনরা। এমনকি রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও তাদের শয্যা অনুপাতে আইসোলেশন ইউনিট খুলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) দেশব্যাপী হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুতির তথ্য জানিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীর ৬টি হাসপাতালে ৪০০ শয্যা, চট্টগ্রাম মহানগরীতে দুটি হাসপাতালে ১৫০ শয্যা, সিলেট মহানগরীতে দুটি হাসপাতালে ২০০ শয্যা, বরিশাল মহানগরীতে দুটি হাসপাতালে ৪০০ শয্যা এবং রংপুর মহানগরীতে দুটি হাসপাতালে ২০০ শয্যা কভিড-১৯ সংক্রমিত ব্যক্তিদের আইসোলেশনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এসব আইসোলেশন ইউনিটের ব্যাপারে গতকাল কয়েকটি জেলার সিভিল সার্জন, রাজধানীর কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের পরিচালক ও বেসরকারি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তারা জানান, এখনো সব জেলায় ইউনিট খোলা হয়নি। কিছু জেলায় খোলা হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। রোগীর চিকিৎসায় চিকিৎসক, নার্স ও ডায়াগনসিস টেকনোলজিস্টদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পোশাক, মাস্ক ও গ্লাভস এখনো পৌঁছেনি। বিশেষ করে জেলাগুলোতে রোগীদের নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা থাকলেও জটিল রোগীদের চিকিৎসার ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেই।
সিভিল সার্জনরা জানিয়েছেন আইসিইউ নেই, ভেন্টিলেটর নেই, এমনকি ওই আইসোলেশন ওয়ার্ডে পরীক্ষার জন্য অন্যান্য যন্ত্রপাতিও নেই। পরীক্ষা করাতে হলে এসব রোগীকে কক্ষের বাইরে ডায়াগনসিস কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে এসব রোগী থেকে ভাইরাস অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জেলার সিভিল সার্জনরা মনে করছেন, সাধারণ চিকিৎসা তারা দেবেন। জটিল হলে রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হবে।
এমনকি জেলাগুলোতে করোনা রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের কাজও এখনো শুরু হয়নি বলে অনেক সিভিল সার্জন জানিয়েছেন। এদিকে রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর করোনা রোগীর চিকিৎসায় আইসোলেশন ইউনিট খোলার ব্যাপারে কোনো প্রস্তুতির কথা জানা যায়নি। বেসরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা রোগী পেলে সরকার নির্ধারিত ঢাকার হাসপাতালগুলোতে পাঠিয়ে দেবেন। কারণ একই
হাসপাতালে করোনা রোগী রাখলে তাদের ওখানে অন্য রোগীদের সেবা বিঘিœত হতে পারে। এমনকি তারা এ ধরনের ইউনিটে জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও লোকবল স্বল্পতার কথাও জানিয়েছেন।
এমনকি ঢাকার দুটি সরকারি হাসপাতালেও গতকাল পর্যন্ত আইসোলেশন ইউনিট খোলা হয়নি বলে হাসপাতাল পরিচালকরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে একটি হাসপাতালে ওয়ার্ড তৈরির প্রস্তুতি চলছে। অন্য হাসপাতালটি খুলবে কি না, তা এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেছেন, এমনিতেই তারা তাদের রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। তার ওপর এ ধরনের উচ্চমাত্রার সংক্রমণের রোগীর চিকিৎসা দিতে গেলে পাছে অন্য রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে কি না এবং হাসপাতালের রোগীদের সেবা বিঘিত হয় কি না, তা তারা ভাবছেন। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিছু প্রস্তুতি এখনো অসম্পন্ন। কাজ চলছে। আশা করছি শিগগির পুরো প্রস্তুতি শেষ করতে পারব।
মহাপরিচালক বলেন, মেডিকেল কলেজগুলোতে আইসিইউ আছে। তবে সব আইসিইউ আমরা করোনার রোগীদের জন্য রাখতে পারছি না। কারণ অন্য রোগীদের দিকটিও দেখতে হচ্ছে। ঢাকার বাইরে যেসব এলাকায় আইসিইউ সুবিধা নেই বা প্রয়োজনমতো পাওয়া যাবে না সেখানকার রোগীদের আমরা ঢাকায় বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে আসব। তবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তামূলক পোশাক, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মতো উপকরণগুলো যে যে এলাকা থেকে চাওয়া হয়েছে, আমরা দ্রুত সেখানে পাঠিয়ে দিচ্ছি। যদি সংকট পড়ে যায় সে ক্ষেত্রে আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তা নিতে পারব। সংস্থাটি আমাদের এ ব্যাপারে আশ্বাসও দিয়েছে।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, চিকিৎসার নীতিমালা তৈরি করা এবং সারা দেশে চিকিৎসকদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সেই নীতিমালা সম্পর্কে জানানোসহ যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী সব করা হচ্ছে।
অবশ্য ঢাকার বাইরে আইসোলেশন ইউনিট খোলার কথা জানিয়েছেন অধিকাংশ সিভিল সার্জন। এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর জেলার সিভিল সার্জন ডা. আবদুল গাফ্ফার দেশ রূপান্তরকে জানান, সেখানে ১০০ শয্যার ইউনিট খোলা হয়েছে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ৪০ শয্যা এবং রায়পুরসহ আরও তিনটি জায়গায় ২০টি শয্যা খোলা হয়েছে। তবে করোনা রোগীর চিকিৎসা ও চিকিৎসক-নার্সদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো প্রশিক্ষণ এখনো পাননি। আগামীকাল শনিবার থেকে তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে বলে ঢাকা থেকে জানানো হয়েছে।
এই সিভিল সার্জন বলেন, আমরা সাধারণ সর্দি-জ্বরের চিকিৎসা দিতে পারব। রোগী জটিল হলে ঢাকায় পাঠাব। এখানে আইসিইউ নেই। ভেন্টিলেটর নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, সেখানে ১৯ শয্যার ইউনিট খোলা হয়েছে। তবে সেখানে কেবল আইসোলেট করে রাখা যাবে ও সাধারণ চিকিৎসা সম্ভব। শনিবার থেকে তাদের প্রশিক্ষণ রয়েছে ঢাকায়। তবে এখনো তারা সুরক্ষা পোশাক, গ্লাভস ও মাস্ক পাননি। এর বেশি কোনো নির্দেশনা তারা পাননি। রোগী জটিল হলে তিনি ঢাকায় পাঠাবেন বলে জানান। এই সিভিল সার্জন বলেন, আমরা এখনো করোনা সচেতনতার কোনো লিফলেট পাইনি। ঢাকা থেকে বলেছে দেবে।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. হুসেইন শাফায়েত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১০টা বেড প্রস্তুত আছে। এখনো মাস্ক-সুরক্ষা পোশাক কিছুই পাইনি। তা ছাড়া আইসোলেশন করে রাখতেও খাওয়া-দাওয়া অনেক কিছুই লাগবে। রোগী পাওয়া গেলে হাসপাতালের রোগী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় কি না, সেটা নিয়েও ভাবছি। নিজের সেফটি, রোগীর সেফটি সেটা নিয়েও ভাবতে হবে।
রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. হিরঙ্গ কুমার রায় জানান, ২০০ শয্যার একটি শিশু হাসপাতাল রয়েছে। এখনো চালু হয়নি। সেখানে আইসোলেশন ইউনিট খোলা হবে। যন্ত্রপাতি নেই। শুধু রাখা যাবে। সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া যাবে। জটিল হলে ঢাকায় পাঠাব। এখনো সুরক্ষা পোশাক, গ্লাভস ও মাস্ক পাইনি। বিশেষ প্রশিক্ষণও নেই। এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল (বিএসএমএমইউ) কর্র্তৃপক্ষ এখনো আইসোলেশন ইউনিট খোলেনি এবং খোলার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছেন বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়য়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো করা হয়নি। যে পরিস্থিতি, তাতে এ ধরনের রোগীরা এলে হাসপাতালের অন্য রোগীরা ভয় পায় কি না, সেটা ভাবছি। এর আগে এক মন্ত্রীর চিকিৎসার ব্যাপারে গুজব উঠলে হাসপাতালের রোগীরা ভয় পেয়েছিল ও পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। এখানে দেড় হাজার রোগী। তাদের সেবা নিশ্চিত করাটা আমাদের দায়িত্ব। তাদের সেবা বিঘিœত করা উচিত হবে না।
এই উপাচার্য বলেন, আমাদেরও বলা হয়েছে সে রকম পরিস্থিতি তৈরি না হলে দরকার নেই। সরকার ঢাকায় যে হাসপাতালগুলোকে তৈরি করে রেখেছে, সেখানে না হলে আমরা দেখব। আমাদের প্রথম দায়িত্ব নিজেদের রোগী সেফ করা।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের একটা আলাদা ভবন হচ্ছে। পিডব্লিউডি কাজ করছে। সেখানে ২০ শয্যার পৃথক আইসোলেশন ইউনিট করা হবে। আশা করছি সাত দিনের মধ্যেই করতে পারব। তবে আমরা বহির্বিভাগে সর্দি-কাশি-জ্বরের রোগীদের জন্য আলাদা কাউন্টার করেছি। সেখানে তাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কারও মধ্যে করোনা সন্দেহ হলে তাকে সরকার যে পাঁচটি হাসপাতাল করেছে, সেখানে পাঠিয়ে দেব।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, আইসোলেশন মানে করোনা রোগীদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আইসোলেট করে রাখা। এর জন্য আলাদা এরিয়া হবে। সেখান থেকে যেন অন্যরা সংক্রমিত হতে না পারে, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। এ ধরনের ইউনিটে যেসব চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টরা কাজ করবেন, তাদের জন্য সুরক্ষা পোশাক, মাস্ক ও গ্লাভস লাগবে। সাধারণ ডায়াগনসিসের জন্যও আলাদা যন্ত্রপাতি লাগবে। কারণ করোনা রোগীকে পরীক্ষার জন্য সেখান থেকে বের করা যাবে না। ওই রোগী সেখানেই কফ-থুতু ফেলবে। সম্পূর্ণ আইসোলেট রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের বিশেষ প্রশিক্ষণের দরকার।
অন্যদিকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুর্শেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইসোলেশন ইউনিট খোলার জন্য কোনো চিঠি পাইনি। তবে কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন, এমন একটি সভায় ছিলাম। সেখানে প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। চারটি হাসপাতাল প্রস্তুত রেখেছে সরকার। আমাদের এখানে রোগী এলে ওখানে পাঠিয়ে দেব। আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম একটা নির্দিষ্ট হাসপাতালে আইসোলেট করে রাখলে ভালো হয়। আমাদের এখানে যে রোগী, করোনা রোগী এলে তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে পারে। চিকিৎসায় বিঘœ ঘটতে পারে। তা ছাড়া আইসোলেশন মানে সব আয়োজন রাখা। সেটা না হলে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
এ ছাড়া গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা কোনো চিঠি বা নির্দেশনা পাননি। পেলেও তাদের পক্ষে সম্ভব কি না, তা নিয়ে তারা চিন্তিত। কারণ অন্য রোগীদের সেবায় বিঘœ ঘটতে পারে। তাদের ওখানে রোগী এলে তারা সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবেন।