কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ

মাঝরাতে দরজা ভেঙে সাংবাদিক শায়েস্তা!

কুড়িগ্রামে জেলা প্রশাসকের সমালোচনা করে সংবাদ প্রকাশের ১০ মাস পর মাদক রাখার অভিযোগে স্থানীয় এক সাংবাদিককে গভীর রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। দণ্ড পাওয়া আরিফুল ইসলাম রিগান বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি। তাকে কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। আরিফুলকে গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে কুড়িগ্রাম শহরের চড়–য়াপাড়ার বাড়ি থেকে আটকের পর সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো  হয়। মাদকবিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযানে মাদকসহ আরিফুলকে আটক করা হয় বলে দাবি করেছেন ‘অভিযান’ পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা।

তবে আরিফুলের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতু বলছেন, মধ্যরাতে বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে আরিফকে বেধড়ক পেটানোর পর জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তার কাছে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি। আর জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন সরকারি টাকায় সংস্কার করা একটি পুকুরের নাম তার নিজের নামে নামকরণ করেছিলেন। আরিফুল তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এ ছাড়া সম্প্রতি একটি নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন আরিফুল। এসবই তার জন্য কাল হয়েছে।

সাংবাদিক আরিফুলের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতু শুক্রবার রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘রাতে ঘুমানোর আয়োজন চলছে, সেই সময়ে দরজায় আঘাত। কে ডাকছে, এ প্রশ্নে কোনো সাড়া নেই। সন্দেহ তাই বাড়ে। আরিফুল থানার ওসিকে যখন ফোন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তখনই হুড়মুড় করে দরজা ভেঙে সাত-আটজনের একটি দল ঢুকে পড়ে। তাদের মধ্যে তিনজন জাপটে ধরে আরিফুলকে পেটাতে থাকে। আমাকেও মারার উপক্রম করে, গালিগালাজ চলতে থাকে। একজন আরিফুলকে বলে, তুই খুব জ্বালাচ্ছিস।’

মোস্তারিমা বলেন, অভিযানে অন্তত ৪০ জন ছিলেন। পরে গতকাল শনিবার জেলা প্রশাসকের অফিসে তাদের ডাকা হয়। পরিবারের কয়েকজনকে সঙ্গে করে নিয়ে যান তিনি। মোস্তারিমার অভিযোগ, সেখানে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার নাজিমউদ্দিন বলেন, ‘পানিতে থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করবেন না।’

অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ, আনসার ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ অভিযানের সময় তার বাড়ি থেকে ৪৫০ এমএল দেশি মদ ও ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে দোষ স্বীকার করায় তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।’

সংবাদ প্রকাশের জেরে ভ্রাম্যমাণ আদালত সাংবাদিক আরিফুলকে দণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে উল্লেখ করে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীনের বক্তব্য জানতে চান এই প্রতিবেদক। এর জবাবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপনারা আমাকে চেনেন, আমি কী ধরনের মানুষ। একটি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ওই সাংবাদিকের জেল হয়েছে। নিউজ প্রকাশের সঙ্গে ওই অভিযানের কোনো সম্পর্ক নাই।’

অভিযানের ব্যাপারে জানতে চাইলে কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য আমার কাছে নিয়মিত পুলিশ ফোর্স চাওয়া হয়। গতকাল (শুক্রবার) রাতেও তারা লিখিতভাবে চেয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। সেখানে কী হয়েছে তা আমার জানা নাই।’

জেলা প্রশাসক ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য : সাংবাদিক আরিফুলের বাড়িতে অভিযান নিয়ে একটি গণমাধ্যমকে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন বলেন, ‘অ্যাজ ইউজুয়াল টাস্কফোর্স অভিযানে গেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আমার একজন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের কয়েকজন ফোর্স, ব্যাটালিয়ন আনসারের পাঁচজন আর মাদকদ্রব্যের তিনজন ছিলেন। তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই অভিযান হয়। মাদকদ্রব্যই আমাদের কাছে ম্যাজিস্ট্রেট চেয়েছিল।’

তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কুড়িগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবু জাফর ওই গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি এলাকায় ছিলেন না। গতকাল শনিবার দুপুরে তার কার্যালয়ের পরিদর্শক জাহিদ তাকে জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের অভিযানের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়।

আবু জাফরের এই বক্তব্য জেলা প্রশাসককে জানানো হলে তখন তিনি বলেন, ‘মাদকদ্রব্য কার্যালয়ের পক্ষ থেকেই চাওয়া হয়েছিল। তারপর এরা (ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা) বলেছে যে যাওয়া যাবে। অবশ্য আমি তো কাল ছিলামও না, আমি রৌমারীতে ছিলাম।’

কুড়িগ্রাম শহরের একটি সরকারি পুকুর সংস্কারের পর জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন নিজের নামানুসারে ‘সুলতানা সরোবর’ নামকরণ করতে চেয়েছিলেন উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউনে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন আরিফুল ইসলাম। গত বছরের ১৯ মে ‘কাবিখা’র টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসির নামে নামকরণ! শিরোনামে ওই সংবাদটি প্রকাশ হয় বাংলা ট্রিবিউনে। তবে শেষ পর্যন্ত পুকুরটির সেই নামকরণ করা হয়নি।

খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার কুড়িগ্রামে : সাংবাদিক আরিফুলকে দণ্ড দেওয়ার ঘটনা খতিয়ে দেখতে কুড়িগ্রামে গিয়েছেন রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, তারা  বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য রংপুর বিভাগের কমিশনারকে বলেছেন। আজকালের মধ্যে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বিভাগীয় কমিশনারকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। সেখান থেকে অতিরিক্ত কমিশনারকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। আরিফুলকে আটকের প্রতিবাদে বিক্ষোভ : মধ্যরাতে সাংবাদিক আরিফুলকে আটক করে দণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে কুড়িগ্রামে। গতকাল শনিবার দুপুরে শহরের শাপলা চত্বরে মানববন্ধন করেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। এতে নানা শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষও অংশ নেন।

মানববন্ধন শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য দেন প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বিপ্লব, সাংবাদিক রাজু মোস্তাফিজ, হুমায়ুন কবির সূর্য, ছানালাল বকসী, শ্যামল ভৌমিক, দুলাল বোস প্রমুখ।

বিএফইউজে ও ডিইউজের প্রতিবাদ : দেশব্যাপী সাংবাদিক সমাজের ওপর অব্যাহত হামলা-মামলা ও হয়রানি-নির্যাতনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)। গতকাল শনিবার বিএফইউজের সভাপতি মোল্লা জালাল ও মহাসচিব শাবান মাহমুদ এবং ডিইউজে সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু এক যৌথ বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সংগঠন দুটি বলেছে, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ও রিপোর্টার আল-আমীনের মামলা সাংবাদিক সমাজের কাছে কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া সর্বশেষ কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে মধ্যরাতে বাসভবন থেকে একটি মহল তুলে নিয়ে যাওয়ায় সাংবাদিকদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।

বিবৃতিতে বিএফইউজে ও ডিইউজের নেতারা বলেন, ‘মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে কারও নাম না থাকলেও মানবজমিন সম্পাদক ও রিপোর্টারের বিরুদ্ধে মামলা বাক-স্বাধীনতা তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের শামিল। এ ছাড়া বেশ কয়েক দিন যাবৎ সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল নিখোঁজ থাকলেও তার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো বক্তব্য না পাওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সাংবাদিক সমাজ। এসব ঘটনার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে সাংবাদিক সমাজের দ্বন্দ্ব তৈরি করার অপচেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট মহলগুলো।