ফ্রান্সে সাঁতারু আরিফুলের বন্দি জীবন

ইউরোপের যে ক’টি দেশে করোনাভাইরাসে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তার অন্যতম ফ্রান্স। গতকাল পর্যন্ত সে দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬৬৩৩ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। ফ্রান্সের যে শহরে প্রথম করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয় মাসখানেক আগে, সেই রুয়া এখন বলতে গেলে মৃত্যুপুরী। পথঘাট-দোকানপাট জনশূন্য। পথে, পাবলিক বাহনে নেই প্রাণের স্পন্দন। সেই মৃত্যুপুরীতেই বন্দি জীবন কাটছে বাংলাদেশের সাঁতারু আরিফুল ইসলামের। ২০২০ টোকিও অলিম্পিকের স্কলারশিপ নিয়ে গত দেড় বছর ধরে রুয়ার ক্লাব দ্য ফাইকিং সাঁতার কমপ্লেক্সে নিজেকে প্রস্তুত করছেন আরিফুল। মাঝখানে এসে অংশ নিয়েছেন নেপালের ১৩তম এসএ গেমসে। এই ব্রেস্টস্ট্রোক সাঁতারু দেশের জন্য জিতেছেন দুটি রৌপ্য এবং একটি ব্রোঞ্জ। ফ্রান্সে গত ১০ মার্চে বন্ধ হয়ে যায় আরিফুলদের অনুশীলন। এরপর থেকেই তাকে কাটাতে হচ্ছে বন্দি জীবন। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়াই নিষিদ্ধ। দেশেও ফেরার সুযোগ নেই ঢাকার সঙ্গে প্যারিসের সব ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক জেঁকে বসেছে আরিফুলের মনে।

কাল সকালে আরিফুলের সঙ্গে দেশ রূপান্তরের কথা হয় দীর্ঘক্ষণ। অনুশীলন নেই বলে ঘরে তার সময় কাটে ঘুমিয়ে আর মুঠোফোনে দেশে থাকা পরিজনদের সঙ্গে কথা বলে। ‘অনুশীলনের দিনগুলোতে খুব ভোরে উঠতে হতো। এখন ঘুম থেকে উঠি সকাল ১০টায়। কী করব কোনো কাজ তো নেই’, শুরুতে এভাবেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন গত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ছয়টি স্বর্ণপদক জেতা আরিফুল, ‘ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ। আর যাবই বা কোথায়। কোথাও তো কোনো মানুষ নেই। সবার মধ্যে করোনা আতঙ্ক। এখানে অনেক বাংলাদেশি বসবাস করেন। প্রতি রবিবার তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম। এই রবিবার সেটাও সম্ভব হয়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে বেরুনো ছাড়া আমাকে ঘরেই থাকতে হচ্ছে।’

ছেলেকে ভিনদেশি উন্নত প্রশিক্ষণে পাঠানো কিশোরগঞ্জের নিকলিতে থাকা আরিফুলের বাবা-মা’র জন্য ছিল গর্বের। এখন সেই ছেলেকে নিয়ে তাদের উদ্বেগের শেষ নেই, ‘মা-বাবা প্রতিদিনই বলেন যেভাবেই হোক চলে আসতে। কিন্তু ফ্লাইট তো বন্ধ। বাংলাদেশ গেমস খেলতে ৩১ মার্চ দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সেটিও স্থগিত হয়ে গেছে। কবে যে ফিরতে পারব বাবা-মা’র কাছে।’

করোনা প্রতিরোধে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে ফ্রান্স সরকার। ভয়ংকর এই ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে রীতিমতো। এ অবস্থায় আরিফুলেরও সব কিছু ঠিক হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনতে হচ্ছে, ‘সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে। আমার রুমের সামনের রাস্তায় যে বাসস্ট্যান্ড সবসময় গমগম করত। সেখানে সারা দিনে দুটি মানুষও দেখা যায় না। দমবন্ধ একটা পরিবেশ।’

আরিফুলকে নিয়ে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনও। গতকাল তার প্রসঙ্গে বিওএ’র মহাপরিচালক ফখরুদ্দিন হায়দার বলেন, ‘তিন-চারদিন আগে আরিফুলের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। খোঁজখবর নিই। এমনিতে ভালোই আছে। তবে অনুশীলন বন্ধ হয়ে গেছে। একটু আতঙ্কেও আছে। আমরা বলেছি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে। অবস্থা বেশি খারাপ হলে আমরাই ওকে আনার ব্যবস্থা করব।’ বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এমবি সাইফ বলেন, ‘ওর সঙ্গে এক সপ্তাহ আগে কথা হয়েছে। আশা করছি ও নিরাপদে আছে। ওকে নিয়ে আমরাও কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছি।’

করোনাভাইরাস আসন্ন টোকিও অলিম্পিকের সামনে এঁকে দিয়েছে বড় এক প্রশ্ন। আর আরিফুলরা যারা অলিম্পিকের স্বপ্নে বিভোর তাদের দুশ্চিন্তাটা ভালোই টের পাওয়া যাচ্ছে তার অসহায় কণ্ঠ শুনে।