করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে জনসমাগম নিরুৎসাহিত করা হলেও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বিপুলসংখ্যক মানুষ একত্র হয়ে করোনা থেকে মুক্তি কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করেছে। গতকাল বুধবার ফজরের নামাজ শেষে হায়দরগঞ্জ ইউনিয়নের তাহেরিয়া রচিমউদ্দিন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ‘খতমে শেফা’ নামে কর্মসূচি পালিত হয়। হায়দরগঞ্জের সাইয়্যেদ মঞ্জিল (এতিমখানা ও মাদ্রাসা) প্রধান আওলাদে রাসুল (স.) সাইয়্যেদ মো. আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরীর আহ্বানে ‘করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও সারা বিশ্বের মানুষকে করোনা থেকে মুক্তির’ জন্য এই দোয়ার আয়োজন করা হয় বলে জানা গেছে।
সাইয়্যেদ মো. আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদের খতিব। তিনি নিজেই ‘খতমে শেফা’ নামে আয়োজিত বিশেষ এই মোনাজাত পরিচালনা করেন। মোনাজাতে সারা বিশ্বে মহামারী আকার নেওয়া করোনাভাইরাস থেকে মুক্তির জন্য বিশ্ববাসীর কল্যাণ কামনা করা হয়। তবে বিশাল এই জমায়েতের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন ও রায়পুর থানা পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, করোনার মুক্তিতে ‘খতমে শেফা’ উপলক্ষে গতকাল ফজরের নামাজের আগেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে তাহেরিয়া রচিমউদ্দিন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হতে থাকে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঈদগাহ ও আশপাশ এলাকা কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। পরে উপস্থিত সবাই দোয়া ও মোনাজাত করেন।
হায়দরগঞ্জ মডেল কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম ফজলুল হকের পরিচালনায় ‘খতমে শেফায়’ উপস্থিত ছিলেন আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী, সাইয়্যেদ তাহের জাবেরী, সাইয়্যেদ জায়েদ জাবেরী, সাইয়্যেদ মাহবুব জাবেরী, অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুল আজিজ মজুমদার, মাওলানা ইউছুফ জামান, মাওলানা ইসমাইল, কাজী জামসেদ কবির বাকী বিল্লাহ, প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানবিক বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রাকিব হোসাইন হাওলাদার প্রমুখ। খতমে শেফায় আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা কমাতে একটি দোয়া পড়ার পরামর্শ দেন। পরে তিনি মোনাজাতে মহান আল্লাহপাকের কাছে করোনাভাইরাস থেকে সবাইকে সুরক্ষিত রাখতে ও আক্রান্তদের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করেন।
আয়োজনের ব্যাপারে জানতে চাইলে আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরীর ভাতিজা আলহাজ তাহের জাবেরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে মহামারী বা যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে মহান রাব্বুল আল আমিনের কাছে দোয়াপ্রার্থনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজকের এই আয়োজন।’ তবে করোনা মুক্তিতে ডাকা ওই দোয়ায় এত লোকের সমাগম হবে তা তাদের পরিবারের কেউ ভাবতে পারেননি বলে জানান তাহের জাবেরী।
করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে জনসমাগম নিরুৎসাহিত করা হলেও কীভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ একত্র হলো তা জানতে চাইলে রায়পুর থানার ওসি মো. তোতা মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে থেকে অনুমতি না নিয়ে খতমে শেফা পড়ানো বা মোনাজাতে প্রচুর লোক সমাগমের ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে। তা ছাড়া আওলাদে রাসুল (স.) সাইয়্যেদ মো. আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী একজন প্রখ্যাত আলেম মানুষ। তার পেছনে নামাজ পড়তে এমনিতেই হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়ে থাকে।’
অন্যদিকে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পাল গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমিও খবর পেয়েছি সেখানে অনেক লোক একত্র হয়েছে। তবে আমরা কোনো সভা-সমাবেশ ও মাহফিলের পারমিশন দিইনি। তারা কীভাবে এটা করল তা জানি না। কোনো অনুষ্ঠানে লোকসমাগম যেন না হয় সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আজ (বুধবার) সন্ধ্যায় বসে করণীয় নির্ধারণ করা হবে। ওই বৈঠকে সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।’
বিশ্বের দেড় শর বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে অনেক দেশ সীমান্ত বন্ধ করার পাশাপাশি নিজের দেশে মানুষের চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বেরোলে জরিমানাও করা হচ্ছে। জনসমাগম ঠেকাতে সৌদি আরবে মক্কা ও মদিনার বড় দুই মসজিদ ছাড়া দেশটির সব মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় বন্ধ করা হয়েছে। একই ব্যবস্থা নিয়েছে আরেক আরব দেশ কুয়েত। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে জনসমাগম সীমিত করতে বলা হয়। এরপর আরও কয়েকজন আক্রান্ত হলে সারা দেশে ওয়াজ মাহফিলসহ সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।