সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, সাহেল অঞ্চলের শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো এখন কভিড-১৯ ভাইরাস মোকাবিলায় মনোযোগ দিয়েছে। এতে বিশ্বে সশস্ত্র সংঘাত কমবে; না আরও তীব্র হবে এমন প্রশ্ন সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি জাতিসংঘের কূটনীতিকরা ভাইরাস-পরবর্তী সময়কে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন। ফ্রান্স ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিসের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ বারট্র্যান্ড বাদি বলেন, ‘গেরিলা যোদ্ধা ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কাছে করোনা স্পষ্ট আশীর্বাদ। শক্তিধররা যখন শক্তিহীন হয়ে পড়ে, দুর্বলরা তখন শক্তি সংগ্রহ করে প্রতিশোধ নেয়।’
বার্তাসংস্থা এএফপি বলছে, নিরাপত্তা পরিষদের হুমকি উপেক্ষা করে সম্প্রতি জঙ্গিরা মালিতে ৩০ সেনা হত্যা করেছে। করোনা মহামারীর আগে লিবিয়া ও সিরিয়ার ইদলিব বিশ্বের বিশেষ মনোযোগ কাড়লেও লড়াই থামেনি। জাতিসংঘ মহাসচিবের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রোজমেরি ডিকারলো টুইটে ইদলিবসহ সিরিয়ার সর্বত্র করোনার ভয়ংকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে সবপক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান, ‘কারও কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্য, যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজন রয়েছে।’ তারই সুরে ইয়েমেনে জাতিসংঘের বিশেষ দূত মার্টিন গ্রিফিথ বলেন, ‘বিশ্ব মহামারীর বিরুদ্ধে লড়ছে। এখন জনগণকে মারাত্মক ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে দলগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ক্ষান্ত দেওয়া উচিত।’
করোনার কারণে এখন পর্যন্ত চীন, দক্ষিণ কোরিয়া অথবা ইউরোপের মতো এসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে ভাইরাস যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং একবার দরিদ্র ও সাংঘর্ষিক দেশে গেলে, তার প্রভাব হবে ভয়ানক। সম্মিলিত বিদেশি সহায়তা না এলে জাতিসংঘই লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করেছে। এক কূটনীতিকের ভাষায়, মহামারী সুনির্দিষ্ট কোনো দল বা দেশপ্রেমিক যোদ্ধা দেখবে না। রোগটি এখন ‘নিয়ন্ত্রণহীন’। মহামারী সংঘাত কমাতে সহায়তা করলেও, জনগণের মানবিক বিপর্যয় বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মহামারী থেকে যুদ্ধরাষ্ট্রে বিবদমান গোষ্ঠীগুলো শক্তি সঞ্চয় করে পরবর্তী সময়ে কাজে লাগাবে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসি গ্রুপের সভাপতি রবার্ট ম্যালি বলেন, ‘এসব রাষ্ট্রের সেনারা যুদ্ধে জড়ালে, অন্যান্য শান্ত দেশের বিভিন্ন গোষ্ঠী উৎসাহিত হবে এবং পরিণতিতে মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।’ তার ধারণা, ভাইরাস স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রের সক্ষমতার সঙ্গে ইচ্ছাশক্তি কমাবে। সংঘাত দমনে আন্তর্জাতিক সহায়তা দরকার হবে। জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা, শরণার্থী ও শান্তিরক্ষী মোতায়েন করতে হবে। ফলে গোটা ব্যবস্থা নতুন সংকটের মুখোমুখি হবে। করোনা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ফলে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে সংঘাত নিরসনে নতুন ব্যয় কঠিন হবে। প্রশ্ন আসবে আর্থিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে কোন দেশ ইয়েমেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান ও সাহেলের শান্তির জন্য বিনিয়োগ করবে? ফলে সংঘাত আরও বর্বর হয়ে ফিরবে, যা অনেকের জন্য অদৃশ্য ও অসহনীয় হয়ে উঠবে।
তবে জাতিসংঘে ব্রিটেনের অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রদূত জনাথন অ্যালেন বলেছেন, ‘বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তায় আমরা নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করছি। করোনা আমাদের প্রধান আলোচ্য হলেও; সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনকে আমরা ভুলে যাইনি।’ যদিও নিউ ইয়র্কভিত্তিক জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ রিচার্ড গ্রাউন জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদের কূটনীতিকরা স্বীকার করেছেন যে, জাতিসংঘে সংঘর্ষপ্রবণ রাষ্ট্রের ইস্যু প্রধান আলোচ্য করা তাদের পক্ষে কঠিন হবে।’