করোনাভাইরাস মহামারীতে নজিরবিহীন এক সংকটে পতিত পুরো পৃথিবী। সোমবারের সর্বশেষ এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারীতে এ পর্যন্ত বিশ্বের ১৯৫টি দেশ ও অঞ্চল আক্রান্ত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৬। এর মধ্যে ১৬ হাজার ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা গ্রহণের পর সুস্থ হয়ে উঠেছেন এক লাখ এক হাজার ৬৫ জন। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে এটা স্পষ্ট যে, অভিনব এই ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলা করতে গিয়ে দেশে দেশে সরকারগুলো ইতিমধ্যেই পর্যুদস্ত হয়ে পড়ছে। এদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে, ভারত ও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এখন করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ ঝুঁকিতে। সরকারি ভাষ্যমতে, দেশে এরই মধ্যে করোনাভাইরাস থেকে সৃষ্ট কভিড-১৯ রোগে ৪ জন মারা গেছেন এবং ৩৯ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশে এরই মধ্যে সামাজিক পর্যায়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে গেছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের পরিস্থিতি দুটোই ভয়াবহ বার্তা দিচ্ছে।
আশার কথা হলো, দেরিতে হলেও দেশ এখন পুরোপুরি ‘লকডাউন’ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে যাচ্ছে। মঙ্গলবার থেকেই সারা দেশে সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেন ও নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ হয়েছে। দূরপাল্লার বাস ও আন্তঃজেলা বাস চলাচল পুরো বন্ধ না হলেও ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়কপথে যোগাযোগ অনেকখানিই কমে গেছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় পর্যায়েও বাস চলাচল বন্ধ হয়েছে। চিকিৎসা ও খাবার-দাবার কেনার প্রয়োজন ছাড়া সর্বত্র সাধারণ মানুষের চলাচল নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকেই এই ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’ নিশ্চিত করার জন্য সারা দেশে মাঠে নামছে সেনাবাহিনী। এটা খুবই আশাব্যঞ্জক খবর। কেননা, করোনার সংক্রমণ কমিউনিটিতে বা সামাজিক পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার পর সংক্রমণ রোধ করতে এখন পুরো সমাজেই এই বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করাই প্রথম কর্তব্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য বিশারদরা চীনের অভিজ্ঞতা থেকে ইতিমধ্যেই দেখিয়েছেন যে, কীভাবে বিভিন্ন শহর-বন্দর-গ্রামকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে করোনাভাইরাস বিস্তারের গতি কমিয়ে আনা যায়। আর চীনের সঙ্গে ইরান, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, মানুষকে বিচ্ছিন্ন রাখার পাশাপাশি শুরু থেকেই যত বেশি সম্ভব মানুষের করোনা-টেস্ট করার মধ্য দিয়ে সংক্রমিতদের পুরোপুরি আলাদা করে ফেলে সফল হয়েছে কোরিয়া। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো বিগত কয়েক মাসে দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের বেশিরভাগেরই করোনা-টেস্ট করতে পারেনি। যেমন পারেনি ফিরে আসা প্রবাসী ও তাদের পরিবারগুলোর হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে।
বাংলাদেশে করোনা মহামারী মোকাবিলার বড় চ্যালেঞ্জগুলো হলো ঘনবসতি ও বিপুল জনসংখ্যা, অপ্রস্তুত ও ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা খাত এবং দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো শিল্পোন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে অনেক অগ্রসর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়েও তারা করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছে না। কিন্তু তারা মনে করছে, সংক্রমণ কমিয়ে আনার লড়াইটা ভালোভাবে করতে পারলে, আক্রান্তদের চিকিৎসা দিয়ে সারিয়ে তুলে মৃত্যুহার কমাতে সফল হতে পারবে তারা। এ বিষয়ে জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনা করলে দেখা যাবে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে নাগরিকদের আইন মান্য করার সংস্কৃতি এবং সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার স্টেট হওয়ার কারণেই হয়তো জার্মানি এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে আছে। এ অবস্থায়, একদিকে স্বাস্থ্যসেবায় অত্যন্ত দুর্বল অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদির অভাব; আরেকদিকে দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও আইন মানতে অনভ্যস্ত নাগরিক সংস্কৃতি নিয়ে করোনাযুদ্ধে বাংলাদেশের কৌশল কী হতে পারে? পথ একটাই, মহামারীতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে কঠোর হাতে হোম কোয়ারেন্টাইন ও লকডাউন কার্যকর করে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা এবং যত দ্রুত সম্ভব বিদেশফেরতসহ সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের করোনা-টেস্ট করতে থাকা।
করোনা মহামারীর মোকাবিলায় প্রস্তুতিপর্বের বিপুল সময় যে আমরা হেলায় হারিয়েছি সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন কাজ সর্বশক্তি নিয়ে এই বিশেষ পরিস্থিতির সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধটা শুরু করা। এক্ষেত্রে করোনা পরীক্ষার টেস্টকিট, চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই স্যুট জোগাড় করা এবং পরীক্ষাগারের সুবিধা দেশব্যাপী সম্প্রসারণের পদক্ষেপ সরকারকে অতিদ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ডেটাবেইজ ব্যবহার করে সম্প্রতি বিদেশফেরতদের এবং তাদের সংস্পর্শে আসা সবার করোনা-টেস্ট দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়া এলাকাগুলোতে পুরোপুরি লকডাউন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সারা দেশে যতটা সম্ভব মানুষকে ঘরবন্দি রাখার পদক্ষেপ জারি রাখতে হবে। একই সঙ্গে করোনার কারণে অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি নিরূপণ করে তা সামলানোর প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে আয়-রোজগার বন্ধ বা কমে যাওয়া নিম্নবিত্ত মানুষদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। করোনা মহামারী মোকাবিলায় আগামীকাল জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণে দেশের মানুষের এসব যৌক্তিক উদ্বেগের উত্তর পাওয়া যাবে সেটাই প্রত্যাশা।