মুক্তিযোদ্ধা তারকারা

একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশের আপামর জনতা। তাদের মধ্যে ছিলেন তারকারাও। অনেকে অস্ত্র হাতে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও অনেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকন্ডের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। এমনই তিন তারকার গল্প শুনেছেন আল মাসিদ

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বেতার টিভি বর্জন করেছিলাম

সৈয়দ হাসান ইমাম, অভিনেতা

স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব সময়ে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের মঞ্চে নাটক-নাটিকা ও গণসংগীত পরিচালনা করতাম। ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলনের সময় সংস্কৃতি সংসদ আয়োজিত প্রায় ১০ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বাংলা একাডেমির বটমূলে মঞ্চায়িত ‘রক্তকরবী’ নাটকটি করে বিপুল সাড়া পেয়েছিলাম। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমাকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় শিল্পীদের প্রতিবাদী সংগঠন বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে পাকিস্তান বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বর্জন করেছিলাম আমরা। গণ-আন্দোলনের চাপে পাকিস্তানি সরকার ৮ মার্চ থেকে বেতার টেলিভিশনের দায়িত্ব বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ২৫ মার্চের পর আমি মুজিবনগর চলে যাই এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিই। স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের নাট্য বিভাগের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেছি।

গেরিলা যুদ্ধের জন্যই ট্রেনিং নিয়েছিলাম

রাইসুল ইসলাম আসাদ, অভিনেতা

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। এই শহরটাকে ভালোভাবে চিনি। এই শহরের অনেক কিছুর সাক্ষী আমি। ১৯৭১ সালের অনেক ঘটনারও সাক্ষী। যুদ্ধ শুরুর আগে পল্টনের বাসায় ছিলাম। ১৭ বছর বয়স আমার। নাসির উদ্দিন ইউসুফ আর আমার বাড়ি ছিল পাশাপাশি। ২৫ মার্চ রাতে হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। বুঝতে অসুবিধা হয় না, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দিক থেকেই আসছে গুলির শব্দ। আমরা দেখার জন্য এগিয়ে যাই। পরে জেনে যাই পাকিস্তানি আর্মি অ্যাটাক করেছে। তারপর আরও গুলির শব্দ ভেসে আসে। কাছ থেকে না শুনলে কেউ বুঝতে পারত না কী ভয়াবহ ছিল সেই গুলির শব্দ। এরপর চিৎকার আর চিৎকার ভেসে আসে। নির্ঘুম রাত কাটে আমাদের। এর মধ্যে কয়েকজন পুলিশ আসেন আমাদের বাড়িতে। তারা রাইফেল রেখে যান। বলে যান আবার আসবেন, গুলি শেষ হয়ে গেছে। তারা আর আসেননি। আমরা এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে লেপ এনে রাইফেলগুলো ঢেকে রাখি। ২৭ মার্চ কারফিউ ছিল। ভয়ংকরভাবে কাটতে থাকে আমাদের দিন। ২ এপ্রিল আমি চলে যাই কেরানীগঞ্জ। সেখানেও আক্রমণ করে পাকিস্তানি মিলিটারিরা। অনেক মানুষ মারা যায়। আমিসহ কয়েকজন মসজিদের ভেতরে পালিয়েছিলাম। কেরানীগঞ্জ থেকে বেঁচে যাওয়ার পর বিক্রমপুরের দিকে চলে যাই। প্রায় হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই চট্টগ্রাম। আসলে এটা লম্বা কাহিনী। ছোট্ট পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না। সেখান থেকে আমি, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, কাজী শাহাবুদ্দিন শাহজাহান চলে যাই আগরতলায়। আগরতলা জার্নিটাও ছিল অনেক কষ্টের। এক জায়গায় ব্রিজ ভাঙা ছিল। কীভাবে যে গিয়েছি, এখন বলতে গেলে গা শিউরে ওঠে। আগরতলা যাওয়ার পর মেলাঘরে ট্রেনিং শুরু হয়। আমরা ছিলাম ২১ জনের টিম। ঢাকা শহরে গেরিলা আক্রমণ করার পরিকল্পনাতেই আমার ট্রেনিং নিই। ঢাকায় গেরিলা কায়দায় আক্রমণ করেছি আমরা। প্রচণ্ড দুঃসাহস না থাকলে ওই সময়ে গেরিলা আক্রমণ করতে পারতাম না। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আরও বুঝে যাই, আমাদের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। তারপর আসে সেই কাক্সিক্ষত দিনটি- ১৬ ডিসেম্বর। আমরা বিজয় অর্জন করি।

সূর্যসন্তানদের স্মরণ করছি

শাহীন সামাদ, সংগীতশিল্পী

১৯৭১-এ আমি কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। যুদ্ধ শুরু হলে আমি কলকাতার চলে যাই। বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার হয়ে সেখানে গান করতাম বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। এটাই ছিল প্রধান কাজ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সব সময় থাকতে পারতাম না। তবে যখনই ডাক পড়ত গিয়ে গান করতাম। প্রথম যখন যাক পড়ল, সেবার ৮টি গান রেকর্ড করেছিলাম। এর মধ্যে ছিল নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত ও পল্লীগীতি। এরপর টালিগঞ্জ টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে ১৮টি গান রেকর্ড করি। সেগুলোই দিনরাত বাজতে

থাকত বেতারে। এর মধ্যে ছিল রবীন্দ্রসংগীত ‘দেশে দেশে ভ্রমি তব দুঃখ গান গাহিয়ে’ ও ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক’, নজরুলসংগীত ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ ও ‘শিকল পরার ছল’, দেশের গান ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমার’, ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’, ডিএল রায়ের গান ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’, ব্রতচারী গান ‘আবার তোরা মানুষ হ’সহ বেশ কিছু গান। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর আজীবন স্মৃতির পাতায় অম্লান থাকবে। ওই দিন ভারত সরকার আমাদের স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কলকাতা মিশনে ওঠে বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা। সেই অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গেয়েছিলাম। এরপর চলে আসি যশোর মুক্তাঞ্চলে। সেখানেও গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জোগানোর কাজ করেছি। সেই দৃশ্যই তারেক মাসুদের মুক্তির গানে দেখা যায়। তখন আমিসহ গান করেছি মাহমুদুর রহমান বেনু (দলনেতা), তারেক আলী, শারমিন মোর্শেদ, ডালিয়া নওশীন, লতা চৌধুরী, দেবব্রত চৌধুরী, স্বপন চৌধুরী, এনামুল হক, মোরশাদ আলী ও বিপুল ভট্টাচার্য। স্বাধীনতা দিবসে এই সূর্যসন্তানদের আমি স্মরণ করছি। তাদের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।