চারদিকে শুধু বিষণ্নতা। গন্তব্যহীন স্থবির জীবন। শুধু মাঝেমাঝে টেলিভিশনে চোখ রাখা আর এ চোখ রাখতে রাখতে আবার কিছু বিষণতায় যোগ হওয়া। এমনিতেই ইন্টারনেট ফেইসবুকের যুগে মানুষে মানুষে প্রবলভাবে দূরত্ব বেড়েছে। এই সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি বয়স্ক মানুষদেরও নিঃসঙ্গ করে ফেলেছে। সামাজিক দূরত্ব এমনভাবে বেড়ে চলেছে, কোনো কথা বলতেও যেন দ্বিধা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফলে যত দূরত্ব বেড়েছে, তার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে নতুন এক মাত্রা Social distancing, কিন্তু করার কিছু নেই। করোনাভাইরাস যেন সর্বত্র ওত পেতে বসে আছে, ধেয়ে আসছে সর্বত্র। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কিছু নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চললেই সম্ভব করোনাভাইরাসকে পরাস্ত করা।
একটি করোনাভাইরাসের জীবাণু কোনোমতে ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলেই সারা পৃথিবীটা জিম্মি হয়ে পড়ল। যে মানবজাতি যুদ্ধবিগ্রহ, সামাজিক উপদ্রব, বিপ্লব, নানা ধরনের ব্যাধিকে অতিক্রম করে একবিংশ শতাব্দীতে এসে পৌঁছেছে, সে আজ এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। যে বিজ্ঞানীরা এ ভাইরাস নিয়ে কাজ করছিলেন তারাও হয়তো অসহায়। গত শতাব্দী থেকে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রের নতুন নতুন উদ্ভাবনে তার একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশও মানবকল্যাণে ব্যয় হয়নি। মোটা দাগে কেউ কেউ বলছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান পেনিসিলিনে এসে আটকে আছে। অথবা নতুন কিছু আবিষ্কৃত হলেও তা পরাশক্তির চাপের মুখে আলোর মুখ দেখছে না, বিশ্বব্যাপী বাজারজাতকরণ সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি বলা হচ্ছে, ল্যাবরেটরির ভুলের কারণে ইবোলা বা করোনাভাইরাসের মতো ঘাতকের জন্ম হচ্ছে। আরও হতাশার বিষয় বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানী এর প্রতিষেধকও বানাতে পারছেন না। এত জ্ঞান-বিজ্ঞান কোনো কিছুই কাজে লাগছে না।
এর মধ্যে একটু আশার আলো নিয়ে এগিয়ে এসেছে একটা দেশ। মানচিত্রে দেখাই যায় না এমনি একটি আয়তনের দেশ, যে দেশটি বহু বছর ধরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিচারে স্বাস্থ্যসেবায় প্রথম স্থান অধিকার করে আছে। কুকুরে কামড়ানোর পর তারাই প্রথম এর প্রতিষেধক আবিষ্কার করে। ক্যানসারের চিকিৎসা বিশেষ করে বোনম্যারো ক্যানসারের চিকিৎসা করে আসছে। রাশিয়ায় চেরনোবিলের আণবিক বিস্ফোরণের ফলে দ্রুত যে ক্যানসারটি ছড়িয়ে পড়েছিল, তাদের কয়েক হাজার রোগীর ক্যানসার নিরাময়ে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নাকের ডগায় বসে অবরোধের মুখেও ওইসব ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করে যাচ্ছে। দুরারোগ্য চোখের ব্যাধিতেও তাদের চিকিৎসা সফল বলে প্রমাণিত হয়েছে। দেশটির নাম কিউবা; যার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও মুক্তিসংগ্রামী চে গুয়েভারা।
তারা চেয়েছিলেন দেশে দেশে বিপ্লব ঘটাবেন, মানবজাতিকে ক্ষুধা-দরিদ্র ও রোগ থেকে মুক্ত করবেন। তারা সেভাবে বিশ্বব্যাপী বিপ্লব ছড়াতে পারেননি, তবে নিজের দেশের মানুষকে নিয়মিত চিকিৎসা দিয়ে একটি সুস্থ জাতিতে পরিণত করতে পেরেছে। সম্প্রতি টেলিভিশনে পশ্চিমা গণমাধ্যম খুব অবহেলা করে সংবাদটি পরিবেশন করল যে কিউবা থেকে একদল চিকিৎসক ইতালিতে এসে পৌঁছেছেন। একটি রোগাক্রান্ত দেশের বিধ্বস্ত অবস্থায় আর কোন দেশ এরকম একটি নজির স্থাপন করেছে? এর একটা বড় অর্থ দাঁড়ায় যে কিউবার জনগণকে সুস্থ রাখার পরই তারা এসেছেন ইতালিতে। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই করোনার হাহাকার, সেখানে একটি ছোট রাষ্ট্র কী করে তার দেশকে সুস্থ রাখছে এবং কীভাবে ইতালিতে এসে চিকিৎসা শুরু করার সাহস দেখাচ্ছে। এসবই সম্ভব কিউবা বা কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে। কিউবা এর মধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধকও তারা আবিষ্কার করতে পারে। অথচ অস্ত্রশস্ত্রে, অর্থে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে এত সমৃদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে রক্ষার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়েও কিছু করতে পারছে না। বরং প্রতিদিন পরাস্ত হচ্ছে।
পৃথিবীর ছোট দেশগুলোর মধ্যে কিউবা যথার্থই একটা উদাহরণ হতে পারে। সবাই তাকিয়ে আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা বড় দেশগুলোর দিকে। কিন্তু ছোট দেশগুলোতেও বড় বিজ্ঞানী আছে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি কালাজরের ওষুধ যখন কোথাও তৈরি হচ্ছে না, তখন ভারতবর্ষের এক অখ্যাত চিকিৎসক কিছু নামমাত্র উপকরণ নিয়ে কলকাতার একটি হাসপাতালে যেখানে পানি সংগ্রহ করতেও কষ্ট হয়েছে, সেখান থেকে এর প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন। এ আবিষ্কারের ফলে লাখো-হাজারো মানুষ কালাজ¦রের মতো ঘাতক ব্যাধির হাত থেকে রক্ষা পান। এ কলকাতা শহরেই সামরিক বাহিনীর একজন ডাক্তার ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহক মশা আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ছোট দেশেও যে বড় বিজ্ঞানীর জন্ম হতে পারে তার অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে। এখন বড় দেশের দিকে তাকিয়ে থাকা আমাদের একটা মানসিক রোগে পরিণত হয়েছে। আর এই বড় দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বের বিজ্ঞানীদের হেয়প্রতিপন্ন করার নানারকম ফন্দিফিকিরও করে থাকে। জগদীশ চন্দ্র বসু বেতার তরঙ্গ আবিষ্কার করেন কিন্তু তিনি তার স্বীকৃতি পেলেন না। স্বীকৃতি পেলেন পশ্চিমা বিজ্ঞানী। হাজার বছর ধরে এই ভারতবর্ষ তার নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতিতে চলেছে। ব্রিটিশরা আসার পর এখানে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার উদ্ভব হয়। তারা চারদিকে চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তুলে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে এ ব্যবস্থা। প্রচুর অর্থ ব্যয় করে তারা। কিন্তু অন্যদিকে দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা অবহেলিত হতে থাকে। ব্যবসায়ী ইংরেজ ওষুধের ব্যবসা করে তাদের লগ্নি দুই-তিনগুণ তুলে নেয়। তবু ভারতবর্ষের বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়েছেন। বর্তমানে সারা বিশ্বেই alternative medicine-এর একটা আন্দোলন শুরু হয়েছে। আধুনিক ওষুধগুলোর বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে তারা চিহ্নিত করছেন এবং দেশজ লতাগুল্ম ও ঔষধি বৃক্ষকে কাজে লাগাচ্ছেন। গবেষণার জন্য যে কেন্দ্র প্রয়োজন, তার ব্যবস্থাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। এও জানা গেছে, অনেক কঠিন অসুখেরও তারা নিরাময় করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আজ থেকে ১০ বছর পর অ্যান্টিবায়োটিকের অনেক আধুনিক প্রজন্ম তৈরি হবে বটে কিন্তু মানবদেহের কোনো কাজে লাগবে না, প্রতিরোধী শক্তি তৈরি হবে। এর মধ্য থেকে বাঁচার (Resistant) একমাত্র বিকল্প প্রতিক্রিয়াহীন ওষুধ খোঁজা। সেই খোঁজা সারা বিশ্বেই শুরু হয়েছে। কিন্তু আধুনিক অ্যালোপ্যাথি ওষুধ এক সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে। ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী সবাই মিলে এ ব্যবস্থাকেই চূড়ান্ত বলে মনে করছেন। শল্যচিকিৎসায় অবশ্য প্রভূত সাফল্য হয়েছে। সেও মানুষের প্রাচীন শারীরিক জ্ঞান থেকেই উদ্ভূত। কিন্তু সেখানেও আধুনিক ওষুধের প্রয়োজনীয়তা এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে যে, শল্যচিকিৎসাও আধুনিক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল।
জুলিয়াস সিজারের জন্মের সময় যে শল্যচিকিৎসার সূচনা হয়েছিল, সেখানে জীবাণুনাশক হিসেবে প্রাকৃতিক অ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়েছিল। আমরা আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগেও দেখেছি প্রসূতিকে শুধু নিম্নমাত্রার প্রাকৃতিক অ্যালকোহল খাইয়ে সুস্থ করা হতো। করোনাভাইরাসের মতো অদৃশ্য শত্রুকে পরাস্ত করার জন্য কোনো আধুনিক ওষুধ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে দেশীয় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনকে কোনো ধরনের বিকল্প উপায় প্রস্তাব করা যায় কি নাÑ তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশেও প্রাকৃতিক ধারার যেসব বিজ্ঞানী আছেন, তাদেরও উৎসাহিত করা এবং তাদের উদ্ভাবনকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
লেখক
নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামনিস্ট