চুটিয়ে আড্ডা অলিগলিতে

‘করোনভাইরাস নিয়ে চারদিকে আতঙ্ক ও উদ্বেগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লকডাউন চলছে। কেউ বাসা থেকে বের হচ্ছে না। বাংলাদেশেও একই অবস্থা। মৃত্যুকে ভয় পান না। আপনার জন্য পরিবারসহ সমাজেও এ ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। সরকারের নির্দেশ অমান্য করে ঘর থেকে বেরিয়েছেন? বাইরে কি জরুরি কাজ ছিল? না থাকলেও বের হন। আবার থাকলেও বের হন। মনে হয় আনন্দফুর্তি করতে রাস্তায় বের হচ্ছেন।’ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে দুই মোটরসাইকেল আরোহীর উদ্দেশে এসব কথা বলছিলেন এক কর্মকর্তা। পরে ওই আরোহীদের সোজা বাসায় চলে যেতে বলেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানান তিনি।

পুলিশের এই চেকপোস্টের মতোই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর তৎপরতা শুরু হয়েছে গতকাল। সেনাবাহিনীও জনগণকে আরও সচেতন করতে কঠোর হয়েছে। এত কঠোরতার মাঝেও কেউ কেউ অপ্রয়োজনে বাসা থেকে বেরোচ্ছেনই। কিছুতেই তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না। রাস্তায় ঘোরাফেরার পাশাপাশি অলিগলিতে চুটিয়ে

 আড্ডা দিতে দেখা গেছে অনেককে। গতকাল ঢাকাসহ সারা দেশে দুই শতাধিক যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা।

গতকাল পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ডক্টর মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী এক বার্তায় বলেছেন, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে পুলিশ সদস্যদের সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ জন্য বার্তায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ৫৬ জন শনাক্ত হয়েছে, মারা গেছে ৬ জন। সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলেও এক শ্রেণির মানুষ বিনা কারণে বাসা-বাড়িতে থাকতে চাচ্ছে না। রাস্তায় যানবাহনও বেড়েছে। বিনা কারণে লোকজন বের হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দুশ্চিন্তায় পড়েছে। গত বুধবার আইএসপিআর থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তার অংশ হিসেবে দেশের সব স্থানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং হোম কোয়ারেন্টাইনের বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করবে সেনাবাহিনী। সরকারের নির্দেশাবলি অমান্য করলেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। করোনা মোকাবিলায় পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও আলাদাভাবে বৈঠক করছে। তারাও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকারের নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল ভোর থেকেই সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কঠোর অবস্থান নেয়। সেনাবাহিনীও টহল শুরু করে।

গতকাল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করে। তবে অলিগলিতে পুলিশ ও র‌্যাবের তেমন অভিযান ছিল না। ওই সব স্থানে লোকজনকে সামাজিক দূরত্ব না রেখে চুটিয়ে আড্ডা দিতে দেখা গেছে। রাস্তায়ও লোকজন বেশি ছিল। পুলিশ সদস্যরা প্রাইভেট কারসহ অন্যান্য যানবাহন আটকিয়ে বাসা-বাড়ি থেকে কী কারণে বের হয়েছেন তা জানতে চান। সঠিক উত্তর দিতে না পারলে গাড়িগুলো ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

গতকাল সকালে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে একটি প্রাইভেট কার আটকায় পুলিশ। চালকের মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লাভস ছিল না। তখন এক পুলিশ কর্মকর্তা রাগান্বিত হয়ে বলেন, ‘সারা বিশ^ করোনাভাইরাসের ভয়ে থরথর করে কাঁপছে, প্রতিদিন শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। আপনি কোনো প্রটেকশন ছাড়াই গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। আবার ড্রাইভিং লাইসেন্সটিও আনেননি। ফাঁকা রাস্তায় কি ফুর্তি করতে বেরিয়েছেন? মৃত্যুকেও ভয় পান না।’ পরে একটি মামলা দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেন তাকে। পুলিশের ওই কর্মকর্তা কয়েকজন সাংবাদিককে বলেন, দেখেন রাস্তায় কত গাড়ি, মোটরসাইকেল আর রিকশা। সরকার ঘরে থাকার অনুরোধ জানালেও তারা মানছে না। নানা ছুতায় ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ছে। মনে হয় আনন্দে ঘুরতে বেরিয়েছে।

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, রাস্তাঘাটে বের হওয়া যানবাহনের অধিকাংশই প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল। তারা নিজেদের কেউ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আবার কেউবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক পরিচয় দিয়ে গন্তব্যে যেতে চাইলেও পুলিশ তাদের বাসায় ফিরে যেতে বলেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ কাজ করছে। বিনা কারণে কেউ বাসা-বাড়ি থেকে বের হলে তাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তারপরও লোকজন শিক্ষা নিচ্ছে না। তাদের মধ্যে কোনো ধরনের ভয় কাজ করছে না। আমরা কঠোর হয়েছি। সামনের দিনগুলোতে আরও কঠোর হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। অলিগলিতে অভিযান চালানো হবে। তিনি জানান, সরকারের নির্দেশ অমান্য করে রাস্তায় যানবাহন চালানো ও কাগজপত্র না থাকায় গতকাল ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় দুই শতাধিক মামলা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করাসহ মামলা হয়েছে। মোটরসাইকেলপ্রতি কমপক্ষে ১ হাজার ও প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকার জরিমানা করা হয়েছে।

‘পুলিশের ভূমিকায় আমি গর্বিত’: গতকাল এক বার্তায় পুলিশপ্রধান বলেন, করোনার বিস্তার রোধে বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্য যেভাবে দেশ ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে তাতে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও সম্মানিত বোধ করছি। পুলিশের প্রত্যেক সদস্যকে জানাচ্ছি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। তবে, জনগণকে সেবা প্রদানের পাশাপাশি নিজের, অধীনস্ত সদস্য, সহকর্মী ও পরিবারের সর্বোচ্চ সুরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে প্রত্যেককে। সাধারণ মানুষকে বিশেষ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে, যেন কোনোভাবেই জনসমাগমের সুযোগ সৃষ্টি না হয়। সরকার নির্দেশিত সোশ্যাল ডিসটেন্সিং এবং হোম কোয়ারেনটাইন বাস্তবায়নে পুলিশের কার্যক্রমের বর্তমান সফল ধারা অব্যাহত রাখতে সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

‘করোনাযুদ্ধ করব জয়, ঘরের বাইরে আর নয়’: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, লোকজনকে ঘরবন্দি রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থা। বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে লোকজনের চলাচলে নজরদারি করছেন সেনাসদস্যরা। যারা বাইরে বের হয়েছেন, তারাই পড়েছেন জেরার মুখে। ‘করোনাযুদ্ধ করব জয়, ঘরের বাইরে আর নয়’ সেøাগান ধারণ করে মাঠে কাজ করছে সবাই।