করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বের মতো সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। কয়েক বছর ধরে আশাব্যঞ্জক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনীতিসহ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ যখন স্বপ্ন দেখছে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার, ঠিক সে সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ঝুঁকির সূত্রপাত হয়েছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও মুখোমুখি করেছে অনিশ্চয়তার সামনে। এ অবস্থায় খুব ভেবেচিন্তে দেশের সীমিত বাজেটের সদ্ব্যবহার করে অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব দ্রুত কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা করতে হবে। এ সংকট যেহেতু বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশের মধ্যেও এ সংকট যেহেতু অর্থনীতির সব খাতের, সেহেতু অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলার পরিকল্পনা পুরো সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থার স্থিতিস্থাপকতা ধরে রাখার মাধ্যমে বিচার হতে হবে। তাই খাতওয়ারি প্রণোদনা নয় বরং অর্থনীতিতে যারা বেশি দুর্বল, তাদেরই প্রণোদনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সম্প্রতি রপ্তানি খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে, তা একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় এতে মূলত উপকার হবে বড় রপ্তানিকারকদের। এতে বলা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনের ৮০ ভাগের ওপর রপ্তানি হয়, তারাই কেবল তাদের শ্রমিকদের সর্বোচ্চ তিন মাসের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য এই প্রণোদনার অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন। যে প্রতিষ্ঠান তার উৎপাদনের ৮০ ভাগ রপ্তানি করে, সে প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই তাদের শ্রমিকের বেতন তিন মাসের জন্য নিজেরা চালিয়ে নিতে পারেন। আমি মনে করি রপ্তানি খাতের জন্য আলাদা করে নয় বরং পুরো শিল্প এবং বাণিজ্য খাতকে ঘিরে প্রণোদনা প্যাকেজের পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। আলাদা আলাদা করে বিভিন্ন খাতের জন্য প্রণোদনা না নিয়ে বরং অণু ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য দিয়ে সাধারণ প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া দরকার।
আবার এই রপ্তানি খাতের জন্য যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তাতে এই খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার। কারণ তাদের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা সবচেয়ে কম। কাজেই যারা ৮০ শতাংশ রপ্তানি করেন, সেই বড় উদ্যোক্তাদের চেয়েও রপ্তানি খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন ছিল বেশি এবং একবার তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে হলে তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো মুশকিল। কেননা, তাদের সঞ্চয় কম এবং সংগত কারণেই ব্যাংকঋণপ্রাপ্তির সক্ষমতাও কম। আমি আশা করি রপ্তানি খাতের বড় উদ্যোক্তারা তাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিষয়টি বরং পুরো সেক্টরের টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরবেন।
আমরা যদি একটু খতিয়ে দেখি আমাদের পুরো শ্রমশক্তি আসলে কোথায় কীভাবে কাজ করছে, তাহলে কিছু বিষয় স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশের শ্রম জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী দেশে মোট শ্রমশক্তি আছে ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এই শ্রমশক্তির মধ্যে কর্মসংস্থান আছে ছয় কোটি আট লাখ মানুষের। তাদের ৪১ ভাগই কাজ করেন কৃষি খাতে, ২০ ভাগ শিল্প খাতে এবং ৪৯ ভাগ সেবা খাতে। সব খাত মিলিয়ে এই যে ছয় কোটি আট লাখ মানুষ কাজে আছে, তাদের ৫ কোটি ১৭ লাখের ওপরে আছে অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল খাতে। অর্থাৎ আমাদের কর্মসংস্থানের ৮৫ ভাগই হচ্ছে ইনফরমাল। অনেকেই বলেন এত বেশি কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে কৃষি। কারণ কৃষি মূলত অনানুষ্ঠানিক। কৃষিকে বাইরে রেখে শিল্প খাতের দিকে তাকালেও দেখব যে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের প্রায় ৯০ ভাগই হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান। সংকটে এরাই হবে সবচেয়ে প্রথম বলি। সবার প্রথমে কাজ হারাবেন এই অনানুষ্ঠানিকভাবে নিয়োজিত শ্রমিকরাই। রপ্তানি খাতে শ্রমিকের মজুরির জন্য যে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, তাদের মধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান অনানুষ্ঠানিকভাবে যারা নিয়োজিত আছেন, তারা কিন্তু এই প্রণোদনা থেকে সুবিধা পাবেন না, কারণ তাদের নিয়োগ আনুষ্ঠানিক নয়। শ্রমজরিপ অনুযায়ী, শিল্প খাতের প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ব্যক্তির মধ্যে প্রধান রপ্তানি খাতে প্রায় ৫০ লাখের মতো মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এ খাতগুলো হলো : তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য ইত্যাদি। শিল্প খাতের বাকিরা কিন্তু মূলত নিয়োজিত আছেন দেশি বাজারনির্ভর খাতে। আবার রপ্তানিনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও আবার ছোট-বড় মিলিয়ে সব ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। বিষয়টি দেশের অর্থনৈতিক শুমারির কিছু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে স্পষ্ট হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শুমারি সর্বশেষ হয়েছিল ২০১৩ সালে। Economic census বা অর্থনৈতিক শুমারিতে কর্মসংস্থান বা বিভিন্ন কাজে মানুষের অংশগ্রহণের যে পরিসংখ্যান আছে, তা শ্রমজরিপের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। তারপরও লক্ষণীয় যে, অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী কৃষিবহির্ভূত খাতে অর্থাৎ শিল্প ও সেবা খাতে কর্মরত আছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। তার মধ্যে শিল্প খাতে নিয়োজিত আছে ৭৩ লাখ ৬৫ হাজার জন। শিল্প খাতে নিয়োজিতদের প্রায় ৫৫ ভাগের কর্মসংস্থান হয় অণু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে। বাকি ৪৫ ভাগ কর্মরত আছেন বড় শিল্প খাতে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, রপ্তানিনির্ভর অথবা দেশের বাজারনির্ভর যেমনই হোক না কেন, শিল্প খাতের সার্বিক বিচারে বেশি কর্মসংস্থান হয় অণু ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান। তবে কিছু শিল্পে মূলত বড় প্রতিষ্ঠানেই কর্মসংস্থান হয়। যেমনÑ তৈরি পোশাক খাতের ৮৩ ভাগ কর্মসংস্থান হয় বড় কারখানায়। তবে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও জুতাশিল্পের কর্মসংস্থান ৪৫ ভাগের মতো হয় বড় কারখানায়। এভাবে অন্য সব খাতেই ছোট-বড় মিলিয়ে নানা আকারের শিল্প-কলকারখানা নিয়োজিত আছে মানুষ। তাই বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে সবার কথাই ভাবতে হবে। সে ক্ষেত্রে ছোট শিল্পগুলো আসলে যে কর্মসংস্থান দিচ্ছে তা দেশের মোট শিল্প-কারখানার কর্মসংস্থানের বড় অংশ। সেই বিবেচনায় নানা ধরনের প্রণোদনায় এই অণু ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের প্রাধান্য থাকা উচিত। এমনকি রপ্তানি খাতের মধ্যেও যারা ছোট বা মাঝারি আছেন, তাদের উৎপাদনের ৮০ ভাগ যদি বিদেশে রপ্তানি নাও হয়, তারপরও তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত প্রণোদনায়।
রপ্তানি খাতের প্রণোদনা ছাড়াও ইতিমধ্যেই দিনমজুর, ফেরিওয়ালা সাধারণ দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা দিতে সরকার তহবিল গঠন করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের জন্য তহবিলের কথাও বলা হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বর্তমান সংকটে শিল্প-কলকারখানা ছাড়াও এগুলোর সরবরাহ বাজারজাতকরণসহ পরিবহন এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত শ্রমিকরাও সংকটে আছেন। এ ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহযোগিতার জন্য অতি অল্পসুদে আপৎকালীন ঋণের ব্যবস্থা করা যায়, যা পরবর্তী দেড় থেকে দুবছরের মধ্যে তারা শোধ করতে পারবেন। তাহলে এই শিল্পগুলো হয়তো বেঁচে যাবে এবং এগুলোতে কর্মরত শ্রমিকরা ও তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। যারা আসলে ব্যাংকঋণ নেওয়ার মতো অবস্থায় থাকেন না, কিংবা যাদের ব্যবসাটা অনানুষ্ঠানিক খাতে, তাদের জন্য মূলত দরকার বাজারে তাদের পণ্যের চাহিদা তৈরি হওয়া বা সামষ্টিক চাহিদার অগ্রগতি। এ ক্ষেত্রে সরকারের যে বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন, সেগুলো করতে থাকতে হবে যতটা সম্ভব এবং এসব ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অপচয় যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। সরকারের এসব ব্যয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়ে অর্থনীতির চাকা ঘুরতে থাকবে। তখন মানুষের হাতে আয় থাকলে তারা আবার অনেক পণ্যের কেনাকাটা করবেন। ফলে যারা অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা আছেন, সুফলটা তাদের কাছেও পৌঁছাবে। সরকারের ব্যয় করা ছাড়াও যারা দেশের বড় শিল্পপতি ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় উদ্যোক্তা আছেন, তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে তারা যেন তাদের প্রতিষ্ঠান কোনো শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাই না করেন। বরং নিজেদের প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয় থেকে হলেও শ্রমিকদের যথানিয়মে বেতন-ভাতা দেন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানে যারা অতি উচ্চ বেতনে চাকরি করেন, তাদের এগিয়ে আসতে হবে, নিজের প্রতিষ্ঠানে সবার নিয়োগ যাতে ঠিক থাকে, সেজন্য তাদের বেতনের একটি অংশ অন্তত ছয় মাসের জন্য নিজের প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারেন তারা। মানুষের হাতে আয় থাকতে হবে। আয় থাকলেই পণ্যের চাহিদা তৈরি হবে, অর্থনীতির চাকা ঘুরবে, অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং শ্রমিকরা কেউ চাকরিচ্যুত হবেন না।
আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের উদ্ভব ঘটছে চাহিদার সংকট থেকেও। অর্থাৎ মানুষ ঘরে বসে থাকায় স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় কম কেনাকাটা করায় এই সংকট উদ্ভূত হয়েছে এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে একটা সময়ে পণ্যের জোগান সমস্যা দেখা দিতে পারেÑযদি পণ্যের জন্য চাহিদা না থাকে এবং যদি লম্বা সময় ধরে কলকারখানা বন্ধ রাখতে হয়। আমরা যেসব দেশে পণ্য রপ্তানি করি, তাদের অবস্থার উন্নতি না হলে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের অবস্থা ভালো হবে না। কিন্তু বিদেশের বাজার তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কাজেই আমাদের কাজ করে যেতে হবে দেশের বাজারে যেন পণ্য চাহিদা ঠিক থাকে সেই লক্ষ্যে।
লেখক
সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বিআইডিএস
nazneen7ahmed@yahoo.com