ইসলামের ইতিহাসে মহামারী

কভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি দেশের মানুষকে তাই কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ইসলামিক স্কলারদের দাবি হলো- কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতিটি মহামারীর বিস্তার রোধে প্রিয়নবী (সা.)-এর একটি নির্দেশনা। এ পন্থার সর্বপ্রথম প্রয়োগ ছিল ওমর (রা.)-এর যুগে। তাই বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত এই পদ্ধতির নির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)।

মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা মতে, কেউ যেন আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ না করে এবং সেখান থেকে বের হবে না। বরং সেখান থেকে বের হওয়াকে রণাঙ্গন থেকে পলায়নের মতো বলা হয়েছে; যা কবিরা গোনাহের শামিল। তেমনি মহামারীতে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য থাকবে শহীদের মতো সওয়াব।

মহামারী থেকে বাঁচতে উমর (রা.)-এর কৌশল

ফিলিস্তিনের আল-কুদস ও রামলার মধ্যভাগে অবস্থিত একটি অঞ্চল হলো আমওয়াস বা ইমওয়াস। সেখানে প্লেগ রোগ প্রথম প্রকাশ পায়। অতঃপর তা সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের ইতিহাসে তা ‘তাউন আমওয়াস’ নামে পরিচিত। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল আমওয়াস অঞ্চল পুরোপুরি ধ্বংস করে ওই স্থানে কানাডাভিত্তিক ইহুদি তহবিলের অর্থায়নে একটি পার্ক তৈরি করা হয়। বর্তমানে তা ‘কানাডা পার্ক’ নামে পরিচিত।

১৭ হিজরি ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে উমর (রা.) দ্বিতীয়বারের মতো শাম পরিদর্শনের জন্য বের হন। ওমর (রা.) শামে পৌঁছার পর শুনতে পান যে সেখানে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। তা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে।

আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত, উমর বিন খাত্তাব (রা.) শামের উদ্দেশে বের হন। শামে অবস্থিত তাবুক গ্রামের ‘সারগ’ নামক এলাকার কাছে এলে সেনাপতি আবু উবাদাহ ও অন্য নেতাদের সঙ্গে দেখা হয়। উমর (রা.)-কে তারা অবহিত করল যে শামে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের কথা শুনে উমর (রা.) আমাকে বলেন, ‘ইসলামের প্রথম পর্যায়ের মুহাজিরদের ডাক দাও।’ তাদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশে বের হয়েছেন। তা না করে ফিরে যাওয়া আমরা সমীচীন মনে করছি না। অনেকে বলল, আপনার সঙ্গে অনেক মানুষ ও রাসুল (সা.)-এর মহান সাহাবিরা আছেন। এমতাবস্থায় তাদের নিয়ে আপনি মহামারী আক্রান্ত এলাকায় যাবেন না।

সবার কথা শুনে উমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা চলে যাও।’ অতঃপর উমর (রা.) আমাকে বললেন, ‘আনসারদের আমার কাছে ডেকে আনো।’ তাদের ডেকে পরামর্শ করলেন। তাদের মধ্যেও মুহাজিরদের মতো মতবিরোধ দেখা দিল। তিনি বললেন, ‘তোমরা চলে যাও।’ অতঃপর আমাকে বলেন, ‘এখানে কুরাইশ বংশের প্রবীণ মুহাজির সাহাবিদের ডাক দাও।’ আমি তাদের ডেকে আনি। তাদের মধ্যে দুজনও মতবিরোধ করেনি। সবাই অভিন্ন কথা ব্যক্ত করে বলল, আমরা মনে করছি, আপনি সব মানুষকে নিয়ে ফিরে যাবেন। মানুষকে এই মহামারীতে নেবেন না।’

অতঃপর উমর (রা.) সবাইকে সামনে নিয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘আমি চলে যাব। তোমরাও চলে যাও।’ [তখন সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.)] এ কথা শুনে আবু উবায়দা (রা.) বললেন, ‘আপনি আল্লাহর তাকদির থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন?’ উমর (রা.) বলেন, ‘আহ, হে আবু উবায়দা, এমন কথা তুমি ছাড়া অন্য কেউ বলত!’ মূলত উমর (রা.) তার মতভিন্নতাকে অপছন্দ করেছেন।

পরে উমর (রা.) আবু উবায়দার প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে অন্য তাকদিরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছি। যেমন মনে করো, তোমার অনেক উট আছে। তা নিয়ে তুমি এক উপত্যকায় এসেছ। উপত্যকার দুটি প্রান্ত আছে। এক প্রান্ত উর্বর। আরেক প্রান্ত শুষ্ক। তুমি উর্বর প্রান্তে উট চরালে কি আল্লাহর তাকদিরের ওপর নির্ভর করবে না? এবং শুষ্ক প্রান্তে  চরালেও কি আল্লাহর তাকদিরের ওপর নির্ভর করবে না?’

কিছুক্ষণ পর আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) এলেন। কোনো এক প্রয়োজনে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, এ বিষয় সম্পর্কে আমার জ্ঞান আছে। আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে শুনেছি, ‘তোমরা কোনো অঞ্চলে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা শুনলে তাতে প্রবেশ করবে না। তবে সেখানে থাকাবস্থায় প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়লে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না।’ এ কথা শুনে উমর (রা.) আলহামদুলিল্লাহ বললেন। অতঃপর সবাই ফিরে গেলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৭২৯)

উমর (রা.) মহামারি চরম আকার ধারণের খবর পান। তখন তিনি চাইলেন সেনাপতি আবু উবায়দা (রা.)-কে ফিরিয়ে আনতে। তাই উমর (রা.) একটি চিঠি লিখলেন, ‘তোমার ওপর শান্তি বর্ষণ হোক। তোমার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ সম্পর্কে সরাসরি তোমাকে বলতে চাই। তাই তোমাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলছি, আমার পত্র পড়ে আমার উদ্দেশে বের হওয়ার আগে পত্রটি তোমার হাতছাড়া করবে না। রাতে পত্র পৌঁছালে সকাল হওয়ার আগেই যাত্রা শুরু করবে। আর দিনের বেলায় পৌঁছালে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই যাত্রা শুরু করবে।’ আবু উবায়দা (রা.) পত্র পড়ে উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আমিরুল মুমিনিনকে ক্ষমা করুন।’ অতঃপর উমর (রা.)-এর উদ্দেশে একটি পত্র লেখেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, আমি আপনার প্রয়োজনের বিষয় বুঝেছি। আমি এখন মুসলিম সেনাবাহিনীতে অবস্থান করছি। তাদের ছেড়ে যেতে চাই না। আল্লাহতায়ালা আমিসহ সবার ব্যাপারে ফায়সালা করবেন। অতএব হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার সিদ্ধান্ত থেকে আমাকে মুক্ত করুন। আমার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে আমাকে থাকতে দিন।’

আবু উবায়দা (রা.)-এর পত্র পড়ে উমর (রা.) কাঁদতে শুরু করেন। আশপাশের লোকজন ও সঙ্গীরা ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, আবু উবায়দা কি শহীদ হয়েছেন? উমর (রা.) বলেন, ‘না, তিনি এখনো শহীদ হননি। কিন্তু ...।’ অর্থাৎ শিগগির তিনি শহীদ হবেন।  এর পরই আবু উবায়দা (রা.) প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৭/৪৪

হিজরি নবম শতাব্দীতে পবিত্র মক্কায় মহামারী

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মহামারীর কারণে অনেক সময় মসজিদও বন্ধ ছিল। এমনকি পবিত্র মক্কা নগরীর হারাম শরিফও নিরাপদ ছিল না তখন। তাই সবই জনশূন্য ছিল।

প্রখ্যাত হাদিস বিশেষজ্ঞ আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানি (রহ.) [মৃত্যু:৮৫২ হি.] ৮২৭ হিজরিতে মক্কায় প্রকাশ পাওয়া মহামারীর ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, ‘এ বছরের শুরুতে মক্কায় মহামারী দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন ৪০ এরও বেশি লোক মারা গিয়েছে। শুধু রবিউল আউয়াল মাসে ১৭শয়ের বেশি লোক মৃত্যুবরণ করেছে। ওই সময় কেবল দুজনকে নিয়ে মাকামে ইবরাহিমের সামনে (শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী) ইমাম নামাজ পড়তেনা। আর অন্যান্য মাজহাবের অনুসারী ইমামরা মুসল্লির অভাবে নামাজের ইমামতি করত না। তবে এখানে নামাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকার বিষয়টি সুনিশ্চিত নয়। মৃতের সংখ্যা, অসুস্থ ব্যক্তি ও সংক্রামক রোগ-ব্যাধির কারণে মানুষের উপস্থিতি তেমন ছিল না। কারণ মহামারী সংক্রমণের ভয় সবার মধ্যে। (আনবাউল গুমরি ফি আবনাইল উমুরি, ৩/৩২৬)

হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে তিউনিশিয়ায় মহামারী

সপ্তম শতাব্দীর মরক্কোর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে আজারি মারাকাশি বর্ণনা করেন, ৩৯৫ হিজরিতে তিউনিশিয়াতে মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। ফলে বস্ত্রের সংকট দেখা দেয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। অনেক ধনী নিঃস্ব হয়ে পড়ে। চিকিৎসা, শুশ্রƒষা ও মৃতের দাফনকর্মে সবাই ব্যস্ত ছিল। কাইরাওয়ান নগরীর মসজিদগুলো বিরান হয়ে পড়েছিল।’ (আল বায়ানুল মুগরিব ফি আখবারিল আন্দালুস ওয়াল মাগরিব, পৃষ্ঠা : ২৭৪)

হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে আন্দালুসে মহামারী

প্রখ্যাত হাদিস বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিক ইমাম জাহাবি (রহ.) [মৃত্যু:৭৪৮ হি.] লিখেছেন, আন্দালুসে (বর্তমান স্পেন) ৪৪৮ হিজরিতে কঠিন দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দেখা দিয়েছিল। তখন গ্রানাডায় এত লোকের মৃত্যু হয়েছিল যে, সেখানকার মসজিদগুলো মুসল্লি না থাকায় বন্ধ হয়ে যায়। কর্ডোভা নগরী এ ধরনের দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর সম্মুখীন হয়নি কখনো। তাই এ বছরটি ক্ষুধার বছর হিসেবে পরিচিত।’ (তারিখুল ইসলাম, সিয়ারু আলামিন নুবালা)

পঞ্চম শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ায় মহামারী

আল্লামা ইবনুল জাওজি (রহ.) [মৃত্যু:৫৯৭ হি.] মধ্য এশিয়া ছড়িয়ে পড়া ভয়ংকর মহামারীর কথা বর্ণনা করেছেন। প্রায় ২০ লাখের মতো লোক মৃত্যুবরণ করে এতে। তিনি লিখেছেন, ‘৪৪৯ হিজরির জুমাদাল উখরায় ‘মাওয়ারাআন নাহার’ বা ট্রান্সঅস্কিয়ানার ব্যবসায়ীদের একটি পত্র পাওয়া যায়। সেখানে সীমাহীন কষ্টের এক মহামারী দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন এই অঞ্চল থেকে ১৮ হাজার মৃতদেহ দাফনের জন্য বের করা হয়েছে। এই পত্র লেখা পর্যন্ত  মৃতের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৫০ হাজারের মতো!’

বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি দেশের চিত্রের সঙ্গে তা পুরোপুরি সম্পূরক। তিনি বর্ণনা করেছেন, ‘এই অঞ্চলে মানুষের অবাধ যাতায়াত ছিল। কিন্তু এখন আর মানুষের কোনো চিহ্নও দেখা যায় না। সব বাজার বিরান হয়ে আছে। জনশূন্য পথ-ঘাট। সব ঘরের দরজাও বন্ধ। ব্যবসা-বাণিজ্য ও সব কাজকর্ম থেমে আছে। মানুষের রাত-দিনের পুরো সময় কাটে মৃতলোকদের গোসল ও দাফনের ব্যবস্থা করতে করতে। বেশির ভাগ মসজিদ মুসল্লিশূন্য হয়ে পড়ে আছে।’ (আল-মুনতাজাম ফি তারিখিল উমাম, ১৬/১৭)