সাফ সাফ বলে দিয়েছিলাম ভিড় দেখলেই কিন্তু সোজা বাড়ি চলে আসব। অত ভিড়ে ট্রেনে চেপে ভাষণ দেওয়ার শখ আমার নেই। যাব সেই বহরমপুরে। সেখান থেকে আবার বেশ কতক কিলোমিটার দূরে হরিহরপাড়ার দিকে। আমতলি অন্নদামনি বালিকা বিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে অতিথিগিরি করতে। দোষ আমারই। আগের দিন হাজার দুয়ারি এক্সপ্রেসে এসি কোচে টিকিট ছিল। ছবিটবি করে একটু আধটু পরিচিতি পেয়েছি বলে আজকাল এখানে সেখানে ডাকটাক পাই। রাজি হলে সংগঠকরা এসি কোচেরই টিকিট পাঠিয়ে দেন। মুখে যাই বলি না কেন তারাও জানেন হাজার হোক বাবু ভদ্দরলোক বলে কথা। তাও আবার খোদ কলকাতার। এসি না হলে কি আর মান থাকে!
এবার ভেবেছিলাম যাব না। শরীরটা সত্যি জুুতে নেই। কিন্তু বড় দিদিমণি ডলি বেগম এমন করে ধরলেন যে না করতে পারলাম না। এখন ওই সকালের ট্রেন ছাড়া উপায় নেই। এ এমন ট্রেন যেখানে কোনো এসি কোচই নেই। ট্রেন ছাড়ার অনেক আগে স্টেশনে ঢুকে গেলাম। যাতে আগে আগে পছন্দমতো একটা জানালার ধারে সিট পাই। প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকতে না ঢুকতে সমুদ্র গর্জনের মতো চিৎকার করতে করতে কয়েকশ আছড়ে পড়ল। ধাক্কাধুক্কি চেঁচামেচি সে এক ভয়ংকর অবস্থা। ভিড়ের ধাক্কায় ছিটকে যাচ্ছিলাম। পেছন থেকে কে একজন প্রায় জাপটে ধরে তুলে দিল কামরায়। মনে মনে ভাবছি কেন এলাম! এভাবে আসা আমার ঠিক হয়নি। একটু দূর থেকে কে যেন হাত নেড়ে ডাকছে- ও কাকা এদিকে এসো। তোমার জায়গা রেখেছি তো। বিশুদ্ধ মুর্শিদাবাদী উচ্চারণে এমন আন্তরিকতা, কে বলবে কোন অচেনা একজন অজানা কাউকে ডাকছে। বললাম বটে বিশুদ্ধ মুর্শিদাবাদী উচ্চারণ! কিন্তু এই ভাষাও কি একমাত্রিক! পদ্মা পুরো মুর্শিদাবাদ জেলাকে ভাগ করে দিয়েছে। এক পাড়ে রাঢ়। অন্যপারে বাগড়ি। ভাষা এক হলেও আঞ্চলিক ডায়লেক্ট আলাদা আলাদা। মুর্শিদাবাদে ও মালদার কিছু জায়গায় ‘খোট্টাবুলি’ চালু আছে। তারা আমিকে বলে হামি। আমরা-কে বলে হামরা। রাস্তাকে ডহর, ডোবার উচ্চারণ গুড়হ্যা। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অসাধারণ উপন্যাস ‘মায়া মৃদঙ্গ’র অন্যতম মুখ্য চরিত্র ঝাকসু সর্দার এই খোট্টাবুলিতেই কথা বলতেন।
তা হাঁকডাক করে নতুন পাওয়া ভাইপোর কাছে যেতে না যেতেই শুনি অন্য দু’একজনের সঙ্গে তার বেদম ঝগড়া লেগে গেছে জানলার ধারে সিট নিয়ে। পরম যতœ করে রুমাল দিয়ে সে কাকার সিট রেখেছে। সেই সিটে জোর করে কে একজন বসতে যেতেই তর্কাতর্কি। গুটি গুটি পায়ে এগোতেই ভাইপো মহাখুশি। বিরোধী পক্ষ হার মেনে নিয়ে চুপ করে গেল। সিটে বসতেই একগাল হেসে ছেলেটি বলল- বলে কিনা কাকা নেই। আমি মিছে কথা বলে সিট দখল করছি। আরাম করে বসার পরে ভালো করে ‘ভাইপোর’ দিকে তাকালাম। রোগাপাতলা সাধারণ চেহারা। বয়েস খুব বেশি হলে চব্বিশ-পঁচিশ। সাজের খুব বাহার। ঝলমলে নতুন শার্ট। বাহারি জিনস। হাতে দামি ঘড়ি। কেতাদুরস্ত মোবাইল। ততক্ষণে নাম জেনে নিয়েছি, সাবির। পলাশী থেকে দশ কিলোমিটার দূরের মহম্মদপুর গ্রামে থাকে। তিন মাস বাদে বাসায় ফিরছে কেরলের কোজিকোড় থেকে। ওখানে ও কাজ করে তিন বছর ধরে এক রিয়েল এস্টেটের ঠিকাদারের কাছে। যা টাকা পায় তাতে দিব্যি চলে গিয়েও হাতে যা থাকে তা বাড়িতে পাঠায়। নতুন দুটো ঘর তুলবে বলে এবার বাড়ি যাচ্ছে। বললাম নতুন ঘর তুলবে কেন! সাবির একটু যেন লজ্জা পায়। ‘দু-তিন মাস বাদে শাদি করব, তাই।’
ঢিকির ঢিকির করে লালগোলা প্যাসেঞ্জার চলেছে। যে সময়ের কথা বলছি তখনো বাতাসে শীতের আমেজ ছিল। কনকনে ঠা-া নয়। বরং এটুকু শীত ভালোই লাগছিল। সময় অবশ্য কেটে যাচ্ছে। বার দু’এক বহরমপুর থেকে ইতিমধ্যেই ফোন এসেছিল। উদ্বিগ্ন ফোন অতিথির না জানি কত কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে। আমার কিন্তু বেশ লাগছে। ‘লালগোলা প্যাসেঞ্জার’ কি শুধু একটা ট্রেন বা মুর্শিদাবাদের লাইফলাইন! এ এক চলমান মহাকাব্য। কত লোকের কত স্মৃতি, আবেগ, যন্ত্রণা, আনন্দ, বিরহ সব জড়িয়ে আছে সাদামাটা এই ট্রেনটির সঙ্গে। একেকটা স্টেশনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অবিভক্ত বাংলার কত আবেগ। ইতিহাস-রাজনীতি-সমাজনীতির জানা-অজানা বহু আখ্যান।
সামনে পলাশী। ১৭৫৭ সালে সিরাজউদ্দৌল্লাহর হেরে যাওয়ার পর থেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল এই পলাশীর প্রান্তর থেকেই। বস্তুত ওই সময় থেকেই বাঙালি মুসলমানের বিপর্যয়ের সূচনা। যা চূড়ান্ত মাত্রা নেয় লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর। গ্রামীণ ভূস্বামী হয়ে আবির্ভাব ঘটে উচ্চ বর্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের। মুসলিম ও নিম্নবর্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবনতি ঘটতে থাকে।
ভিড় কিন্তু সেভাবে এখনো কমেনি। সাবির আমাকে বুঝিয়েছে- কাকা এ ট্রেনে সবাই আমরা বন্ধুরা ফিরছি। কেউ দিল্লি, ছত্তিশগড়, তামিলনাড়–, হরিয়ানা বা কেরল থেকে। তাই এত ভিড়। এসময় কাজ একটু কম থাকে বলে দু’চারদিনের জন্য ‘দেশে’ ফিরি। ঘর তুলতে, ঘর সারাতে, বা ছোট ছেলের আকিকা দিতে। আকিকা বোঝো কাকা! ওই যে গো মুসলমানি। আমরা শহরের বাবু। আকিকাও যা মুসলমানিও তাই-ই। কী হবে এসব বুঝে। তখন বরং কোনো ইংরেজি কাগজে ‘পরিযায়ী’ শ্রমিকদের নিয়ে ফিচার লিখলে কাজ দেবে।
সাবিরের অনেক বন্ধুও ততক্ষণে ভিড় জমিয়েছে কাকার সঙ্গে গল্প করতে। কত কত নাম। জহির, তাহের, সুজা, সেলিম, আব্দুল, রহমান, নাজমুল এরকম অজস্র। একরকম চেহারা। সাজগোজ। বয়েস। মুখের হাসিও সবার এক। কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ হোটেলের, কেউ আবার ইটভাটার। আরও অনেকে আছেন যারা চাষের কাজ করতে পাঞ্জাব হরিয়ানায় গ্রামে গ্রামে যান। ভারতের তথাকথিত যে সবুজ বিপ্লব তার পেছনে আমাদের ঘরের মালদা-মুর্শিদাবাদের অবদানও কিন্তু কম নয়।
এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকদের নব্বই শতাংশ মুসলিম। বাকি দশ শতাংশ নিম্নবর্গের হিন্দু।
পলাশী চলে যাচ্ছে। আড়চোখে তাকালাম আশপাশের তরুণদের দিকে। জানতে ইচ্ছে হলো এই তরুণদের পূর্বপুরুষরাই কি একদিন এই পলাশীর মাঠে বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন নবাবের হয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে!
স্বাধীনতা-উত্তর মুর্শিদাবাদ কখনো উন্নয়ন দেখেনি। নব্বই দশকেও গ্রামের পর গ্রামে ছিল না পাকা বাড়ি। অধিকাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। পাকা রাস্তা স্বপ্নের ব্যাপার। মনে রাখবেন ওই সময়ে, নব্বই দশকে ভারতে মুক্ত অর্থনীতির সূচনা। গড়ে উঠতে লাগল নিউ ইন্ডিয়া। ঝা চকচকে শহর, হাইওয়ে, শপিং মল, হাইরাইজ, উঁচু উঁচু বহুতল। নব্য পুঁজি দুভাগ করে দিল ‘ইন্ডিয়া’ আর ‘ভারত’-কে। ইন্ডিয়া যত ঝলমলে হতে লাগল ততই অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে পিছু হটতে লাগল বিবর্ণ ভারত। নতুন হালফ্যাশনের ইন্ডিয়া গড়ে তুলতে দুটো পয়সা পাবে বলে মুর্শিদাবাদ জেলার গ্রামের পর গ্রাম থেকে লেখাপড়া না জানা গরিবস্য গরিব ঘরের কিশোর তরুণদের ঠিকাদার আড়কাঠিরা উজাড় করে নিয়ে আসতে লাগল।
ন্যূনতম শ্রমিক আইন না মেনে দশ-বারো ঘণ্টা খাটতে বাধ্য হতো এই শ্রমিকরা। দিল্লি কেরলের অনেক মহল্লায় খুব কাছ থেকে দেখেছি এই অতিথি মজুরদের। এক একটা ছোট্ট ঘরে দশ-পনেরো জনের গাদাগাদি করে থাকা। তবু পয়সার জন্য দিনের পর দিন টিকে থাকা। রক্ত জল করা ওই টাকাতেই বাড়ি দোতলা, পাকা হয়েছে। বোন মাধ্যমিক দেবে এবার। ভাই সাইকেল কিনেছে। আব্বা হজে যাবে ঠিক করেছেন। মুরব্বিরা ধরেছেন, ‘বাবা মসজিদটা এবার একটু বড় না করলে আর মান থাকছে না।’ গ্রামের মান রাখতে পাঁচশ-হাজার টাকা চাঁদা দিতেই হয়।
‘লালগোলা প্যাসেঞ্জার’ ছিয়াত্তর-সাতাত্তর সালেও কত খালি থাকত। তখন ভাড়া ছিল সাত টাকা আটাশ পয়সা। এখন হয়েছে বোধহয় পঞ্চাশ টাকা। জানালার ধারে বসে একমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি। কী চমৎকার সবুজ ধানক্ষেত। সামনে বেলডাঙার ফুলকপির খ্যাতি সারা দেশে। বেলডাঙার গরুর হাটেরও নাম গোটা রাজ্যে। এ ট্রেনে উঠলেই কেমন যেন মায়ের কথা মনে পড়ে। কোন ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে বহরমপুরে যেতাম। বাবা ছিলেন বামপন্থি শ্রমিক নেতা। গ্রেপ্তার হওয়ার পর দীর্ঘদিন ছিলেন বহরমপুর জেলে। ছোট্ট আমাকে নিয়ে মা সেখানে যেতেন। মুর্শিদাবাদকে অবশ্য মা দেখতে পারতেন না। দেশভাগের সময় কথা ছিল খুলনা ভারতে আর মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানে যাবে। মা’র খুলনাকে, প্রিয় রূপসা নদী, ভৈরব নদ, কোর্ট চত্বর, করোনেশন স্কুলকে গল্প শুনে শুনে কখন যেন আমিও ভালোবেসেছিলাম। ফলে মুর্শিদাবাদের প্রতি অনেক দিন অবধি একটু চাপা রাগই ছিল। অথচ এখন এই পরিণত বয়সে মুর্শিদাবাদ আমার বড্ড ভালোবাসার। চাই বা না চাই দেশভাগের ক্ষত এখনো দুই বাংলায় দগদগে ঘা হয়ে রয়ে গেছে।
একদা সমৃদ্ধির লালগোলা, ভগবানগোলা আজ সামান্য এক জনপদ মাত্র। গৌড় বঙ্গের সাবেক রাজধানী কর্ণসুবর্ণ বা কানসোনা আজ ধূসর স্মৃতি। মুর্শিদ কুলী খাঁর সাধের মকসুদাবাদ কবেই হারিয়ে গেছে। অতীত বিবর্ণ। মুর্শিদাবাদের রমরমা নিছক গল্পকথা মাত্র। এখন তার কত পরিচয়। সীমান্তে গরুপাচার নদী ও সড়ক পথে চোরাচালান আর সারা দেশের নির্মাণ শিল্পে অসংগঠিত শ্রমিক জোগান দেওয়া। কোনো একটা নদী চলে গেল। কত নদী এ জেলায়। পদ্মা, গঙ্গা, জলঙ্গি, ভৈরব, বাবলা আরও কত ছোট-বড় জলরাশি। ভগবানগোলা ছিল একদা সমৃদ্ধ বন্দর। বাণিজ্য নৌকার আনাগোনা ছিল ঢাকা, রাজশাহী খুলনা থেকে এ তল্লাটে।
এপারে কাহারপুর, শেখপাড়া। ওপারের রাজশাহী সদরে আলো দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট ভাবে। লালগোলার উল্টোদিকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী। সামনে বহরমপুর। নেমে যাব। এবার আর ভগবানগোলা জঙ্গিপুর লালগোলা যাওয়ার সময় হবে না। একে একে কখন সেলিমরা নেমে গেছে টেরও পাইনি। সাবির এখনো আছে। কত্ত বড় স্টেশন এই বহরমপুর। সাবির এত লোকের ভিড়ে হাত নাড়তে নাড়তে কোথায় যেন চলে গেল।
করোনা লকডাউনে বসে বসে টিভি দেখছি। চাকরি খুইয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটছে বিভিন্ন রাজ্যের শ্রমিকরা। কারো কারোর সঙ্গে বউ বাচ্চা। অনেকের কোলে শিশু। টিভি চ্যানেল সব দেখাচ্ছে। কাগজে কাগজে কত লেখা। ড্রইংরুমে কত আফসোস। আমি কিস্যু শুনতে পারছি না। শুধু একদৃষ্টিতে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে আছি। চোখের সামনে ভাসছে সেই লালগোলা প্যাসেঞ্জারের দিন। কত কত তরুণ মুখ। যারা নিমেষে আপন করে নিয়েছিল সেদিন। আমার সেলিম, সাবির, জাহির, জাহাঙ্গীরেরা সবাই ভালো আছে তো!!!
লেখক
ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
sdastidar27@gmail.co