করোনাকালে দেশের কথা ভাবেন রুমি

আশির দশকের শেষ থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যে ক’জন ফুটবলার ঢাকার মাঠ মাতিয়েছিলেন তাদের একজন রিজভী করিম রুমি। আবাহনীর জার্সিতে দেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে রেখেছিলেন অবদান। হুট করেই দেশত্যাগে ফুটবল থেকে বিদায়টা সেভাবে হয়নি। এখন সপরিবারে থাকেন সুদূর কানাডায়। করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ সময় বাসাতেই কাটছে তার। এই সুযোগে ফুটবলের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে রুমির। প্রচারবিমুখ এই ফুটবল তারকার সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে নিজের বর্ণময় ক্যারিয়ার, ফুটবলের অতীত-বর্তমান, বিদেশের মাটিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার গল্প। আলোচনার চুম্বক অংশ দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য প্রশ্ন-উত্তরে সাজিয়েছেন সুদীপ্ত আনন্দ

প্রশ্ন : কেমন কাটছে দিনকাল?

রুমি : এখন তো সবাই ঘরবন্দি। টরোন্টোতে অবশ্য পুরোপুরি লকডাউন হয়নি। দু’জন একসঙ্গে চলাফেরা করা যায় বিশেষ প্রয়োজনে। তবে আমরা কেউই সেভাবে বের হইনি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে যাওয়া ছাড়া। কাজকর্ম নেই বলে এখন সুযোগ হয় অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ করার। কানাডা সরকার নাগরিকদের অনেকরকম সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ঘরেই থাকতে বলেছে। বিশেষ ভাতা দেওয়া শুরু করেছে। এমনিতে ভালোই আছি। তবে দেশে বাবা-মা, ভাইবোনদের জন্য খুব দুশ্চিন্তা হয়।

প্রশ্ন : ছেলে তো একটাই আপনার। নিশ্চয় অনেক বড় হয়ে গেছে?

রুমি : ওর (রিয়ান রিয়াসাত করিম) এখন ২২ বছর চলছে। দেড় বছরের রেখে কানাডা চলে এসেছিলাম। সাড়ে চার বছর বয়সের সময় ওকে আর ওর মাকে নিয়ে আসি। ও এখানকার পরিবেশেই বেড়ে উঠেছে।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের স্বর্ণালি সময়টায় আপনার অনেক ভক্ত ছিল। অনেক মেয়ে ভক্তও ছিল নিশ্চয়। ভাবি কী তাদেরই একজন?

রুমি : (হাসি)। তা নয়। বিআরটিসিতে খেলা অবস্থাতেই মানুষ আমাকে চিনতে শুরু করে। আবাহনীতে আসার পর তো অনেক ভক্ত। মেয়েরা অনেক চিঠি লিখত। তখন তো আর মোবাইল ছিল না। প্রতিদিন গাদাগাদা চিঠি পেতাম। উত্তরও দিতাম। সেই ভক্তরা অবশ্য খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। কারণ তারকা হওয়ার আগেই আপনার ভাবীর (শামীমা ফেরদৌস সিমু) সঙ্গে সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। সেই গল্পটাও মজার। খুলনা থেকে ঢাকা আসার পথে বাসে ওর সঙ্গে পরিচয়। সেখান থেকেই মন দেওয়া-নেওয়া। আমাকে নিয়ে যখন অনেক আগ্রহ মেয়ে ভক্তদের, তখন একদিন পত্রিকায় জানিয়ে দিলাম আমাদের প্রেমের কথা। হা হা হা।

প্রশ্ন: এবার ক্যারিয়ারটা নিয়ে কিছু বলুন। খেলা তো শুরু খুলনা থেকেই?

রুমি : ছোটবেলা থেকেই খেলা দেখতাম প্রচুর। সে সময় খুলনা স্টেডিয়ামে সালাম মুর্শেদী ভাই, গাফফার ভাইদের মতো বড় তারকারা খেলতে আসতেন। হাজার হাজার মানুষের তাদের নিয়ে উন্মাদনা দেখে বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। আমার বেড়ে ওঠা খুলনা বিএল স্কুলের ক্যাম্পাসের ভেতরে। বাবা সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ক্যাম্পাসের ভেতরে বিশাল মাঠ। সারাক্ষণ বল নিয়ে পড়ে থাকতাম। ১৯৮৩ সালে তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। পাড়া-মহল্লায় ভালো খেলার সুবাদে একটু পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলাম। সাবেক ফুটবলার ও সংগঠক দারা ভাইয়ের মাধ্যমে খুলনা জুট মিলের হয়ে প্রম বিভাগে নাম লিখাই। পরের বছর দারা ভাই, কাসেম ভাই আর মাণ্ণান ভাইয়ের মাধ্যমে ঢাকায় প্রম বিভাগের দল সাধারণ বীমায় নাম লিখাই। প্রম বছর অবশ্য লিগে সেভাবে খেলার সুযোগ পেতাম না। তবে লিগ শেষে ডামফা কাপ হলো। সেখানে দলের প্রধান স্ট্রাইকার রাজ কুমার দা’র চোটের কারণে দ্বিতীয় ম্যাচে প্রম একাদশে সুযোগ পেয়েই হ্যাটট্রিক করি। ছয় গোল করে সেরা গোলদাতা হয়েছিলাম। পরের দু’বছর সাধারণ বীমায় খেলার পর ১৯৮৭ সালে চলে আসি বিআরটিসিতে। আমাদের ক্যাম্প ছিল স্টেডিয়াম লাগোয়া বিআরটিসি ভবনের নিচতলায়। পাশেই ছিল শিল্প ব্যাংক ভবন। সেখানে চাকরি করতেন আবাহনীর কর্মকর্তা প্রফেসর শাহ আলম ভাই। প্রায়ই আমাদের ক্যাম্পে এসে গল্প করতেন। সেবার বিআরটিসি’র কাছে হেরে আবাহনী ফেডারেশন কাপের ফাইনালের আগেই বিদায় নিলে শাহ আলম ভাই এবং আরেক কর্মকর্তা মনজুর কাদের ভাই উঠে পড়ে লাগেন আমাকে আবাহনীতে নেওয়ার জন্য। ১৯৮৮ সালে আবাহনীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই। তখন আবাহনীর ফ্রন্টলাইনে আসলাম, প্রেমলাল আর ওয়াসিম। আমার খেলার সুযোগ কই। প্রম বছরটা অনুশীলন করেই কাটল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে বাংলাদেশ লাল দলে সুযোগ পেয়ে যাই। দ্বিতীয় ম্যাচে প্রম একাদশে সুযোগ পেয়েই জোড়া গোল করি। এরপর আবাহনী পরের মৌসুমের জন্য চুক্তি করে আমার সঙ্গে। ১৯৮৯ থেকে নিয়মিত হয়ে যাই আবাহনীর একাদশে। তারকাখ্যাতিও পেযে যাই। আবাহনীতে টানা ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খেলে এক মৌসুমের জন্য মুক্তিযোদ্ধায় চলে গিয়েছিলাম। এরপর আবাহনীতে ফিরে ১৯৯৮-এ ধানমন্ডি ক্লাবের হয়েই শেষ ম্যাচ খেলি। আনুষ্ঠানিক অবসর অবশ্য নিতে পারিনি, কারণ হুট করেই দারা ভাইয়ের মাধ্যমে আমেরিকা হয়ে কানাডায় চলে আসি। জাতীয় দলেও যতদিন খেলেছি, নিয়মিতই ছিলাম। মনে আছে আমার জোড়া গোলেই বাংলাদেশ প্রম ভারতকে হারানোর স্বাদ পেয়েছিল ১৯৯১ সালে কলম্বো সাফ গেমসে।

প্রশ্ন : আবাহনী-মোহামেডান লড়াই তখন চিরদিন মনে থাকবে?

রুমি : আসলে এটা বলে বোঝানোর মতো নয়। ম্যাচের ৩-৪ দিন আগে থেকে সমর্থকদের মতো ভক্তদের মধ্যেও একটা চাপা উত্তেজনা শুরু হয়ে যেত। হাজার হাজার দর্শকের সামনে এই ম্যাচটা যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নিত। আমরাও কেবল জয়ের জন্য খেলতে নামতাম। মনে আছে, একবার আসলাম ভাই কী কারণে যেন সেরা একাদশে নেই। সবাই বলতে শুরু করেছিল, আবাহনী ম্যাচটা হেরে যাবে। কিন্তু আমি জোড়া গোল করে আবাহনীকে (২-১ এ) জিতিয়েছিলাম। সেই জয়টা আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে।

প্রশ্ন : আবাহনীতে আপনার আগাগোড়া রুমমেট ছিলেন মোনেম মুন্না...

রুমি : প্রম দিন থেকেই মুনড়বা ভাইয়ের রুমমেট ছিলাম। সে কারণেই তার সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল গভীর। ভাইয়ের সম্পর্কও বলতে পারেন, বন্ধুর সম্পর্কও। মুনড়বা ভাইয়ের কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছি। মুন্না ভাই ছিলেন বিশাল বড় হৃদয়ের মানুষ। আর মাঠে জান দিয়ে খেলতেন। ডিফেন্সে ছিলেন দুর্দান্ত। তবে প্রতিপক্ষ হিসেবে আমার চোখে দেশসেরা ডিফেন্ডার কায়সার হামিদ ভাই। উনি আমার দেখা সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার ফুটবলার।

প্রশ্ন : দেশের ফুটবল থেকে অনেক দূরে আছেন। দেশের ফুটবল তো এখনো ভাবায়?

রুমি : দেশের ফুটবল নিয়ে সেভাবে কথা বলি না। তবে সুযোগ করে দেশের খেলা ঠিকই দেখি। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ভারত আর কাতারের বিপক্ষে দারুণ খেলেছে ছেলেরা। এমন ভালো ফুটবল খেলছে, অথচ দেশের ফুটবল কেন এতটা পিছিয়ে রয়েছে, বুঝি না। আমার মনে হয়, ফুটবলের ক্রম অবনতির জন্য এক জেলা, এক লিগ এবং পুলপ্রার মতো কতগুলো আইন দায়ী। ফুটবলটা সারা দেশে না ছড়ালে ভালো মানের ফুটবলার পাওয়া যাবে না কখনই। আমি জানি না, সালাহউদ্দিন ভাইসহ একঝাঁক সাবেক ফুটবলার কেন ফুটবলের উণ্ণতি করতে পারছেন না।