কোনো নিয়মই মানা হয়নি ১০ টাকার চাল বিক্রিতে

১০ টাকা কেজি দরের বিশেষ ওএমএসের অনিয়মে রাশ টানতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বন্ধই করে দিল সরকার। শিগগিরই এ কর্মসূচি নিয়ে ফিরে আসার কথা বলা হলেও কবে নাগাদ তা আবার মাঠে গড়াবে সেটা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না খাদ্য অধিদপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

শুরু থেকেই এ কর্মসূচিতে নানা অনিয়ম ছিল। কারা চাল পাবে তার কোনো তালিকা করা হয়নি। চাল কিনে তা কালো বাজারে বিক্রি ঠেকানোর কোনো কৌশলও নেওয়া হয়নি। এক পরিবার থেকে একাধিক ব্যক্তি চাল নিলে তা কীভাবে ঠেকানো হবে তা জানা ছিল না কর্মকর্তাদের। তাই চড়া বাজারদরের মধ্যে এ চাল বিক্রি করতে যাওয়ার পর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিও ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে। সরকারের হাতে এখন ধান, চাল ও গমের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। গত ২৬ মার্চ থেকে সব সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত বন্ধ রয়েছে। চলমান টানা ছুটি শুরু হওয়ার আগের কর্মদিবসে সরকারের গুদামে মজুদ ছিল ১৩ লাখ ৮৬ হাজার টন চাল ও ৩ লাখ ৭ হাজার টন গম। চাল ও গমের মোট মজুদের পরিমাণ ১৬ লাখ ৯৩ হাজার টন। গত বছর এ সময়ের তুলনায় ২ লাখ টনের বেশি মজুদ রয়েছে। তার ওপর এখন বোরোর ধান কাটা চলছে। এ বছর বোরোর বাম্পার ফলন হওয়ায় সরকারের সরবরাহ লাইনে কোনো সমস্যা নেই।

গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে টানা ছুটি শুরু হয়েছে। এ ছুটির মধ্যে দেশের কর্মক্ষম মানুষের সবচেয়ে বড় অংশ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। যানবাহন, বেশিরভাগ কলকারখানা, বিভিন্ন উন্নয়ন কাজসহ প্রায় সবকিছু বন্ধ। এ অবস্থার কারণে যারা দিন এনে দিন খায় তাদের সমস্যা সবচেয়ে বেশি। সরকারের ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রি কর্মসূচিতে তারা আশার আলো দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু চুরির ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে না পারার কারণে কর্মসূচিই বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এত ভালো মজুদ দিয়ে কী হবে, তা যদি এ বিপদের দিনে কাজে না আসে। তাই আমরা শিগগিরই ফিরে আসব। কীভাবে ফিরে আসা যায় তা আমরা খতিয়ে দেখছি। ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণের সময় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা হচ্ছে না। আমরা প্রথম থেকেই এ আশঙ্কা করেছিলাম। এজন্য আমরা বলেও দিয়েছিলাম যেন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। তালিকা করে আরও কিছুদিন পরে দিতে চেয়েছিলাম। এর মধ্যে ডিসিদের তালিকা করতে বলেছিলামও। যারা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধা ভোগ করছে বা ভিজিডিসহ অন্য কোনো কর্মসূচি ভোগ করছে তাদের বাদ দিয়ে একটা ফ্রেশ তালিকা করতে বলেছিলাম। আমরা তিন বা চার মাসের জন্য একটা কার্ডও করে দিতে বলেছিলাম। এ কার্ড থাকলে সুবিধা হতো ডিলারের কাছে যখন যাবে তখনই সে তার চাল নিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু তাড়াহুড়ার কারণে কার্ড ছাড়াই তা দেওয়া হয়েছে। তাড়াহুড়া কারে চালু করার ফলে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। সামাজিক দূরত্ব থাকছে না।’

এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার উপায় কী জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তালিকা না করতে পারলে তা জিআর কর্মসূচিতে কনভার্ট করা যায়। তখন প্রাপ্যতা অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া যাবে।’ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে যেখানে অনিয়ম হয়েছে সবই তদন্ত করা হবে। কিন্তু তদন্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রককে বরখাস্ত করার জন্য আজই আমি মহাপরিচালককে নির্দেশ দিয়েছি। তাদের ওই জায়গায় বসিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে না।’

খাদ্য অধিদপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তালিকা না করে এ চাল বিক্রি করতে যাওয়া ছিল বড় ভুল। যেখানে বাজারে মাঝারি মানের বিআর ২৮ বা পারিজা চালের কেজিপ্রতি দাম ৪৫ টাকা সেখানে ১০ টাকা কেজি দরের চাল নিয়ে হুলুস্থুল অবস্থার সৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক। এখানে ক্রেতারা যেমন ভিড় জমাবেন তেমনি ডিলার বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এখানে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ চাল বিলি করতে গিয়ে সরকারের সুনামের চেয়ে দুর্নাম হয়েছে বেশি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমানারা খানুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ চাল কিনতে কোনো ধরনের কার্ডের বাধ্যবাধকতা না রাখায় অনেক মানুষ চাল কিনতে ভিড় জমাচ্ছিলেন। এর মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আপাতত এ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে এ বিশেষ ওএমএস কার্যক্রম আবার শুরু করা হবে। করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়ানোর সম্ভাবনা এবং যেহেতু অন্যভাবে চাল দেওয়া হচ্ছে, তাই এটার মিস ইউজ হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। বিভিন্ন জায়গায় মিস ইউজও হয়েছে, এজন্য এটা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছি। যখন প্রয়োজন হবে তখন চালু করব। বিশেষ ওএমএস পরিচালনায় নীতিমালায় কার্ডের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও পরে তা বাদ দেওয়া হয়েছিল। কারণ এখন কার্ড করতে গেলে কর্মহীনদের কষ্ট হবে। তবে এ কার্ড তুলে দেওয়ায় চাল বিক্রির জায়গায় ক্রেতাদের ভিড় এমনভাবে হয়ে যাচ্ছে যে রোগটা ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার হিসাবও থাকছে না, কে কিনছে, কেউ হয়তো পাচ্ছে না আবার কেউ প্রতিদিন কিনছে। এখানে বড় সমস্যাটা হয় অনেক বড় লাইন হয়ে যায়। যতটুকু চাল বিতরণের জন্য আনা হয় তার থেকে অনেক বেশি লোক জড়ো হয়।