আত্মসাৎ হারাম

বিভিনড়ব সময়ে আমাদের দেশে সরকারি বেসরকারি বিভিনড়ব সম্পদ আত্মসাৎ করার খবর পাওয়া যায়। করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে সাধারণ দিনমজুর ও অভাবী মানুষদের জন্য দেওয়া সরকারি ত্রাণদ্রব্যেও বিভিনড়ব আত্মসাতের খবর সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে।

মূলত মুমিন কখনো আমানত আত্মসাৎ করতে পারে না। কেননা আমানতদারিতা ইমানের বড় অংশ। নবী করিম (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে সবার মাঝে সত্যবাদী ও আমানদার উপাধিতে সুপরিচিত ছিলেন।

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) আমাদের এরূপ উপদেশ খুব কমই দিয়েছেন যাতে এ কথা বলেননি যে ‘যার আমানত নেই তার ইমানও নেই এবং যার অঙ্গীকারের মূল্য নেই তার দ্বীনও নেই।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১২৫৬৭, মিশকাত, হাদিস : ৩৫)

বস্তুত, ইমানের আবশ্যিক দাবি হলো মানুষ বিশ্বস্ত হওয়া। সরকারি-বেসরকারি সবধরনের আমানত আত্মসাৎ না করা। আমানত আত্মসাৎ করা হাদিসে মুনাফিকের আলামত বলা হয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে, সে পূর্ণাঙ্গ মুনাফিক। এবং যার মধ্যে তার একটি থাকবে, সে এটি পরিহার না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থাকবে ১. যখন তার কাছে কিছু আমানত রাখা হয় সে তাতে খেয়ানত করে। ২. সে যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে। ৩. যখন ওয়াদা করে, তা ভঙ্গ করে এবং ৪. যখন কারও সঙ্গে ঝগড়া করে, তখন সে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৬)

আমানতের মর্মকথা

হাদিসটির মাধ্যমে বোঝা গেল যে, কাউকে কোনো কাজ বা বস্তুর দায়িত্ব নিয়ে কর্তৃপক্ষ যদি নিশ্চিন্ত থাকে যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ধরনের অবহেলা বা ত্রুটি-আত্মসাৎ করবে না; তাহলে এটাই আমানত। আমানতের এই মর্মকে সামনে রাখা হলে অসংখ্য বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। বর্তমানকালে আমানতের বিষয়টিকে খুব সীমিত মনে করা হয়। আমাদের মন-মস্তিষ্কে আমানতের কল্পনা হলো, ‘কেউ টাকা-পয়সা নিয়ে এসে বলল এই টাকাগুলো আপনার কাছে আমানতস্বরূপ রেখে দিন। যখন প্রয়োজন হবে তখন আপনার কাছ থেকে নিয়ে নেব।’ আমানত এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। আমানতের মর্মার্থ অনেক ব্যাপক। অনেক জিনিস আমানতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। যে বিষয়গুলো আমাদের মাথায়ও আসে না। জমা রাখা টাকা-পয়সার সংরক্ষণ করা এবং হুবহু টাকাগুলো এ অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া, মানুষের মান-সম্মান রক্ষা করা, কারও হক বাকি থাকলে পরিশোধ করা, কারও হক নষ্ট না করা, ধোঁকা না দেওয়া, কারও আমানত বা সম্পদ আটকিয়ে না রাখা, কর্মস্থলে অবহেলা না করা, কারও গোপন কথা জানা থাকলে অন্য কাউকে না বলা ইত্যাদি এসব বিষয়ও আমানতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

আত্মসাৎ অনেক বড় অপরাধ

আত্মসাৎ করা মারাত্মক গুনাহ ও জঘন্য অপরাধ। মালিক ক্ষমা না করলে এ গুনাহ আদৌ ক্ষমা হবে না। আত্মসাৎকারীকে অবশ্যই জাহানড়বামে যেতে হবে। জায়েদ ইবনে খালিদ জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধে জনৈক ব্যক্তি কোনো দ্রব্য আত্মসাৎ করে। পরে সে মারা গেলে মহানবী (সা.) তার জানাজা পড়াননি। তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের এ সঙ্গী আল্লাহর পথের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে।’ বর্ণনাকারী বলেন, আমরা তার জিনিসপত্র তল্লাশি করে তাতে একটি রেশমি বস্ত্র পেলাম, যার মূল্য হবে দুই দিরহাম। (তিরমিজি, মিশকাত, পৃষ্ঠা : ২৪২)

পবিত্র কোরআন আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা আল্লাহর সঙ্গে ও রাসুলের সঙ্গে খেয়ানত কোরো না এবং তোমরা জেনে-শুনে পারস্পরিক আমানতে খেয়ানত করো না।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ২৭)

আমানতের আত্মসাৎকারী মুনাফিক। মুনাফিকদের ব্যাপারে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিংসন্দেহে মুনাফিকরা জাহানড়বামের সর্বনি¤ড়ব স্তরে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৪৫)

আত্মসাতের বিষয়ে কোরআনের অনেক আয়াত রয়েছে। প্রচুর হাদিসে এ ব্যাপারে বিশ্লেষণ রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মানুষ জিহাদ-সংগ্রাম করতে করতে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে যাবে, তার সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। কিন্তু আমানত পরিশোধে ত্রুটি করে থাকলে, এই শাহাদাতবরণ তার গুনাহ মাফের কারণ হবে না।

আত্মসাৎ করা হারাম

আত্মসাৎকারী কখনো বাহ্যত আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হলেও জানড়বাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) আমার কাছে বর্ণনা করে বলেন, খাইবার যুদ্ধের দিন নবী (সা.)- এর ক’জন সাহাবি এসে বলতে লাগলেন, অমুক অমুক শহীদ হয়ে গেছেন। অবশেষে তারা আরেকজন লোকের পাস দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, অমুকও শহীদ হয়ে গেছে। তখন রাসুল (সা.) বললেন: ‘কখনো নয়। সে একখানা চাদর অথবা (বলেছেন) একটি জুব্যুদ্ধলব্ধ মাল থেকে আত্মসাৎ করার কারণে আমি তাকে জাহানড়বামের আগুনের মধ্যে দেখতে পেয়েছি।’

দেখুন, একজন সাহাবির ব্যাপারেও মহানবী (সা.)-এর কত কঠোর বিধান ঘোষিত হয়েছে। তাই আসুন আমরা আমানত যথাযথ আদায়ের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের আমানত রক্ষা করি। আত্মসাতের ভয়াবহতা থেকে বেঁচে থাকি। তাহলেই আমাদের জীবন, সমাজ ও দেশ হবে সুন্দর।