৮০০+৫৩৪+১৩=১৩৪৭। এর সঙ্গে যোগ করুন আরও ১৩৭৪, ৬৮২ ও ১৭৯। দাঁড়াল ২২৩৫। দুই যোগফলের সমষ্টি ৩৫৮২। এটা মুত্তিয়া মুরালিধরনের পুরো ক্যারিয়ারে সব ফরম্যাটে ঘরোয়া-আন্তর্জাতিক মিলিয়ে উইকেটপ্রাপ্তির সংখ্যা। অসম্ভবের এমনই উত্তুঙ্গ চূড়ায় বসে আছেন লঙ্কার অফস্পিন জাদুকর যে, আপনার মনে হতেই পারে আর কারও পক্ষে এত উইকেট দখল করা সম্ভব নয়। টেস্টে অদূর ভবিষ্যতে কেউ মুরালির ৮০০ উইকেটের পাহাড় ডিঙাতে পারবে না তা নিশ্চিত। ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টির হিসাব আলাদা।
এখন এত বেশি খেলা হয় যে কেউ দুই ফরম্যাট মিলে এক হাজার উইকেটও পেতে পারে। তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মুরালির ১৩৪৭ উইকেটের রেকর্ড কী হুমকির মুখে? প্রশ্নের উত্তর সময়ের হাতে ছেড়ে বর্তমানের জানালা দিয়ে সুদূর অতীতে ফেরা যাক এটা জানানোর জন্য যে, ক্রিকেট ইতিহাসে মাত্র দুজন বোলার আছেন যারা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মুরালির চেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন। একজন ইয়র্কশায়ারের বাঁহাতি স্পিনার উলফ্রেড রোডস, যার শিকার ৪২০৪টি। এর সঙ্গে ৫৮ টেস্টের ১২৭ উইকেট যোগ করলে রোডসের উইকেট হবে ৪৩৩১।
অন্যজন কেন্টে খেলা লেগব্রেক গুগলি বোলার টিচ ফ্রিম্যান। প্রথম শ্রেণিতে যিনি ৩৭৭৬ উইকেট নিয়েছেন। টেস্ট খেলেছেন ১২টি। উইকেট নিয়েছেন ৬৬টি। মুরালির প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে শিকারসংখ্যা ১৩৭৪। এর সঙ্গে লিস্ট ‘এ’ ও ঘরোয়া টি- টোয়েন্টি লিগ ধরলে উইকেটসংখ্যা দাঁড়ায় ২২৩৫। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ১৩৪৭ উইকেট যোগ করলে সাফল্যের যে শীর্ষবিন্দুতে মুরালি অবস্থান করবেন সেখানে অদূর ভবিষ্যতে কারও পক্ষে ওঠার কল্পনা করাও অসম্ভব। বিশাল অর্জন নাকি মানুষকে ‘নিঃসঙ্গ’ করে দেয়।
মুরালির ক্ষেত্রে কথাটা খুব সত্যি। স্রেফ উইকেটশিকারের সাফল্য ধরলে তার ধারেকাছে কেউ নেই। আর বোলার মুরালির সংগ্রামের কথা ধরলে তিনি আরও বেশি ‘নিঃসঙ্গ’। কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে যে, জগলাস জার্ডিনের (যার মাথা থেকে বডিলাইনের আইডিয়া) পর আর কোনো ক্রিকেটার বিতর্কের কেন্দ্রে থাকেননি যেমনটা মুরালিধরন থেকেছেন। শচিন টেন্ডুলকারের একটা সার্থক উক্তি আছে। লিটল মাস্টার বলেছিলেন, ‘কেউ তোমার দিকে স্টোন (পাথর) ছুড়লে, তুমি তা মাইলস্টোন বানাও।’
মুরালিধরন তার ১৯ বছরের বর্ণময় ক্যারিয়ারে এই কাজটাই করেছেন দারুণ নিষ্ঠার সঙ্গে। ১৯৭২ সালের ১৭ এপ্রিল ক্যান্ডিতে জন্ম মুরালির। টেস্ট অভিষেক ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কলম্বোতে। সেই অস্ট্রেলিয়া যে দেশকে মুরালি পরে ‘নরক’ বলেছিলেন। কেন? সেই গল্পটাই এবার শুনুন। ২৫ বছর আগে ১৯৯৫-এ মেলবোর্নে বক্সিং ডে টেস্টে ড্যারেল হেয়ার টানা সাতবার মুরালির বল ‘নো’ ডেকেছিলেন অ্যাকশনের জন্য। যা নিয়ে পরে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান বলেছিলেন, ‘মুরালির অ্যাকশনে কোনো সমস্যা ছিল না। এ আমার দেখা জঘন্যতম আম্পায়ারিং।’ এরপর মুরালির অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রয় এমারসন। কোনোবারই তার বায়োমেকানিক্যাল টেস্টে কিছু পাওয়া যায়নি বলে মুরালিকে থামাতে পারেনি আইসিসি। ২০০৪-এর মার্চে তার দুসরার বিরুদ্ধে রিপোর্ট দেন ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড।
সেবার পরীক্ষার পর দেখা যায় দুসরা করতে গিয়ে মুরালির কনুই ১৪ ডিগ্রি পর্যন্ত ভাঙছে। পরে আইসিসি অনুমোদিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল স্পিনারদের ৫ ডিগ্রির বেশি কনুই না ভাঙার বিধিনিষেধ কার্যত অবাস্তব। তারপর থেকে আইসিসি বোলারদের কনুই ভাঙার সীমা বাড়িয়ে করে ১৫ ডিগ্রি। সম্ভবত মুরালিই ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র বোলার যার জন্য একটা আইন বদলে গেছে। সেই অন্ধকার সময়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মুরালি পরে বলেছিলেন, ‘একজন বোলারকে বল করতে না দিলে সে ছটফট করবেই। কিন্তু আমাকে যা বলা হয়েছিল, তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। জানতাম আমাকে সীমা, নিয়মের মধ্যে থেকেই সব করতে হবে।’
নিয়মের মধ্যে থেকেই সবকিছু করেছিলেন মুরালি। অফস্পিন ছিল তার অবলম্বন। শুধু অফস্পিনের ওপর ভরসা রেখেই যুদ্ধে জিতেছেন। মাঠে মাঠে ফুলও ফুটিয়েছেন। একবার বলেছিলেন, ‘ক্রিকেট খেলতাম যখন, নিজেকে একটা কথা বরাবর বলতাম আমি। তুমি অফস্পিনার, ব্যাটসম্যানকে বধ করার চেষ্টা করবে অফস্পিনে। একান্ত না হলে তখন ভেরিয়েশনে যাবে। আমার রেকর্ডটা ঘাঁটলে দেখা যাবে যে, ৮০০ উইকেটের ৯০ শতাংশ অফস্পিনে পাওয়া। লাইন-লেন্থ ঠিক রেখে শুধু অফস্পিন করো। গতি পাল্টাও। এটা যদি কেউ ঠিকঠাক করতে পারে, ব্যাটসম্যানের পক্ষে তাকে সামলানো খুব কঠিন।’ সত্যি কি মুরালির মায়া-ঘূর্ণি এতটাই সরল? হতেও পারে। স্রষ্টাই তো জানেন তার সৃষ্টি-রহস্য। তাই আমরাও বিশ্বাস করছি ১৯৯৮ সালের ওভাল টেস্টে ইংল্যান্ডকে যিনি বর্ষাফলকে রক্তাক্ত করেছিলেন তিনি নিতান্ত একজন অফস্পিনার বৈ অন্য কিছু ছিলেন না। যার ঘূর্ণিতে দৃষ্টির সামনে অসহায়ের মতো ১৬ ইংলিশ ব্যাটসম্যান (৭/১৫৫ ও ৯/৬৫) আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে দলের প্রথম জয়ের পর গল, পেশোয়ার, শারজাহ, ক্যান্ডি, ট্রেন্টব্রিজ, ত্রিনিদাদের সবুজ ক্যানভাসে মায়া-ঘূর্ণির তুফান তুলেছেন। কেউ ভেবেছে মুরালি ‘অলৌকিক’। কেউ ভেবেছে ‘স্বপ্ন’! ক্যান্ডির জাদুকর হেসে বলেছেন, ‘লাইন-লেন্থ ঠিক রেখে শুধু অফস্পিনটাই তো করেছি।’