মানুষের জীবন ফুলশয্যাময় নয়। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা নিয়েই জীবন। দুঃখ-কষ্ট ও রোগব্যাধি কখনো আসে পরীক্ষাস্বরূপ; আবার কখনো আসে শাস্তি হিসেবে। অনুরূপ কখনো কখনো দেশ ও সমাজে মহামারী ও মহাপ্রলয় দেখা দেয়। ইমানদাররা আজাব, রোগব্যাধি ও মহামারী থেকে মুক্ত থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং আজাব এলে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, আস্তিক-নাস্তিক, নেককার-বদকার কেউ রেহাই পায় না। তবে হ্যাঁ, মহান আল্লাহ যাকে বিশেষভাবে রক্ষা করেন তার কথা ভিনড়ব। এ বিষয়ে কোরআনের বক্তব্য দেখুন ‘তোমরা এমন আজাবকে ভয় করো, যা বিশেষভাবে তোমাদের মধ্যে যারা জালিম, তাদের ক্লিষ্ট করবে না। আর জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ২৫)
এ বিষয়ে বেশ কিছু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এক হাদিসে এসেছে, ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যখন আল্লাহ কোনো জাতির ওপর আজাব অবতীর্ণ করেন, তখন সেখানে বসবাসরত সবার ওপরই সেই আজাব পতিত হয়। পরে অবশ্য প্রত্যেককে তার আমল অনুযায়ী ওঠানো হবে।’ (বোখারি, হাদিস : ৭১০৮)
হাদিসটি প্রমাণ করে, কোনো জাতির ওপর আজাব এলে কে ভালো, কে মন্দ তা পার্থক্য করা হয় না। এমনকি নেককার মানুষও বিপদ, আজাব ও মহামারী দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। তবে মুমিনের বিপদ ও কাফিরের বিপদের মধ্যে পার্থক্য আছে। বিপদ-আপদ কাফিরের জন্য আজাবস্বরূপ, কিন্তু ইমানদারের জন্য রহমতস্বরূপ। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যেসব বিপদ-আপদ আসে এর দ্বারা আল্লাহ তার পাপ দূর করে দেন। এমনকি যে কাঁটাতার শরীরে ফোটে, এর দ্বারাও।’ (বোখারি, হাদিস: ৫৬৪০)
যেকোনো রোগব্যাধি, বিপদ ও মহামারী দ্বারা যেকোনো নেককার ব্যক্তিও আক্রান্ত হতে পারেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি রোগ যন্ত্রণা ভোগকারী অন্য কাউকেও দেখিনি।’ (মুসলিম ৪৫/১৪, হাদিস : ২৫৭০, মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২৫৪৫৩ আধুনিক প্রকাশনী : ৫২৩৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন : ৫১৩০)
আলোচ্য হাদিসে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাঝেমধ্যে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়তেন। কোরআন মজিদে সুরা আম্বিয়ায় দেখা যায়, আইয়ুব (আ.) কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে ওই রোগযন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি চেয়ে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছেন।
ইসলামের ইতিহাসে আমওয়াস নামে এক মহামারীর কথা লেখা আছে। সেই মহামারীতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ মারা যায়। ওই মহামারীতে মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) ও আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর সাহাবিও ইন্তেকাল করেন। তাই কোনো মুমিন ও নেককার ব্যক্তি কোনো রোগ বা মহামারীতে আক্রান্ত হলে তার ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা গর্হিত অপরাধ। বরং এই রোগের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির মর্যাদা মহান আল্লাহর দরবারে বহু গুণ বেড়ে যেতে পারে।
আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। জবাবে তিনি বলেন, এটি হচ্ছে এক ধরনের আজাব। আল্লাহ যার ওপর তা পাঠাতে ইচ্ছা করেন, পাঠিয়ে থাকেন। কিন্তু আল্লাহ এটিকে মুমিনদের জন্য রহমত বানিয়ে দেন। অতএব প্লেগ রোগে কোনো বান্দা যদি ধৈর্য ধরে, এই বিশ্বাস নিয়ে নিজ শহরে অবস্থান করতে থাকে যে আল্লাহ তার জন্য যা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোনো বিপদ তার ওপর আসবে না, তাহলে সেই বান্দার জন্য থাকবে শহীদের সমান সওয়াব।’ (বোখারি, হাদিস : ৫৭৩৪)