করোনাভাইরাস কি আসলেই একটি জৈব অস্ত্র

গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের খবর প্রথম প্রচার হওয়ার পর প্রায় চার মাস পার হতে চলেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এই ভাইরাসটি ২১০ দেশ ও অঞ্চলকে আক্রান্ত করেছে। তবে এ-সংক্রান্ত একটি বিতর্কের এখনো কোনো সমাধান হয়নিআর তা হচ্ছে এটা কি আসলেই এক ধরনের ‘ফ্লু’, নাকি একটি জৈব অস্ত্র, যা চীনের উহানে একটি ল্যাবে তৈরি হয়েছিল? অভিযোগে আছে এমনও যে, চীন এই জৈব মারণাস্ত্রটি বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেউদ্দেশ্য বিশ্বে চীনের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা! এ ধরনের অভিযোগের পেছনে শক্ত কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকলেও, নিউজ পোর্টালগুলোতে তা নিয়মিতই ছাপা হয়ে আসছে। গত ১৩ এপ্রিলের  The Daily SIGNAL-এর একটি প্রতিবেদন Could COVID-19 have come from Chinese Lab-১৯ যধাব পড়সব ভৎড়স ঈযরহবংব খধন? যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রকাশিত এই নিউজ পোর্টালের প্রতিবেদনটি লিখেছেন ফ্রেড লুকাস। তার মতে এটা কোনো জৈব অস্ত্র নয়। তিনি ডেন চেংয়ের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ডেন চেংয়ের মতে :  If the Chinese wanted to develop a biological weapon, its likely that its communist government would have aimed for something far more lethal than COVID-19’’। ডেন চেং (Dean Cheng) যুক্তরাষ্ট্রের হ্যারিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো। এই জৈব অস্ত্রের বিষয়টি নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রে এটা নিয়ে গবেষণা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। পেন্টাগন বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানিকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে জৈব অস্ত্র তৈরিতে। এ ধরনের একটি কোম্পানির নাম সিএইচটুএম হিল। এই কোম্পানিটি পেন্টাগন থেকে সহায়তা পেয়েছে ৩৪১.৫ মিলিয়ন ডলারের। এদের ল্যাব রয়েছে জর্জিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। অনুদানের প্রাপ্ত অর্থের অর্ধেক (১৬১.১ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় হয়েছে তিবলিসের (জর্জিয়া) লুগার সেন্টারে। আরেক কোম্পানি Battelle-এর কথাও বলা যায়। এরা মূলত বিভিন্ন জৈব রসায়নবিষক্ত বিষ ইত্যাদি নিয়ে পেন্টাগন নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত যেসব ল্যাব রয়েছে (আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া ইত্যাদি) সেখানে গবেষণা করে। দুই মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তাও তারা পেয়েছে ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে।

অনেকেই জানেন না যে, পোকা-মাকড়ের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস ছড়ানোর একটি পরিকল্পনাও পেন্টাগন প্রণয়ন করেছিল। এই পরিকল্পনাটি ছিল us Entomological wa-এর একটি অংশ। ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মির একটি রিপোর্ট যা পরে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল, ওই রিপোর্ট থেকে এই তথ্যটি জানা যায়। ওই রিপোর্টেই উল্লেখ করা হয়েছে যে,  A. Aegypti নামক এক জাতীয় মশার মাধ্যমে ‘ইয়েলো ফিভার’ ছড়ানো হয়েছিল। Operation Big BU22-এর আওতায় ১০ লাখ A. Aegypti মশার উৎপাদন করা হয়েছিল, যার তিন ভাগের এক ভাগ গোলাবারুদে ভর্তি করে বিমান থেকে ভূমিতে নিক্ষেপ করে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল (যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া, ১৯৯৫)। ‘ইয়েলো ফিভার’ ছড়িয়ে দিতে এই পরীক্ষা সফল হয়েছিল। তিবলিসে পেন্টাগনের একটি প্রোগ্রাম আছে, যার নাম  Biological weapons sharing program threat reduction (DTRA। এই কর্মসূচির আওতায় জৈব অস্ত্র কীভাবে কাজ করে, তা দেখা হয়। ১৯৪৪ সালে ক্রিমিয়ায় একটি রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে, যার নামকরণ করা হয়েছিল Crimean hemorrhagic fever। এরই পরিবর্তিত নাম Congo- Crimean hemorrhagic fever (CCHF)। এই রোগের জন্য Nairovirus-কে দায়ী করা কয়। ক্রিমিয়ার পরেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল আফ্রিকার কঙ্গোতে। যে কারণে ক্রিমিয়ার সঙ্গে কঙ্গো নামটি যুক্ত হয়েছিল। অভিযোগে আছে ল্যাবে মশা, মাছি বা পোকামাকড়ের মাধ্যমে কীভাবে রোগ-ব্যাধি ছড়ানো যায়, তা নিয়ে ওইসব ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। শত্রুপক্ষকে টার্গেট করেই এসব জৈব অস্ত্র নিয়ে গবেষণা ও তা তৈরি করা হয়। যদিও ওইসব জৈব অস্ত্র কোথায় কোথায় ব্যবহার হয়েছে, তা পূর্ণ তথ্য আমাদের কাছে নেই। কিন্তু আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, তা হচ্ছে আফগানিস্তানে ২০১৯ সালে  CCHF  রোগটি ছড়িয়ে পড়েছিল। হেরাত ও কাবুলে ওই রোগের কারণে ৩৫৯ জনের মৃত্যুর খবরও তখন লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল (Tols news, 11 February 2020)। শঙ্কার জায়গাটা হলো এই যে, যেসব এলাকায় এই রোগটি (CCHF) ছড়িয়ে পড়েছিল, ওই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র তিনটি ল্যাব পরিচালনা করে। এখন ল্যাব থেকে ওই রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছিল কি না, কিংবা হেরাত-কাবুলের মানুষের ওপর তা পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল কি নাতা আর জানা যায়নি। লুগার সেন্টারে বাদুড় নিয়েও গবেষণা হয়েছিল। বাদুড় ইবোলা, কিংবা  middle East respiratory syndrome (MERS) মতো মারাত্মক সব রোগের জীবাণু বহন করতে পারেএটা এখন গবেষণাগারে পরীক্ষিত। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত MERS রোগে আক্রান্ত (১৯ দেশে) ১৯৮০ জন রোগীর মধ্যে ৬৯৯-এর মৃত্যুর খবর রিপোর্ট হয়েছে। MERS একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবে উৎপন্ন হয়েছিল (Covert Geopolitics, 9 February 2020)| Rabbit Fever)। Rabbit Fever সম্পর্কে আমরা কতটুকু অবগত? এই জধননরঃ ঋবাবৎ-এর জীবাণুও মার্কিন ল্যাবে তৈরি।

আমরা হয়তো এটা অনেকেই জানি যে, ইউক্রেনে ২০১৪ সালে এক গণ-অভ্যুত্থানে মস্কো সমর্থিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ উৎখাত হয়েছিলেন। তার ওই উৎখাতের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন ছিল। অভিযোগ আছে, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু ল্যাব পরিচালনা করে, যার ওপর ইউক্রেনের সরকারের কোনো কর্তৃত্ব নেই। ফলে সেখানে কী ধরনের গবেষণা হয় এবং তা কোথায় প্রয়োগ করা হয়, তা কেউ জানে না। ইউক্রেনের সীমন্তবর্তী দেশ রাশিয়া। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না বেশ কয়েক বছর। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিক। কিন্তু রাশিয়ার রয়েছে তাতে আপত্তি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত ল্যাবে উৎপন্ন জীবাণু অস্ত্র ভবিষ্যতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারেএমন আশঙ্কাও রয়েছে অনেকের মধ্যে।

ফলে জৈব অস্ত্র নিয়ে একটা বড় ভয় রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই জৈব অস্ত্রের নানা ধরন নিয়ে গবেষণা হয়এ তথ্য অনেক পুরনো। চীনেও এটা নিয়ে গবেষণা হয়এমন কথাও বলা হচ্ছে কোনো কোনো মহল থেকে। এখন করোনাভাইরাস (Covid-19) ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় জৈব অস্ত্রের বিষয়টি সামনে চলে এলো। এখন করোনাভাইরাসটি (কভিড-১৯) একটি জৈব অস্ত্র কি-না, তা হু কিংবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিকমানের প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এখন অব্দি বলছে না কভিড-১৯ একটি জৈব অস্ত্র, তখন আমাদের জৈব অস্ত্রের বিষয়টি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। ‘হু’ ছয় ধরনের করোনাভাইরাসের কথা বলছে। কভিড-১৯ কোনো ধরনের জৈব অস্ত্র না হলেও, জৈব অস্ত্র আছে। এটি নিয়ে গবেষণা হয় এবং এখনো হচ্ছে।

বলা ভালো, জৈব অস্ত্র মানবসভ্যতার জন্য এক ধরনের হুমকি। এই হুমকি পারমাণবিক বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়াবহ। জৈব অস্ত্রের মাধ্যমে মানব শরীরে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাংগি প্রবেশ করিয়ে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এটা এতই মারাত্মক যে, এর মাধ্যমে পুরো মানবসভ্যতা ধ্বংস বা বিলুপ্ত করা সম্ভব! এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করেই বিশ্ব ১৯৭২ সালে Biological Weapons Convention চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। ১০৯টি দেশ ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল, যা ১৯৭৫ সালের মার্চ থেকে কার্যকর রয়েছে (বর্তমানে ১৮৩টি দেশ এই চুক্তিভুক্ত)। যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ এবং ১৯৭৫ সালে চুক্তিটি অনুমোদনও করে। চীন অনুমোদন করে ১৯৮৪ সালে আর বাংলাদেশ ১৯৮৫ সালে। কিন্তু তারপরও অনেক অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে বিভিন্ন ল্যাবে এই জৈব অস্ত্র তৈরি করছে! চুক্তির ১ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনো দেশ যেকোনো অবস্থাতেই হোক না কেন, জীবাণু অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারবে না। ধারা-২-এ এ ধরনের অস্ত্র ধ্বংস, কিংবা ধারা-৩-এ অস্ত্রের ট্রান্সফার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ ধরনের অস্ত্র উৎপাদন, গবেষণা, ট্রান্সফার যখন নিষিদ্ধ, তখন যুক্তরাষ্ট্র গোপনে এ ধরনের অস্ত্র উৎপাদন ও গবেষণায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে। আমেরিকার কনজারভেটিভরা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। সুতরাং তারা নতুন নতুন জৈব অস্ত্র তৈরি করবেএটাই স্বাভাবিক।

চীন বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে চীন বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার কথা। পেন্টাগনের কনজারভেটিভদের এটা না-পছন্দ। তারা ষড়যন্ত্র করতে পারে। কিন্তু চীন এ ধরনের জৈব অস্ত্র তৈরি করে বিশ্বকে তথা নিজের অর্থনীতিকে একটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবেএটা মনে হয় না। চীনের বিরুদ্ধে এটা একটা শক্ত প্রোপাগান্ডা বলে মনে করছে নেপালের Left Review online নিউজ পোর্টাল। করোনাভাইরাস কভিড-১৯ একটি নতুন ধরনের ভাইরাস। বিশ্ব এ ধরনের ভাইরাসের সঙ্গে এর আগে আর পরিচিত হয়নি। এটাকে ‘চীনের জৈব’ অস্ত্র বলে পরিচিত করা মূল সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার শামিল। মানবসভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ এই ভাইরাসটি নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন এবং উদ্যোগটা নিতে হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেই।

লেখক

অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

tsrahmanbd@yahoo.com