শবদাহের স্থানের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর পড়ে আছে করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া ভারতীয় এক শ্রমিকের মৃতদেহ। এমনই ‘অচ্ছুত’ বাড়ি থেকে বহু মাইল দূরে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে মারা যাওয়া অভিবাসী শ্রমিকেরা। শেষ বিদায়টুকু জুটছে না তাদের।
ঘণ্টাখানেক সময়েও ওই মৃতদেহটির আশপাশে অন্য কাউকে দেখা গেল না। স্বাস্থ্য সুরক্ষা পোশাক পরা শ্রমিকরাই নামেন সৎকারের কাজে। শ্মশান নীরবতার মধ্যে চারজন খুব সতর্কতার সঙ্গে মৃতদেহটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে দেন। নিয়ে যান শবদাহের স্থানে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আরবের ধনী দেশগুলোতে নানা ধরনের কাজ করে থাকেন লাখ লাখ ভিনদেশি শ্রমিক। দেশগুলোর হাসপাতাল, ব্যাংক, নির্মাণ ও কারখানাগুলোতে কর্মরত বেশির ভাগ শ্রমিকই বিদেশ থেকে আসা।
এসব শ্রমিকদের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যে আছেন কয়েক দশক ধরে। পরিবারের আর্থিক চাকা সচল রাখতে করে যাচ্ছেন হাড়ভাঙা পরিশ্রম! স্বপ্ন- একদিন বাড়ি ফিরবেন, উপার্জনের টাকা দিয়ে কিছু একটা শুরু করবেন, মুক্তি মিলবে ভিন দেশে শ্রমিক জীবন থেকে।
কিন্তু প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নির্মম এক পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে এসব শ্রমিকদের। কোনো কারণে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে মৃত্যু হলে দেশেও পাঠানো হচ্ছে না তাদের মৃতদেহ। যে দেশে মৃত্যু হচ্ছে সেখানেই পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে বা কবর দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ দুবাইয়ে মরুভূমি এলাকায় অবস্থিত একটি শ্মশানের পরিচালক ঈশ্বর কুমার আক্ষেপের সুরে বলছিলেন- “গোটা বিশ্ব বদলে গেছে। মৃতের প্রতি কেউ এগিয়ে আসে না, কেউ স্পর্শ করে না, কেউ বিদায় জানায় না।”
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগের পরিস্থিতি তুলে ধরে ঈশ্বর কুমার বলেন, “আগে সৎকারের সময় শোক প্রকাশ করতে ফুল নিয়ে এখানে দুই থেকে আড়াইশো মানুষ আসত। এখন তারা একা একা মারা যাচ্ছে।”
আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়গুলোর তথ্য, এই অঞ্চলে করোনায় এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৬০০। মৃতের সংখ্যা ১৬৬ জন। আক্রান্ত ও মৃতের বেশির ভাগই ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও ফিলিপাইনসহ এশিয়া অঞ্চলের দেশ থেকে আসা শ্রমিক।
করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া অভিবাসী শ্রমিকদের সৎকার প্রসঙ্গে সৌদি আরবের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র নাম প্রকাশ না করা শর্তে এএফপিকে বলেন, “এখন পর্যন্ত মৃতদের সবার পরিবারকে সৌদি আরবেই লাশ দাফন করতে বলা হচ্ছে। কারণ তারাও এটা চায়।”
গত সপ্তাহে সৌদি আরবে মারা যান ৫৭ বছর বয়সী আফগান ওয়াজির মোহামেদ সালেহ। ৮০’র দশকে আফগানিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুদ্ধের সময় দেশ ছেড়ে সৌদি আরবের পবিত্র শহর মদিনায় চলে আসেন তিনি, পরিবারও তার সঙ্গেই। একটি মুদির দোকানের মালিক সালেহ করোনায় মারা গেলে কেবল নিজের চার ছেলের উপস্থিতিতে দাফন সম্পন্ন হয় তার!