ধান কাটা ও কৃষক সুরক্ষায় অগ্রাধিকার চাই

দেশজুড়ে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু করোনার বিস্তার রোধে লকডাউন পরিস্থিতিতে সারা দেশে সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকায় আবাদি এলাকাগুলোতে যেতে পারছেন না মৌসুমি পরিযায়ী শ্রমিকরা। তার ওপর ধান কাটার শ্রমিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৌসুমি বৃষ্টিপাতে পাহাড়ি ঢলের শঙ্কা। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, ২৫-২৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ও ভারতের আসামসহ পুরো এলাকায় তুমুল বৃষ্টিপাত হতে পারে। ধান কাটার আগেই বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢল শুরু হলে তলিয়ে যাবে ক্ষেতের ফসল, কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে ফলানো পাকা ধান। বিশেষত হাওরাঞ্চলে এই শঙ্কায় দিশেহারা কৃষকরা। কেননা, শুধু ধান কাটা নয়, ধান বিক্রির মাধ্যমে গুদামে তুলতে না পারলে বিপুল পরিমাণ ধানই নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু ধান কাটার শ্রমিক আসবে কোত্থেকে? অথচ সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে হাওরাঞ্চলে এখনো ৮০ ভাগ ধান কাটাই বাকি। এ অবস্থায় হাওরসহ দেশের অন্যান্য স্থানে ধান কাটা এবং সরকারিভাবে ধান কেনা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাওরে এবার ৪ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। সেখানকার ধান কাটতে প্রয়োজন হবে ৮৪ হাজার কৃষিশ্রমিক। হাওরের সাত জেলায় স্থানীয় শ্রমিক সর্বসাকল্যে ১৮ শতাংশ। বাকি সব শ্রমিকই বাইরে থেকে আসে। আর সব শ্রমিক মিলে কাজ করলেও সেখানকার সব ধান কাটতে লেগে যাবে ২৫ দিন। এই পরিস্থিতিতে হাওরের ধান কাটার বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শুধু ধানকাটা শ্রমিকদের আনতে বিশেষ ব্যবস্থায় গণপরিবহন চালুরও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন জেলা থেকে হাওরে যাওয়া শ্রমিকদের থাকার জন্য হাওরে সব প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। এভাবে জামালপুর থেকে ৭০০ শ্রমিক এবং রংপুর ও দিনাজপুর থেকেও বিশেষ ব্যবস্থায় শ্রমিকদের হাওরে পাঠানো হয়েছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে জেলার সব বালু ও পাথরমহালের শ্রমিকসহ রোজগার হারানো রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ঠেলাগাড়িচালকসহ শ্রমজীবীদের ধান কাটায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ধান কাটতে আসা শ্রমিকদের করোনাকালীন সরকারি ত্রাণের সুবিধা দেওয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জের এই মডেল হাওরের জেলাগুলোসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও অনুসরণ করা যায় কি না তা ভেবে দেখা যেতে পারে।

কাগজে-কলমে ৫ এপ্রিল থেকেই সরকারিভাবে ধান কেনা শুরুর কথা। কিন্তু মূলত শ্রমিক সংকটের কারণেই এখনো আশি-নব্বই ভাগ জমিরই ধান কাটা যায়নি। তার ওপর যে প্রশ্নটা সামনে আসা জরুরি সেটা হলো সরকার আসলে মোট উৎপাদনের কত শতাংশ ধান কেনে? কৃষি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এ বছর ২ কোটি ৪ লাখ মেট্রিক টন বোরো থেকে চাল উৎপাদিত হবে। সরকার কেনে মাত্র ৫-৬ লাখ টন ধান। চালও কেনে সরকার, ১১ লাখ টন, তবে সেটা সরাসরি রাইস মিলগুলোর কাছ থেকে। সব মিলিয়ে মৌসুমের মোট ধানের ২-৩ ভাগ! আর বাকি ৯৭ ভাগ ধান কৃষক কীভাবে কার কাছে বেঁচবে? মুশকিল হলো সরকার যতটুকুই ধান-চাল কেনে তার প্রক্রিয়া খুবই ধীর। মৌসুমের একেবারে শেষে যখন সরকারি ক্রয় শুরু হয় তখন কৃষক পর্যুদস্ত হতে থাকে আর চালকল মালিকদের পোয়াবারো হতে থাকে। এভাবে প্রতি বছরই চালকল মালিক আর মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। আর বাজার থেকে চড়া দামে সার, বীজ, কীটনাশক কিনে কুলোতে পারে না চাষি, বর্গাচাষিরা প্রতি বছর লোকসান গুনে মাথায় হাত দেয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবারের করোনাকালে কৃষকের কাছ সরাসরি সরকারি ধান-চাল কেনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো উচিত।

শ্রমিক সংকটের সুরাহা করে ধান কাটা এবং সরকারি ধান-চাল কেনার পরিমাণ বাড়িয়ে এই বোরো ধান গুদামজাত করা অবশ্যই প্রথম দুই চ্যালেঞ্জ। এই দুই ক্ষেত্রে সরকার যতটা সাফল্য দেখাতে পারবে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের সুরক্ষার প্রশ্নে ততটাই এগিয়ে যাবে দেশ। কিন্তু বোরো ধান উৎপাদনে সার-বীজ-কীটনাশকের খরচ এবং এই সংকটকালে শ্রমিকের বর্ধিত খরচ মেটানোর পর কৃষক কি লোকসান এড়িয়ে ফসলের দাম তুলতে পারবে? সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় কৃষি খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রদানের ঘোষণা এলে কতটুকু আশার আলো দেখাতে পারে? ব্যাংকগুলো এ ঋণ দেবে জুলাই মাস থেকে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় মাঝারি

কৃষকদের জন্য ঋণের সুদহার আরও কমানো এবং ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি কৃষি শ্রমিকদের জন্য অফেরৎযোগ্য এককালীন নগদ প্রণোদনা জরুরি। সরকার বাস্তবতার নিরিখে বিষয়গুলো বিবেচনা করবে সেটাই কাম্য।