শক্তি ফিরছে সার্বভৌমত্বে

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পৃথিবীর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অস্তিত্ব সবচেয়ে হুমকির মুখে পড়েছে। কারণ এই ভাইরাস মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকে পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে অন্যদের থেকে। ভূ-রাজনীতিতে শক্তিশালী দুই পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের বাইরে এই করোনাভাইরাস সংকট একবিংশ শতাব্দীতে মানবজাতির জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, করোনাভাইরাসের এই সময়ে আন্তর্জাতিকতাবাদের কি মৃত্যু হতে যাচ্ছে?

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জাতিসংঘের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় কোনো ভূমিকাই পালন করতে পারেনি। এমনকি অর্থনৈতিক সংগঠন ওপিইসি বাজারের ধস ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। মাঝখান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তহবিল বন্ধ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে এই একটি প্রতিষ্ঠান যা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চেষ্টা করছে, সেটিরও তহবিল বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যা ইয়েভেস লি দারিয়ান, যাকে মূলত কূটনীতির নেপথ্যের কারিগর বলা হয়, তিনি বৈশ্বিক ক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে সতর্কতা জ্ঞাপন করেছেন। ফরাসি দৈনিক লা মঁথকে তিনি বলেন, ‘এই প্রাদুর্ভাবের পর পৃথিবীকে যেভাবে দেখা যাবে তা আমরা কেউই আগে দেখিনি। সবচেয়ে বাজে অবস্থা হতে যাচ্ছে।’ মহামারীটি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিকতার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বলেও তিনি বলেন। রাজনীতির মাঠের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই তাদের নিজ নিজ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসাকেও ইঙ্গিত করেন তিনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিকতাবাদের শুরু বলা চলে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে প্রভাব বিস্তার করে। ইউরোপীয় বাজার হয়ে যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বৈশ্বিক নেতৃত্বে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভূমিকা পালন করবেন কি না তা নিশ্চিত নয়। ধারণা করা হয়েছিল এই সময়ে ইউরোপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে জোনটি তা পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব এমন সংকটের মধ্যে আগে পড়েনি।

প্যারিসের সায়েন্স পো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জাকি লাইদি বলেন, ‘আমরা এমন এক সময়ে প্রবেশ করেছি যেখানে ফের সার্বভৌমত্বের দিকে ফিরে যাচ্ছে দেশগুলো। সংকট যত ঘনীভূত হবে দেশগুলো ততই সার্বভৌম আচরণ শুরু করবে।’ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও এবার ব্যর্থ হয়েছে। ঐতিহাসিক রেজিন পেরনের মতে, ‘আন্তর্জাতিকতাবাদকে আরও আধুনিকভাবে গঠন করে নেওয়ার সুবিধা আমরা পেতে পারি। সবচেয়ে আদর্শিক হবে যদি বৃহত্তর সংস্থাগুলো থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্ব নিয়ে নেয়।’ সাক্ষাৎকারে লি দারিয়ান ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তুরস্ক রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করে এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্রবিরতি অমান্য করে লিবিয়ার সংকটেও ভূমিকা পালন করে। এসব ঘটনাকে লি ন্যাটোর নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে দেখেন।

করোনাভাইরাসের বিস্তারের জন্য চীনকে দোষারোপ করছে যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই পক্ষের দোষারোপের খেলায় ক্ষমতার একপ্রকার শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কেউ বিশ্বনেতৃত্ব তুলে নেবে এখন সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এমন প্রশ্ন ততদিনই কার্যকর থাকবে, যতদিন আন্তর্জাতিকতাবাদ টিকে থাকবে। আন্তর্জাতিকতাবাদ টিকে না থেকে যদি আলাদা সার্বভৌমত্ব মাথাচাড়া দেয়, তবে বিশ্বনেতৃত্ব কোনো পক্ষই মানবে না।