সার্বিক উন্নয়নে করোনার প্রভাব

প্রকল্প বাস্তবায়নে মেয়াদ ও ব্যয় বাড়বে

দেশের সার্বিক উন্নয়নে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব পড়েছে। নামমাত্র কয়েকটি প্রকল্প ছাড়া সব কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে চলমান রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে একদিকে পর্যাপ্ত শ্রমিক ও কর্মকর্তা সংকট, অন্যদিকে অর্থ সংকটও দেখা দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থছাড় করা হবে। এই অর্থ করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় ব্যয় করা হবে। ফলে চলমান এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হবে না। এর ফলে প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়ার সাথে সাথে ব্যয়ও বাড়বে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের উন্নয়নে সরকার যথেষ্ট পরিমাণ পদক্ষেপ নিয়েছিল। যা চোখ মেললেই দেখা যায়। কিন্তু অদৃশ্য করোনাভাইরাসের প্রভাবে সারা বিশ্ব থমকে গেছে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এখন আমাদের প্রধান কাজ হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে এনে মানুষকে রক্ষা করা। একই সঙ্গে কর্মহীন মানুষের জন্য সহায়তা করা। করোনাভাইরাসের এই ক্রান্তিকাল অতিক্রম করার পর কীভাবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা এখন এটা নিয়ে বেশি ভাবছি। এজন্য উন্নয়ন প্রকল্পকে তিনভাগে ভাগ করে অর্থ সরবরাহ করা হবে। ‘একদিকে শ্রমিক সংকট, অন্যদিকে অর্থছাড়ে কড়াকড়ি’ এতে প্রকল্প মেয়াদ ও ব্যয় বাড়বে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন হচ্ছে হবে। আগে আর পরে। তবে সবার আগে আগে মানুষের জীবন।’

গত সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এই পরিপত্র অনুসারে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) চলমান প্রকল্পগুলোকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্নপুরী ট্যানেল, পদ্মা রেল লিংক প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পগুলো অর্থ ব্যয় করতে পারবে। এদেরকে রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায়। তবে ‘নিম্ন অগ্রাধিকার’ উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ খরচ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে যৌক্তিক কারণে ব্যয় করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। আর ‘মধ্যম অগ্রাধিকার’ প্রকল্পের যেসব খাতে না করলেই নয় এমন টাকা খরচের ক্ষেত্রে নিজস্বভাবে ও স্বীয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প এ নির্দেশের আওতার বাইরে থাকবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গত সপ্তাহে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সব মন্ত্রণালয়কে। একই সঙ্গে অর্থ বিভাগ থেকে এ নির্দেশনা (পরিপত্র) অবহিত করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষককে।

পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরের মূল এডিপিতে প্রকল্প ছিল ১ হাজার ৪৭৫টি। সেখান থেকে ২৬৯টি বাড়িয়ে সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্প সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৪৪টি। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৬০০টি। এছাড়া কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১৪৩টি এবং জাপান ঋণ মওকুফ সহায়তা তহবিলের (জেডিসিএফ) একটি প্রকল্প।

এসব প্রকল্পে অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৯২১ কোটি টাকায়। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৬২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। আর স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার তহবিল থেকে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই মুহূর্তে মানুষের কাছে টাকা নেই। খাবার সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। ফলে সরকারের উচিত হবে এদিকে নজর দেওয়া। এক্ষেত্রে যদি উন্নয়নের টাকা এইসব কাজে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে সেটা ঠিক আছে। তবে যেগুলো কাজ করলে উন্নয়নের গতি ফিরিয়ে আনা সহায়ক হবে, সে প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত।

উল্লেখ, এর আগে সপ্তম জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা দিয়ে করোনা মোকাবিলা করা হবে বলে জানান। এক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় সংক্রান্ত একটি অনুশাসনও দেওয়া হয়। এ প্রেক্ষিতেই অর্থ বিভাগ নির্দেশনা জারি করেছে।