করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ যেন কোনোভাবেই ‘নয়ছয়’ না হয় সেজন্য কঠোরভাবে তদারকি করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে ঋণখেলাপিরা যেন কোনোভাবেই এই প্রণোদনায় ভাগ বসাতে না পারে সে বিষয়েও সতর্ক থাকবে মন্ত্রণালয়। পুরো বিষয় তদারকি করার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটিও করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এ কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারি ব্যাংকের এমডিরা। একই সঙ্গে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিতে একটি ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ও তৈরি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। শিগগিরই সেটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সবকিছু মনিটরিং করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। কীভাবে অর্থ ব্যবহার হচ্ছে, কারা পেল, ঋণখেলাপিরা পেল কি না এসব যাচাই-বাছাই করব আমরা। এজন্য পুরো বিষয় মনিটরিং করার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হবে। এতে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারি ব্যাংকের এমডিদের রাখা হতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনাভাইরাসপরবর্তী সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরিয়ে আনতে এই প্রণোদনার ব্যবহারের স্বছতা নিশ্চিত করা হবে। এক্ষেত্রে পূর্বে যারা ঋণখেলাপি ছিল তারা কোনোভাবেই এ প্যাকেজ থেকে সুবিধা পাবে না। এটিও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, প্রণোদনার ঋণ ব্যাংক-গ্রাহক ভিত্তিতে হলেও গ্রাহককে প্রণোদনার ঋণ পেতে আবেদন করতে হবে। আবেদনের একটি তালিকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এ বিষয়ে জানতে অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে এসএমএস করা হলে তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে সরকার যেসব প্রণোদনা ঘোষণা করেছে তার সম্পূর্ণ বিবরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি সার-সংক্ষেপ তৈরি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সার-সংক্ষেপে প্রণোদনার অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কোন কোন খাত এতে উপকৃত হবে তাও বলা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি করা সার-সংক্ষেপে প্রণোদনা বাবদ সরকারের ভতুর্কি ও সুদ ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সবশেষে এতে সরকারি ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অ্যাকশন প্ল্যানের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং মন্ত্রণালয়গুলো একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছে। প্ল্যানটি ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সবাই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, মনিটরিং করার এই সিদ্ধান্ত খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে এর সঙ্গে বেসরকারি পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা উচিত। এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বেশি সহজ হবে।
উল্লেখ্য, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পঋণের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া নিম্ন আয়ের শ্রেণির মানুষের ও কৃষকের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি উন্নয়ন ফান্ডের জন্য ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, প্রিশিপমেন্ট ঋণের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, গরিব মানুষের নগদ সহায়তায় ৭৬১ কোটি টাকা এবং আরও ৫০ লাখ পরিবারকে ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়ার জন্য ৮৭৫ কোটি টাকা রয়েছে প্যাকেজে। ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অধিকাংশ টাকার সংস্থানই হবে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে।