ধারাবাহিক সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ছিল অনেকটা উচ্চাভিলাষী, তা অর্জনে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কভিট-১৯-এর কারণে এসব পরিকল্পনায় ছেদ পড়েছে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ওলট-পালট হয়ে গেছে। নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে সবকিছু। আসন্ন বাজেটেও থাকতে হবে নানা পদক্ষেপ। এ অবস্থায় আসন্ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আবারও পুনর্বিন্যাস করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ও একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার মামুন আব্দুল্লাহ
করোনাভাইরাসের কারণে আসন্ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পরিবর্তন করার প্রয়োজন আছে কি না?
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া মোটামুটি প্রস্তুত ছিল। এটি তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন করোনাভাইরাসের মতো দুর্যোগ ছিল না। এই ভাইরাসটি বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। বাংলাদেশে এটির ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এজন্য আসন্ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় করোনার ইস্যু যুক্ত করতে হবে। এজন্য এটির পুনর্বিন্যাস করতে হবে। কারণ এখন যদি এটি যুক্ত না করি, তাহলে এই পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হবে না।
এটা কতদিন লাগতে পারে।
আগামী জুলাই থেকে নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন সেটা করা যাবে না। কারণ কভিড-১৯-এর কারণে অর্থনীতিতে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করাসহ অন্যান্য যেসব ইস্যু সামনে এসেছে, তা পরিকল্পনার বিবেচনায় আনতে হবে। এজন্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। এজন্য সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার পর কমপক্ষে দুই মাস সময় লাগবে। এই দুই মাসে সবার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
গত ১০ বছরে যেসব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কী হবে?
আমরা ডেল্টা প্ল্যান, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২১) প্ল্যানসহ বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা আগেই হাতে নিয়েছি। তখন যেহেতু করোনাভাইরাস ছিল না, এজন্য ওই প্রেক্ষাপটে পরিকল্পনাগুলো ঠিক আছে। এখন এসব পরিকল্পনায় হাত দেওয়ার দরকার নেই। এগুলো সরকারের ডকুমেন্ট হিসেবে থাকবে। সরকার আসলে দেশকে কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল, তার একটা দলিল থাকার দরকার আছে।
সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় তো পরিবর্তন আনতে হবে?
এ বিষয়ে পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইতিমধ্যে এর অগ্রগতিও আছে। আমি মনে করি উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জীবন, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
আগামী অর্থবছরের বাজেট আসন্ন। বাজেটে মূল ফোকাস কী হওয়া উচিত বলে মনে করেন।
আমার মনে হয় আগামী বাজেট হতে হবে কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক। মানুষকে কাজ দিতে হবে। কাজে ফেরাতে হবে। এজন্য নিতে হবে পদক্ষেপ। অর্থনীতিকে কীভাবে দ্রুত পুনর্বাসন করা যায় সেটা মাথায় রাখতে হবে। কভিড-১৯-এর কারণে সাধারণ ছুটির পর বাজার ব্যবস্থাকে কীভাবে সক্রিয় করা যায়, সেটাও দেখতে হবে। এখন মানুষের কোনো কাজ নেই, হাতে অর্থও আসছে না, এজন্য আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত গরিবদের জন্য বিশেষভাবে কর্মসূচি থাকতে হবে। আসন্ন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে আওতা ও ভাতার পরিমাণ, যেন জনগণকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অপুষ্টি থেকে রক্ষার ব্যবস্থা থাকে।
বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আরও সুশৃঙ্খল আনার পাশাপাশি দক্ষতাসম্পন্ন লোক তৈরি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, লজিস্টিক, সুরক্ষা বাজেটে দিতে হবে। শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। সবাইকে সরকারের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। করোনা আমাদেরকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এগুলো কাজে লাগাতে হবে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এজন্য শিল্প-কারখানার কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে চালু করতে হবে, সেক্ষেত্রে পুঁজির সংকট হলে জোগান দিতে হবে। তবে আশার কথা হলো প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। মানুষকে কাজে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। তবে বাজার ব্যবস্থাপনাকে দ্রুত সক্রিয় করা গেলে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়া যাবে। এছাড়া প্রবাসী শ্রমিকরা সহসা ফিরে যেতে পারবেন না। তাদের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। এজন্য বাজেটে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি, শিল্প ও প্রযুক্তি গবেষণার ওপর জোর দেওয়া ও কৃষিযান্ত্রিকরণে বিশেষ জোর দিতে হবে।