‘লকডাউন’-এর শাব্দিক অর্থ তালাবদ্ধ করে দেওয়া। শব্দটির ব্যাখ্যায় ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, কোনো জরুরি পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষকে কোনো জায়গা থেকে বের হতে না দেওয়া কিংবা ওই জায়গায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়াই হলো ‘লকডাউন’। এ ছাড়া অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, জরুরি সুরক্ষার প্রয়োজনে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ করাই ‘লকডাউন’। এই লকডাউন আমরা কেউ এখন মেনে চলছি না। করোনাভাইরাস আক্রান্ত সব দেশে লকডাউন চলছে। সেই লকডাউনগুলোতে শিথিলতা নেই। বেশ কড়াকড়ি আছে সেখানে। অস্ট্রেলিয়ায় কাউকে এক বাসা থেকে আরেক বাসায় যেতে হলে তাকে ১৩০০ ডলার জরিমানা গুনতে হয়। ইতালি বা ফ্রান্সে বিশেষ কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে যাচ্ছে।
কিন্তু ঢাকার রাস্তা ও বাজারে এখন মানুষ আর মানুষ। শিশুরাও বের হচ্ছে পথে-ঘাটে। ইচ্ছামতো ঘুরছে-ফিরছে। পুলিশ বাহিনীও আগের চেয়ে এখন শিথিল হয়েছে। প্রায় সারা দিন সব দোকানপাট খোলা, বিক্রি হচ্ছে ইফতারও। হোটেল-রেস্তোরাঁয় ইফতার বিক্রির অনুমতি দিয়েছে সরকার। গার্মেন্টস কারখানা খোলা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা নিরাপত্তা ছাড়াই শ্রমিকরা সেখানে গুটি গুটি পায়ে সুতা ফুঁড়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু সরকারি-বেসরকারি অফিসও খুলছে। রাস্তায় বেড়েছে গাড়ি। কোথাও লকডাউন মানা হচ্ছে না। অবস্থা দেখে মনে প্রশ্ন জাগছে, লকডাউন বলে কিছু আছে নাকি।
সরকারের এই শিথিলতার সুযোগ নিয়ে অসচেতন জনগণ যদি এভাবে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিতে থাকে, তাহলে ‘প্রাণ’ দিয়ে আমাদের খেসারত দিতে হবে। ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’। আমাদেরও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তা প্রমাণ করতে হবে করোনা পরিস্থিতি আমাদের দেশে কতটা ভয়াবহ।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘করোনা পরিস্থিতি ভালো না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে’। খুব ভালো কথা। তিনি বুঝতে পারছেন পরিস্থিতি আসলে সহসা ভালো হওয়ার নয়।
তাহলে সব খুলে দেওয়ার মানে কী? কারা গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার ব্যাপারে শলাপরামর্শ দিয়েছে সরকারকে? সব খুলে দিয়ে, মানুষকে বাইরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করে দিয়ে পরিস্থিতি ভালো হবে, এ আশা কীভাবে করছে সরকার। এই যে ধীরে ধীরে জনসমাগম বাড়ানোর ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, এটা কি সহজে থামবে? থামবে না।
দুই. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখছেনহার্ড ইমিউনিটি ছাড়া এই করোনা সংক্রমণ রোখার কোনো আশা দেখছি না। এটা ছিল আমাদের পরিস্থিতির বাস্তবতাপ্রসূত এক হতাশার সুর, মরণ ছাড়া গতি নাই টাইপ। হার্ড ইমিউনিটি বলতে মানুষ এখন জোর করে সবার ইনফেক্টেড হওয়া বুঝছে বলে মনে হচ্ছে। তারা মনে করছে, সরকার নিজের অজান্তেই ‘হার্ড ইমিউনিটি’র পথে হাঁটছে।
সত্যি কথা বলতে হার্ড ইমিউনিটি না আসা পর্যন্ত এই বিপদ থেকে আমরা পুরোপুরি নিরাপদ, এটা আমরা বলতে পারব না। কিন্তু তা আদৌ হবে কি না, কিংবা এই ভাইরাসের মিউটেশন এমন হবে যে, সিজনাল ফ্লুর মতো চেহারা বদল করে করে তা দীর্ঘ মেয়াদে ইমিউনিটি এনে দেবে তা বলা যাচ্ছে না। আবার হার্ড ইমিউনিটি মানে তো এই না যে সবাইকে ভাইরাস দিয়ে ইনফেক্টেড হতে হবে। বিপুল ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমেও হার্ড ইমিউনিটি সম্ভব। কিন্তু ভ্যাকসিনও নেই আর এসবই বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
আবার এটাও সত্যি, বাংলাদেশের মতো দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে, না খেয়ে অনেকে এবং দীর্ঘ মেয়াদে অনেকে অপুষ্টিসহ অন্যান্য কারণে মৃত্যু মুখে পড়তে পারে। সুতরাং আমাদের সবদিক থেকেই বিপদ। তাই এ মুহূর্তে যেটা দরকার সেটা হলো যতটা সম্ভব ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা। সঠিক রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করে ক্ষতির পরিমাণকে যথাসম্ভব কমানো। আজ হয়তো হাজার কোটি টাকার ক্ষতি (কথার কথা) স্বীকার করে ভবিষ্যতের লাখ কোটি টাকার ক্ষতিকে কমানো যাবে। টাকার অঙ্কে বললাম কেননা, আমাদের অনেকেই সবকিছুকে টাকার অঙ্কে বোঝে, জিডিপির হিসেবে বোঝে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পড়লে যে দীর্ঘমেয়াদি বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় সে দূরদৃষ্টি অনেকেরই নেই। উৎপাদনক্ষম জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেললে, অর্থনীতি তো আর ভালো থাকতে পারে না। দেশের অর্থনীতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা একবার ভাবুন।
মনে হচ্ছে, এখনই লকডাউন শিথিল করা মানে আরও বিপদ ডেকে আনা। সিঙ্গাপুরে লকডাউন শিথিল করার পর দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণের হার বেড়ে গেছে। ইতালি তাই মনে করছে, এ কারণে তারা দ্বিতীয় সংক্রমণ রোখার জন্য লকডাউন বাড়িয়ে দিয়েছে। রোগীর সংখ্যা এখনই অনেক, অনেকেরই করোনা পরীক্ষা হচ্ছে না, তাই শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এটা অনেক বেড়ে গেলে বিপদ আরও বাড়তে পারে, প্রচুর মানুষ মারা যেতে পারে। এর চেয়ে ইনফেকশন কার্ভটাকে আপাতত যত ফ্ল্যাট রাখতে পারি, ততই আমাদের বাস্তবতায় হয়তো ভালো। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এখনই ভালনারেবল অবস্থায় আছে, এর চেয়ে বেশি লোড সে নিতে পারবে বলে মনে হয় না। এমনিতেই আমরা অনেকগুলো বড় ভুল করে ফেলেছি, আরও ভুল করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
এসব ব্যাপারে দরকার বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের; শুধু ব্যবসায়ীদের বুদ্ধিতে চলার, দলবাজি বা তেলবাজির সময় এখন নয়। প্রকৃত বাস্তবতা উপলব্ধি করা যেন কোনোভাবেই অন্ধের হাতি দেখার মতো না হয়। এখানে যত বেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত আমরা সংযুক্ত করতে পারব, তত বেশি বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারব এবং ভুল করার আশঙ্কা ততটাই কমবে।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন,
ঢাকা মহানগর