কর্মহীন ২ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক

প্রতি বছর মে মাসের প্রথম দিন বিশ্বজুড়ে একত্রে শ্রমিক দিবস পালিত হয়। করোনাভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবের সময়ও বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়েছে নানান কায়দায়। তবে হাতেগোনা কয়েকটি দেশে এবার মে দিবসে রাস্তায় শ্রমিকরা নেমেছে। তবে যারা নেমেছে তারা সরকারের সামাজিক দূরত্বের বিধি মেনে মুখে মাস্ক পরে রাস্তায় দাঁড়ায়। ফিলিপাইন, রাশিয়া, চিলি ও তুরস্কে শ্রমিকদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ পিপার স্প্রে করে।

কিউবায় সবসময়ই মে দিবস বেশ ঘটা করে পালন করা হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশটির বাসিন্দারা বাসা থেকেই মে দিবস উদযাপন করে। হাভানার রেভল্যুশন স্কয়্যারে চে গুয়েভারার বিখ্যাত ছবিটির সামনে গত শুক্রবার দেখা যায়নি কোনো ভিড়। এ যেন অন্য এক শ্রমিক দিবস। হন্ডুরাসের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এবারের মে দিবসে দুর্নীতি বন্ধের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বুয়েনস এয়ার্সের সরকারি ভবনের সামনে ‘নো কোয়ারেন্টাইন উইথ হাঙ্গার’ শিরোনামে ব্যানার নিয়ে হাজির হয় শ্রমিকরা।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে অনেক দেশের শ্রমিকরা তাদের কর্মসূচি অনলাইনে পালন করেছে। ফিনল্যান্ডে মে দিবসের বিভিন্ন বক্তব্যমূলক অনুষ্ঠান অনলাইনে লাইভ স্ট্রিমিং করে দেখানো হয়। এছাড়া বাড়ি বাড়ি মে দিবস উপলক্ষে খাবারও পাঠানো হয়। হেলসিঙ্কির রেস্টুরেন্ট মালিক ফিলিপ্পো ফুমসাভান এএফপিকে বলেন, ‘এই পরিস্থিতির মধ্যে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে নতুন নতুন সৃজনশীল পন্থা বের করতে হচ্ছে আমাদের।’ ইতালিতে মে দিবসে প্রতি বছরই রোমের সান জিওভান্নি স্কয়ারে কনসার্ট হয়। কিন্তু এবারের সেই কনসার্ট হয়েছে অনলাইনে। দেশবাসী টেলিভিশনে সেই কনসার্ট দেখতে পেয়েছে। জার্মানিতেও অনলাইন কিংবা স্থানীয় রেডিও স্টেশনে ভাষণ, মিউজিক প্রচার করে মে দিবস পালন করা হয়েছে। ৭০ বছরের মধ্যে এই প্রথম দেশটিতে রাস্তায় বড় সভা-সমাবেশ, মিছিল ছাড়াই পালিত হয়েছে দিবসটি। জার্মান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (ডিজিবি) ও সামাজিক গণতন্ত্রী পার্টি (এসপিডি) অনলাইনে অনুষ্ঠান করেছে। চেক প্রজাতন্ত্রে গাড়ির হর্ন বাজিয়ে এবং ফ্রান্সে বাড়ির বারান্দা থেকে গান গেয়ে অধিকার আদায়ের কথা বলা হয়েছে। লকডাউনের কারণে থমকে গেছে খেটে খাওয়া মানুষদের জীবন। গোটা বিশ্বেই কাজ হারিয়েছে বহু মানুষ। অনেকেরই চাকরি নেই, পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ নেই। এশিয়ার ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে একটা বড় অংশ পোশাকশিল্পের কর্মী। কর্মপরিবেশ, বেতন-ভাতার দাবিতে তারা এ সময় বড় কোনো প্রতিবাদ-সমাবেশও করতে পারছে না। তাই এবারের মে দিবস শ্রমিকদের জন্য অনেকটাই ভিন্ন। তারপরও করোনাভাইরাস সংকটের এই সময়ে এ দিবসটিতে একজোট হয়ে সংহতি প্রকাশ করাটা অনেকেই অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখছেন। গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে শুক্রবার মাস্ক, গ্লাভস পরে শত শত শ্রমিক পার্লামেন্টের বাইরে জড়ো হয়ে ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে বিক্ষোভ করেছে। ড্রোন থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, প্রত্যেকেই দাগ কাটা ঘরে দাঁড়িয়ে সঠিকভাবে দূরত্ব রক্ষা করেছে। তাদের হাতে ছিল লেবার ইউনিয়নের লাল, সাদা, নীল পতাকা। বিক্ষোভকারীদের অনেকেরই মুখের মাস্কে লেখা ছিল ‘বন্ধ মুখেরও একটি কণ্ঠ আছে’স্লোগান।

১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে উপযুক্ত মজুরি এবং দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ না করার দাবিতে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করেছিল শ্রমিকরা। মে মাসের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছিল সে আন্দোলন। পরের বছর প্যারিসের আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে দিনটিকে মে দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর থেকে প্রতি বছরই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।