হেফাজতের তাণ্ডবের ৭ বছর

‘ওপরের নির্দেশ’ না পেয়ে হিমঘরে ৬২ মামলা

সাত বছর আগে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডবের ঘটনায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা ৬২টি মামলার তদন্ত এখনো আটকে আছে ‘রহস্যের বেড়াজালে’। কবে ওইসব মামলার নিষ্পত্তি হবে তা নির্দিষ্ট করে বলতেও পারছেন না কেউ। ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকাসহ ৭টি জেলায় মোট ৮৩টি মামলা হয়। এর মধ্যে দিনের পর দিন ঝুলে থাকা ৬২টি মামলা নিয়ে বিপাকে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি চায় তারা। ‘ওপরের নির্দেশ’ না আসায় মামলাগুলো হিমঘরে পড়ে আছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

তবে বর্তমান আইজিপি বেনজীর আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলাগুলোর নিষ্পত্তির ব্যাপারে কোনো একটা সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা। কারণ হিসেবে তারা হেফাজতের ওই তাণ্ডব মোকাবিলায় তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীরের কঠোর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।

এদিকে হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলছেন, তারা কোনো অন্যায় করেননি। মামলাগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। এ ব্যাপারে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগও হয়েছে তাদের। মামলাগুলো ঝুলিয়ে রাখার বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি পুলিশ। তাদের হাত-পা বাঁধা বলে হেফাজত নেতাদের জানিয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলার মধ্যে মাত্র ১টির বিচার হয়েছে। তদন্ত শেষে ১৮টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার পাশাপাশি দুটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দিয়েছে পুলিশ। তবে বাকি ৬২টির তদন্ত কার্যক্রম থমকে আছে। এ নিয়ে পুলিশের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। মামলাগুলোর চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্র দেওয়ার ‘সবুজ সংকেত’-এর অপেক্ষায় আছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে হেফাজতের তা-বের পর ৭ জেলায় ৮৩টি মামলা হয়। তাতে ৩ হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। তার মধ্যে বাগেরহাটের একটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। রায়ে সব আসামি খালাস পেয়েছেন। দুটি মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। আর ১৮টি মামলার অভিযোগপত্র দিলেও বিচার শুরু হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘মামলায় হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফী ছাড়া শীর্ষস্থানীয় সব নেতাকে আসামি করা হয়। পাশাপাশি ইসলামী ঐক্যজোট, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির, নেজামে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়। ৬২টি মামলা নিয়ে আমরা খুবই বেকায়দায় আছি। রাজনৈতিক কারণে হয়তো মামলাগুলোর বিষয়ে কোনো কিছু চলছে না।’

জামিন না নিয়েই মামলার আসামিদের অনেকে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া তো দূরের কথা, তদন্তও হচ্ছে না। এ নিয়ে পুলিশসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। হেফাজতের দাবি অনুযায়ী পাঠ্যবইয়েও পরিবর্তনও আনা হয়েছে। মামলায় যাদের আসামি করা হয় তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ জামিনও নেননি বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। আসামিদের অবস্থান জানার পরও তাদের ধারেকাছেও যেতে পারছে না পুলিশ।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হেফাজতের তা-বের সময় বর্তমান আইজিপি তখন পুলিশ কমিশনার ছিলেন। ওই সময় তিনি কঠোরভাবে তাদের মোকাবিলা করেছিলেন। এবার দেখা যাক তিনি ৬২টি মামলা নিয়ে কী করেন। ৮৩টি মামলার মধ্যে ঢাকায় ৪৯টি মামলা রয়েছে। আমরা চাই দ্রুত মামলাগুলোর রহস্য সুরাহা হোক।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, দাবি আদায়ে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার ৬টি প্রবেশমুখ অবরোধ করে হেফাজতে ইসলাম। একপর্যায়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয় তারা। এ সময় মতিঝিল-পল্টন এলাকায় এবং এর আগে-পরে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় হেফাজতের কর্মী-সমর্থকরা। তারা বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুর করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এসব ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে মতিঝিল থেকে তাদের সরিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর হেফাজতকর্মীরা ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৬ মে বাগেরহাটে হেফাজতের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে হেফাজতের দুই কর্মী মারা যান। ওই ঘটনায় ফকিরহাটে চার ও সদর থানায় দুটি মামলা করে পুলিশ। এতে হেফাজত, জামায়াত, স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীসহ ১২ হাজার অজ্ঞাতনামাকে আসামি করা হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় সাতটি এবং হেফাজতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়।

মামলায় যাদের আসামি করা হয় তাদের মধ্যে আছেন হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী, চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি মাওলানা মইনুদ্দিন রুহী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা ফরিদ উল্লাহ, মাওলানা শামসুল আলম, মাওলানা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, মাওলানা তাজুল ইসলাম, মাওলানা জুলফিকার জহুর, জামায়াত নেতা মাওলানা হাফিজুর রহমান, হাজি জালাল উদ্দিন, এম এ কাসেম ফারুকী, হেফাজত নেতা মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, মুফতি ফখরুল ইসলাম, মাওলানা মহিউদ্দিন, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, জামায়াত নেতা হাফেজ মাহমুদুল হক শাহীন, বিএনপি নেতা মো. শাহজাহান, আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ছেলে ও হেফাজত নেতা মাওলানা আনাস মাদানী, আবদুল মালেক হালিম, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, কারি ফজলুল করীম, মুফতি হারুন ইজহার, মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, মাওলানা ইলিয়াস ওসমানী, মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, মাওলানা মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মাহফুজুল হক, আবদুল কুদ্দুস, নুরুল ইসলাম, আবুল হাসনাত আমিনী, মোস্তফা আযাদ, মুফতি নুরুল আমিন, মাওলানা শাখাওয়াত হোসেন, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা আতাউল্লাহ তামিম, মাওলানা গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম, শেখ লোকমান হোসেন, মুফতি সাইদুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম মাদানী, মুফতি শামসুল হক, মুফতি মনির হোসেন, মাওলানা আবদুল কাদের, জামায়াত নেতা মাওলানা রফিকুল ইসলাম, আবদুল জাব্বার, ডাক্তার শফিকুল ইসলাম মাসুদ, মাওলানা হেলাল হাসেমী, মাওলানা আবদুর রহমান, মাওলানা গিয়াস উদ্দিন, মাওলানা আবদুস সামাদ, মুফতি তৈয়বুর রহমান, মাওলানা জামাল উদ্দিন, মাওলানা আবদুল করিম, মাওলানা আনাস, মাওলানা আবদুর রহমান খান তালুকদার, মাওলানা মফিজুল ইসলাম, মাওলানা আলী আহমদ, মাওলানা আবদুল কাদের, মুফতি গোলাম মাওলা, মাওলানা আবদুর রহিম, কারি বেলায়েত হোসেন, ওবায়দুর রহমান মাহাবুব, মাওলানা রুহুল আমিন খান, মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন, হাফেজ সাইদুর রহমান, মাওলানা কাজী জাবের, মাওলানা যুবায়ের আহমদ, মুফতি আরিফ বিল্লাহ, ওসমান গনি, একরামুল হক, মাওলানা রেজাউল করিম প্রমুখ। আসামিদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।