এক চিকিৎসকে চলছে ১৭২ শয্যার হাসপাতাল

হাসপাতালটি ১৭২ শয্যার। সেখানে চিকিৎসক একজন। তাকে সহযোগিতা করেন প্রেষণে আনা অন্য এক চিকিৎসক। আর আছেন একজন করে ডিপ্লোমা নার্স ও ফার্মাসিস্ট। করোনাকালে এ হাসপাতালটিই কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারগারের ৯ হাজারের বেশি কারাবন্দির একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাভ্যন্তরে এখনো কোনো বন্দি করোনা আক্রান্ত হয়নি। তবে সেখানে করোনা ছড়ালে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে সেটা সহজেই অনুমেয়। এ অবস্থায় চিকিৎসক বাড়ানোসহ জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, কারা হাসপাতালে চিকিৎসার বেহালদশার মধ্যে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসায় নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে তাদের ফলোআপ চিকিৎসার জন্য প্রায়ই পাঠানোর প্রয়োজন হয়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে ওই সব হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ এই রোগীদের গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করছে। অনেক রোগীকে হাসপাতালের গেট থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় চরম দুর্ভোগে পড়ছেন অসুস্থ কারাবন্দিরা।

কারা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান শুভ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দির সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। এর মধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ জন অসুস্থ। তাদের অনেকেই নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত। এসব রোগীর বিভিন্ন সময় রাজধানীর সরকারি ও বিশেষায়িত বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। তাদের কারও কারও ফলোআপ চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এ জন্য তাদের হাসপাতালে পাঠানো হলে করোনা পরিস্থিতির কারণে ওই সব হাসপাতাল তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে চাইছে না। এমনকি হাসপাতাল গেট থেকেও তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ১৭২ শয্যার হাসপাতালটিই ভরসা। কিন্তু সেখানে চিকিৎসক ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।’

ডা. শুভ বলেন, ‘১৭২ শয্যার হাসপাতালে ৫ জন মেডিকেল অফিসার ও ২ জন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টসহ ৭ জন চিকিৎসকের পদ আছে। কিন্তু সেখানে চিকিৎসক পদায়ন আছেন তিনি (ডা. শুভ) একা। তাকে সহযোগিতা করছেন বরিশাল কারাগারে পদায়নে থাকা খোরশেদ আলম নামে অন্য এক চিকিৎসক। তাকে প্রেষণে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কাজ করতে বলা হয়েছে। যেকোনো সময় ওই আদেশ বাতিলও হতে পারে।’

কারা চিকিৎসক আরও জানান, কারাগারে তিনটি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে, যার দুটি নষ্ট। আর আছেন একজন ডিপ্লোমা নার্স ও একজন ফার্মাসিস্ট। একটি এক্স-রে মেশিন আনা হলেও তা স্থাপনই করা হয়নি। তা ছাড়া সেটা চালানোর জন্য টেকনিশিয়ানও নেই।

কারাগারের এই চিকিৎসক বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্দিদের কেউ করোনা আক্রান্ত হলে বা তাদের কারও শ^াসকষ্ট শুরু হলে মাত্র একজনকে অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যদের অক্সিজেন ছাড়াই রাখতে হবে।’ 

ঢাকা (কেরানীগঞ্জ) কেন্দ্রীয় কারাগারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপকারা তত্ত্বাবধায়ক জানান, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বিপুলসংখ্যক বন্দি নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তিরাও আছেন। তাদের বিভিন্ন সময় রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। কারা চিকিৎসকের পরামর্শে বেশির ভাগ রোগী বাইরে চিকিৎসা নেন; বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (পঙ্গু), হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, চক্ষু ইনস্টিটিউট, নিউরোলজি হাসপাতাল, কিডনি হাসপাতাল ও মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পাঠানো হয়। এসব হাসপাতালে তারা কখনো মাসের পর মাস থেকেও চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। আবার অনেকে নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা করান। করোনা পরিস্থিতির কারণে বাইরে চিকিৎসার বিষয়টি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া বাইরে চিকিৎসা শেষে আবার কারাগারে নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারা কর্মকর্তা জানান, গতকাল বুধবার পর্যন্ত বিএসএমএমইউতে ১২ জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা জেনারেল হাসপাতালে একজন করে কারাবন্দি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিএসএমএমইউ হাসপাতালে আছেন ডেসটিনির রফিকুল আমিন, যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট ও ঠিকাদার জিকে শামীম। কারাগারের তথ্যমতে, তারা সবাই গুরুতর অসুস্থ। হাসপাতালে অবস্থানরত আরও কয়েকজন বন্দিকে কারাগারে ফেরত নিতে বিএসএমএমইউ কর্র্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ওই সব বন্দি সুস্থ না থাকায় বিএসএমএমইউ হাসপাতাল থেকে তাদের ছাড়পত্র দেয়নি।

কারা কর্মকর্তারা বলেন, করোনার কারণে হাসপাতালে রোগীদের পাহারায় যেতে ভয় পাচ্ছেন কারারক্ষীরা। মুগদা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কারাবন্দি করোনায় আক্রান্ত। জাহাঙ্গীর নামে ওই বন্দি গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিলতায় ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে কারারক্ষীদের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়ে। অথচ একজন বন্দির জন্য প্রতিদিন তিন পালায় (শিপট) দুজন করে কারারক্ষীকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেই হিসাবে একজন বন্দির জন্য ২৪ ঘণ্টায় ৬ জন কারারক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২১ কারারক্ষীর করোনা সংক্রমণ দেখা দেয় আর ৭৬ জনকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। আক্রান্ত ২১ কারারক্ষীর মধ্যে ১০ জন মিরপুর মেটার্নিটি, ৯ জন মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ও ২ জন জিনজিরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

কারাগারে চিকিৎসক সংকট প্রসঙ্গে কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজি প্রিজন্স) কর্নেল মো. আবরার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সব কারাগারেই চিকিৎসক সংকট রয়েছে। আমাদের ৬৪ কারাগারে মাত্র ৯ জন চিকিৎসক ছিলেন। জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়কে অনুরোধ করে আমরা চিকিৎসক নিতাম। সম্প্রতি আদালতের নির্দেশনা ও নানামুখী চেষ্টায় ৫১ জন চিকিৎসক পাওয়া গেছে। তারা কারা অধিদপ্তরে যোগদান করেছেন। দ্রুত তাদের দায়িত্ব বণ্টন করা হবে। এরপরও আমাদের চিকিৎসক সংকট রয়েছে।’

অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক আরও বলেন, ‘আমরা করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেশ কিছু জরুরি ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছি। সেটা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ফলে এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। আমাদের চিকিৎসকের অভাব আছে। সেটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আগেই অবহিত করা হয়েছে। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণায়সহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে। চিকিৎসক সংকট নিরসনের পাশাপাশি অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহে কাজ চলছে।’