বিদ্যানন্দ ও আল মারকাজুল ইসলামী

ইউরোপীয় দেশগুলোতে এক ইউরোতে গরিবদের মধ্যে খাবার বিতরণ করে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা। এদের মধ্যে গির্জাভিত্তিক সংগঠনের সংখ্যাই বেশি। এ ধরনের কর্মসূচি আমেরিকাতেও আছে বলে শুনেছি। সম্প্রতি আমাদের দেশেও শুরু করেছে বিদ্যানন্দ নামের একটি দাতব্য ফাউন্ডেশন। ‘এক টাকায় আহার’ কর্মসূচি শুরু করে বিদ্যানন্দ বেশ সাড়া ফেলেছে সমাজে। আমি নিজে ছবি দেখেছি পথশিশুদের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবীরা। সে এক মোহনীয় দৃশ্য বটে। এই বাজারে গরিবদের এক টাকায় খাবার তুলে দিচ্ছে। এটা কল্পনাই করা যায় না আমাদের দেশে। তাদের অন্যান্য কর্মসূচিও বেশ প্রশংসিত হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী কাজের কারণে বিদ্যানন্দের পরিচিতি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই তো কয়েক দিন আগে ইউরোপ প্রবাসী কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে। সবাই কমবেশি আলোচনা করছিল কীভাবে দেশে সাহায্য পাঠানো যায়। এর মধ্যে একজন প্রস্তাব করলেন আর্থিক সহায়তা বিদ্যানন্দকে দেওয়া যেতে পারে। ওরা আমাদের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করে দেবে। দেশেও অনেকেই ত্রাণ-সহায়তা সরাসরি বিদ্যানন্দকে দিয়েছেন বলে শুনেছি। পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিদ্বেষ ও ঝগড়াঝাঁটির সময় বিদ্যানন্দ সমাজের সর্বস্তরেই এক ধরনের আস্থা অর্জন করেছে।

এই সাড়া জাগানো সংগঠনটি আবার আলোড়ন তুলেছে মঙ্গলবার। আলোড়নের কাজটি স্বয়ং করেছেন সংগঠনটির উদ্যোক্তা ও প্রধান ব্যক্তি কিশোর কুমার দাশ। সংগঠনের অফিশিয়াল ফেইসবুক পাতায় তিনি জানান, কিছু লোকের সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের কারণে তিনি বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে যেতে চান। মূলত ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাজে মন্তব্যের কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে সংগঠনটির নাম নিয়েও বাজে ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। কিশোর কুমার দাশের এই ঘোষণার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কালবৈশাখী বয়ে যেতে শুরু করে। এখন দেশে কালবৈশাখীরই সময়। হুটহাট ঝড় শুরু হয় কোনো ধরনের প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তেমন ঝড় শুরু হয় বিদ্যানন্দকে নিয়ে কোনো জানান না দিয়েই। বিদ্যানন্দ কোনো ঝামেলায় আছে বা সমস্যা হচ্ছে এমন কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি এর আগে। এই প্রথম আমরা জানতে পারলাম বিদ্যানন্দকে নিয়ে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানো হচ্ছে।

সম্প্রদায়গত পরিচয়ের কারণে কাউকে কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানের পদ ছাড়তে হবে এটা মেনে নেওয়া কঠিন। সংগঠন পরিচালনায় আলোচনা-সমালোচনা থাকবে। কিন্তু তাই বলে সাম্প্রদায়িক সমালোচনা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু কিশোর কুমার দাশের প্রথম ঘোষণাটি দেখে তাই মনে হয়। যদিও তিনি বলেছেন, সংগঠনটির ৯০ শতাংশ স্বেচ্ছাসেবী মুসলমান। সিংহভাগ দান মুসলমানদের কাছ থেকেই আসে। এরপরও তিনি গুটিকয়েক বিদ্বেষ পোষণকারীর সমালোচনা হজম করতে না পেরে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কী তার ৯০ শতাংশ স্বেচ্ছাসেবী ও দাতাদের ওপর ভরসা রাখতে পারেননি? বিদ্যানন্দকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা করা হয়েছে সম্ভবত। কিন্তু এটা অনেকেরই নজরে আসেনি। বরং জনসাধারণের আস্থার একটি পোক্ত জায়গায় বিদ্যানন্দ পৌঁছেছিল। এ অবস্থায় বিদ্যানন্দকে কারও পক্ষে ঘায়েল করা সহজ ছিল না। বিদ্যানন্দের কর্মসূচির কারণেই জনসাধারণ এই সংগঠনের পাশে থাকবে। কারণ এই সংগঠনের সুবিধাভোগী জনসাধারণ নিজেই। সাধারণ মানুষই এই সংগঠনকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু কিশোর কুমারের বক্তব্য বিদ্যানন্দের অবস্থানকে কিছুটা দুর্বল করে দিল। এতে বিদ্যানন্দকে নিয়ে জনমনে সন্দেহ বাড়বে।

এমনকি এ নিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও ছড়াতে পারত। কারণ তিনি এমন সব অভিযোগ করেছেন, যাতে সমাজে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থেকে যায়। আবার রাতেই মত পরিবর্তন করে ফিরে আসার ঘোষণায় বিদ্যানন্দ সম্পর্কে এক ধরনের অনাস্থার জায়গা তৈরি হবে। গুজব ছড়াবে। তিনি বুঝে প্রথমে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কি না, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তিনি কি কোনো চাপে পড়ে উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন কি না এ ধরনের আলাপ-আলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। কারণ সংগঠনটি দিন দিন বড় হচ্ছে। এর কাজের পরিধিও বাড়ছে। গণমাধ্যমে দেখলাম একটি প্রতিষ্ঠান এক কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংক সম্ভবত ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে। এ ছাড়া দেশ-বিদেশ থেকে নানা ধরনের অনুদান আসবে, আসছে। কয়েকজন সংসদ সদস্যও তাদের কাছে ত্রাণ জমা দিয়েছেন। এমতাবস্থায় সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। কিশোর কুমার দাশের ওপরও চাপ থাকতে পারে। আমাদের দেশে এটাই স্বাভাবিক। তিনি অনেক ভিন্ন মহাদেশের দূর দেশ থেকে সংগঠনটি পরিচালনা করেন। সেখান থেকে এত বড় একটি সংগঠন পরিচালনা করা চাট্টিখানি কথা না। তাই সংগঠন-সংশ্লিষ্টদের অত্যন্ত ভাবনাচিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে আবেগ অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতিকেও বিবেচনা করতে হবে।

বিদ্যানন্দে কী হয়েছে, সেটা এখনো পরিষ্কার না। বরং খণ্ডিত, ছাড়া ছাড়া এক চিত্র দেখতে পাই। পুরো বিষয়টির একটি সম্যক কল্পচিত্র তৈরি করতে হলে আল মারকাজুল ইসলামীকে নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এরাও বিদ্যানন্দের মতোই স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিদ্যানন্দকে নিয়ে যে আবেগ, ভালোবাসা বা প্রতিবাদ আমরা দেখলাম, তার ছিটেফোঁটাও আল মারকাজুল ইসলামীকে নিয়ে দেখা যাচ্ছে না। প্রশ্ন হতে পারে বিদ্যানন্দের চেয়ারম্যানকে নিয়ে আলোচনায় আল মারকাজুল আসে কী করে? একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। তাই আগে আল মারকাজুলের কর্মকাণ্ড বিষয়ে বলে নিই। আল মারকাজুল করোনার ক্রান্তিকালে এক কঠিন দায়িত্ব পালন করছে। করোনায় মৃত বাবাকে ফেলে যখন ছেলে চলে যাচ্ছে। রাতভর স্বামীর মৃতদেহ বাড়ির সামনে স্ত্রী ও সন্তান ফেলে রাখছে, তখন আল মারকাজুল সমাহিত করতে এগিয়ে আসছে। এই সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবকরা বিভিন্ন জায়গা থেকে মৃতদেহ এনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করছে। সন্দেহ নেই আল মারকাজুলের স্বেচ্ছাসেবকরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছেন। কিন্তু আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম কোথায়? তারা কী করছে? বেওয়ারিশ বা বিপদগ্রস্ত মৃতদেহ সমাহিত করার জন্য আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম সুবিদিত। কিন্তু এই ক্রান্তিকালে তাদের কোনো কর্মকাণ্ড নজরে আসছে না। এই কথা বলা যায়, জাগো ফাউন্ডেশনের ক্ষেত্রেও বা অন্যান্য দাতব্য সংগঠনের ক্ষেত্রেও। কেউ কেউ হয়তো করছেও। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছে আল মারকাজুলের স্বেচ্ছাসেবীদের কর্মকাণ্ড। বিদ্যানন্দকে নিয়ে যেভাবে আলোচনা হচ্ছে বা কিশোর কুমার দাশের পদত্যাগে দিনভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখলাম আল মারকাজুলকে নিয়ে কিন্তু তেমন আলোচনা দেখিনি কখনোই। নাগরিক অভিজাত, সুশীল ও প্রগতিবাদীদের আলোচনায় আল মারকাজুল স্থান করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। দুই সংগঠনই তো স্বেচ্ছা সেবামূলক কাজ করছে। তবে আল মারকাজুল ইসলামীকে নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করতে বাধা কোথায়। নাকি নামের কারণে আল মারকাজুলের নাম নিতে চাইছে না কেউ। যেমনটা নামের কারণে বিদ্যানন্দকে নিয়ে অনেক সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলছেন কেউ কেউ। যদি তা-ই হয়, তবে উভয় পক্ষই তো একই সমান্তরালে অবস্থান করছে।

এখানে আল মারকাজুলের গুণকীর্তন করছি না। বরং আল মারকাজুলকে নিয়ে রাজনীতিটা বোঝার চেষ্টা করছি। আল মারকাজুল ইসলামী এক সমালোচিত নাম। এদের সম্পর্কে আগে থেকেই কিছুটা জানতাম। এই সংগঠনটি কারা পরিচালনা করে ও এর কর্মকাণ্ড কী, জানার জন্য তাদের ওয়েবসাইটটি আমি দেখেছি। কিন্তু সেখানে পরিচালনা পর্যদের কোনো তথ্য পেলাম না। তবে দেখলাম বিদ্যানন্দের মতোই বিভিন্ন দাতব্য কর্মসূচি এদের রয়েছে। কিন্তু এই সংগঠনের বিরুদ্ধে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছিল। যদিও নিষিদ্ধ হয়নি। আল মারকাজুলের সঙ্গে চারদলীয় জোট আমলের সংসদ সদস্য মুফতি শহীদুল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। মুফতি শহীদুল ইসলাম এই সংগঠনটির প্রধান উদ্যোক্তা ও কর্তাব্যক্তি। এমনও অভিযোগ উঠেছিল মুফতি শহীদুল ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যে বসেই জঙ্গিদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। তাহলে তার নেতৃত্বাধীন একটি সংগঠন কীভাবে ঢাকা শহরে এত দিন ধরে কাজকর্ম পরিচালনা করছে? এসবের সত্য-মিথ্যা নিরূপণ করা দুরূহ। এমন একসময় তারা মৃতদেহ সৎকারের কাজ করছে, যখন এক ধরনের ক্রান্তিকাল চলছে। এ সময় মানবিক সহায়তার খুব বেশি প্রয়োজন হয়। এমন কাজ করেই বিদ্যানন্দ সবার মনে জায়গা করে নিয়েছে। একইভাবে কি আল মারকাজুল ইসলামী জায়গা করে নিচ্ছে? তাহলে কি আল মারকাজুল ইসলামী ধুয়ে-মুছে সাফ সুতরো হয়ে গিয়েছে। কি এমন হলো যে আল মারকাজুল নিয়ে কেউ কোনো কথা বলছে না। তাদের ভালো কাজের জন্য না, অতীতের জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়েও না।

যত দূর জানি আল মারকাজুল অর্থের বিনিময়ে মৃতদেহ পরিবহন ও সৎকারের কাজ করে থাকে। কিন্তু করোনায় মৃতদের বিনামূল্যেই সমাহিত করছে। এ কাজটি তারা করছে হয়তো ভাবমূর্তি উদ্ধারের জন্য। সমাজের আরও ভেতরে প্রবেশের জন্য। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আল মারকাজুল ইসলামী নিয়ে বিদ্যানন্দের মতোই ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। আর আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামসহ অন্যরা যেহেতু এগিয়ে আসছে না, তাই সরকার আল মারকাজুল ইসলামীকে দিয়ে সৎকারের কাজটি করিয়ে নিচ্ছে। এরই মধ্যে হয়তো তাদের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ থেকে সরে এসেছে দায়িত্বশীলরা। অন্যথায় এতগুলো মৃতদেহ সমাহিত করা কঠিন হয়ে পড়ত। তাদেও কাজে আল মারকাজুল ইসলামী ও সরকার উভয়েই লাভবান হচ্ছে। একইভাবে বিদ্যানন্দের দায়িত্ব থেকে কিশোর কুমারের পদত্যাগের প্রস্তাব ও আবার ফিরে আসায় বিদ্যানন্দ লাভবান হবে। কিন্তু এ ঘটনায় অপর পক্ষ কে আমরা জানি না। হঠাৎ করে এমন কী হলো যে তিনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। একেবারে দায়িত্বই ছেড়ে দিতে চাইলেন। বুঝে হোক আর না বুঝে হোক, বিদ্যানন্দকে তিনি আর বিতর্কমুক্ত রাখতে পারলেন না। কার্যত তিনি বিদ্যানন্দের ভাবমূর্তিকে জলাঞ্জলি দিলেন। কিন্তু কেন তিনি এমন করলেন? কিশোর কুমার কার সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে আবার ফিরলেন, সে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা গেল না।