পরিবর্তন ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ

দুর্যোগ বা মহাদুর্যোগের মধ্য দিয়ে প্রত্যেক সময়ই সমাজে কিছু পরিবর্তন আসে। ব্ল্যাক ডেথের মধ্য দিয়ে ভূমিদাসত্বের শেষ হয়। অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ব্রিটেনের কল্যাণ রাষ্ট্রের সূচনা। দুর্যোগকালে সরকারগুলো এমন সব নীতি গ্রহণ করে যা আগে ‘ইউটোপিয়া’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। যেমন ধরা যাক, গৃহহীনদের গৃহায়ন অথবা মজুরির আওতায় আনার মতো বিষয়। আবার যখন দুর্যোগ শেষ হয়ে বিশ্ব স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে তখন একটা বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যে, আপৎকালে করা পরিবর্তনগুলো কি রাখা হবে নাকি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে তিন কোটি মানুষ ইতিমধ্যেই করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাবে চাকরি হারিয়েছেন। অর্থনৈতিক ভারসাম্য রাখতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দেশের প্রত্যেক পরিবারকে তিন হাজার ডলার করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ টিমোথি গার্টন অ্যাশের মতে, বৈশ্বিক আয় বিষয়টিকে এখন যুগোপযোগী বলা হলেও কিছুদিন আগেও একে ‘ইউটোপিয়া’ বলা হতো। যদিও এক পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপের ৭১ শতাংশ মানুষ এখন এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ শুরুতে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর জন্য কোনো ‘ম্যাজিক মানি’ দিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে আরও বিনিয়োগে ঝোঁকেন তিনি। ব্রিটেনে রাষ্ট্রায়ত্ত জাতীয় স্বাস্থ্য সেবাখাত ২০০৮ সালের অর্থমন্দার পর এক দশক ধরে তহবিল সংকটে ভুগছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পার্টিই এখন এনএইচএসে অর্থ জোগান দিচ্ছে, অথচ এই পার্টিটিই বিনামূল্যের সেবাখাতকে বেসরকারিকরণ করতে চেয়েছিল। জনসন তো তার জীবন বাঁচানোর জন্য এনএইচএসের ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ওয়্যারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অধ্যাপক মার্ক হ্যারিসনের মতে, এনএইচএস প্রধানমন্ত্রী জনসনের জীবন বাঁচিয়েছে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে কনজারভেটিভ পার্টি পরবর্তীতে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাববে।’ যুক্তরাজ্য সরকার গৃহহীনদের খালি হোটেল ও হোস্টেলগুলোতে তুলেছে, যাতে ভাইরাসের বিস্তার না ঘটে। অথচ লন্ডনের রাস্তায় প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি গৃহহীন রাত কাটায়। এদের ব্যাপারে স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষকে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। বিপদের মুখে করা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশটিতে গৃহহীনের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার। এদের অনেকেই বাড়িভাড়া দিতে না পেরে গৃহহীন হয়েছেন। অবশ্য বিশ্লেষকরা এমন অবস্থার জন্য সরকারি নীতিমালাকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেমন মার্শাল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তেমনি এবারও পরিকল্পনা নিতে হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির প্রধান ফেইথ ব্রিয়ল নতুন অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বিশ্বনেতাদের প্রতি গ্রিন এনার্জি চেষ্টা করে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। জার্মানি রাষ্ট্রায়ত্ত দানকে শর্তভিত্তিক করেছে। যে প্রতিষ্ঠান জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত নীতিমালার মধ্যে থাকবে তারাই দান পারে। অন্যদিকে ফ্রান্স সরকার বলছে, তারা এয়ার ফ্রান্সকে ৭ বিলিয়ন ইউরো বেলআউট দেবে যদি প্রতিষ্ঠানটি সংক্ষিপ্ত দূরত্বে বিমান চালনা ও কার্বন নির্গমন কমায়। যদিও ব্যবসায়িক নেতারা এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। তারা বর্জ্য কমানো ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধের মতো বিষয়গুলোতে জোর দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা করোনাভাইরাসের এই মহামারীতে বিশ্বজুড়েই অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন। এখন দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে সেই পরিবর্তন কতটা ধরে রাখতে পারে বিশ্ব নেতৃত্ব, তা-ই দেখার বিষয়।