চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও থেমে নেই খুনোখুনি। পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ আর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় বেশিরভাগ খুন হয়েছে স্বজনদের হাতে।
গত ৫ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন শিশুসহ ১১ জন।
পুলিশের দাবি, তাদের নজরদারি বাড়লেও দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের জেরে খুনের ঘটনা ঘটছে। সাম্প্রতিক খুনের ঘটনার তথ্য থেকে দেখা যায়, লকডাউনের কারণে বেশি সময় ধরে ঘরবাড়িতে থাকা লোকজন সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে সম্পত্তি নিয়ে সালিশ বৈঠক, ভূমি পরিমাপ ও স্থাপনার দখল ঘিরে খুনোখুনি ঘটছে।
গত ২ মে জমি নিয়ে বিরোধে চাচাতো ভাইদের হাতে মারধরে গুরুতর আহত পটিয়ার শোভনদন্ডী ইউনিয়নের বৃদ্ধ বুদরুছ মিয়া ৫ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, বুদরুছের চাচাতো ভাইয়েরা বিরোধী সম্পত্তি পরিমাপ করতে সার্ভেয়ার আনলে বুদরুছ ও তার পরিবারের সদস্যরা বাধা দেয়। এরপর কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে চাচাতো ভাইদের লাঠির আঘাতে গুরুতর আহত হন বুদরুছ ও তার এক ছেলে।
২ মে নগরীর ইপিজেড থানার ফ্রি-পোর্ট এলাকা থেকে মাহাফুজুর রহমান (২৪) নামে এক হকারের মরদেহ একটি ভবনের সিঁড়ি থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। ওই হকারের মুখে টেপ মোড়ানো ছিল। পুলিশ জানিয়েছে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
একই দিনে ফটিকছড়ি নানুপুর এলাকায় তরুণদের দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে একজন খুন হন। যার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ, তিনি নিহতের বন্ধু ছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
২৭ এপ্রিল নগরীর ডবলমুরিং এলাকায় পারিবারিক একটি দোকান নিয়ে দুই ভাইয়ের ঝগড়ার একপর্যায়ে ইট ছুড়ে মারায় আজগর আলী নামে এক ব্যক্তি মারা যান। পুলিশ জানায়, ছোট ভাই আক্কাস আলী বাচ্চুই (৪৫) তার বড় ভাইকে ইট ছুড়ে মেরেছিলেন।
রাউজানের অংকুরিঘোনা এলাকায় পূর্বশত্রুতার জেরে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা বিতান বড়ুয়াকে গুলি করে খুন করা হয়। ওই সময় ঘটনাস্থলে যাওয়া পুলিশরা জানিয়েছেন, বেশ কিছুদিন আগে প্রতিবেশী রাহুল বড়ুয়ার বাড়িতে সীমানা দেয়াল স্থাপন নিয়ে বিতানের সঙ্গে বিরোধের শুরু। এ ঘটনায় একজনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিক কর্ণফুলী এলাকায় পারিবারিক সালিশে আরিফ দোভাষ (২০) নামে এক যুবক খুন হয় ২৫ এপ্রিল সকালে। পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, বৈঠকে পূর্ব বিরোধ নিয়ে চাচাতো ভাইদের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আরিফকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এই ঘটনায় একজনকে র্যাব গ্রেপ্তার করে।
গত ২৩ এপ্রিল নগরীর বাকলিয়ায় বলিরহাটে পারিবারিক কলহে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী জোবাইদা বেগমকে হত্যার অভিযোগে স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন সীতাকুন্ডে দক্ষিণ মহাদেবপুর এলাকায় সিগারেটের ধোঁয়া নিয়ে বিরোধের জেরে শাহীন ও জহিদ নামে দুই যুবক খুন হন। এর আগের দিন রেলস্টেশনে বসে আড্ডা দেওয়ায় সেখানে ধোঁয়া নিয়ে বিবাদের সৃষ্টি হয়।
গত ২৪ এপ্রিল নগরীর কর্ণফুলী এলাকায় এক কবিরাজকে খুনের ঘটনায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাব জানায়, এক তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিন্ন করতে তরুণীর পরিবারের অনুরোধে কবিরাজ কাজ করায় ক্ষিপ্ত হয় প্রেমিক। এ কারণে গ্রেপ্তার ৬ জন ১১ এপ্রিল ঘর থেকে কবিরাজ মোহাম্মদ সায়েমকে ডেকে নিয়ে খুন করে।
এর আগে ২১ এপ্রিল পটিয়া কালারপোল এলাকায় একটি ড্রাম থেকে আবদুল কাদের (২৬) নামে এক পান দোকানির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় হোটেল কর্মচারী মো. শাওনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৭। কাদের সচ্ছল জীবনযাপন করতেন। এ কারণে আসামিরা ভেবেছিল তার কাছে কয়েক লাখ টাকা জমা থাকতে পারে। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার লোভে খুন করা হয় কাদেরকে।
গত ৯ এপ্রিল পাওনা টাকা চেয়ে কথা কাটাকাটির জেরে ছুরিকাঘাতে এক যুবক নিহত হয়। এই ঘটনায় ৪২ বছর বয়সী এমরান হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, মূলত ইয়াবা সেবন নিয়ে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হয়। এমরান কর্মহীন হয়ে পড়ায় তার পাওনা টাকা চেয়েছিল নজরুলের কাছে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়। পরে এমরান নজরুলকে খুন করে।
গত ৫ এপ্রিল তুচ্ছ ঘটনায় চান্দগাঁও এলাকায় কথা কাটাকাটির জেরে এক যুবক খুন হয়। পানির কল মেরামতের বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে খুন হয় কামরুল নামে এক যুবক।
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলা পর্যায়ে যেসব খুনের ঘটনা ঘটেছে তার বেশিরভাগ পারিবারিক অসহিষ্ণুতার কারণে। নেপথ্যে জমি-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ। আমরা হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করেছি। বিশেষ করে রাউজানে গুলি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অস্ত্রসহ হত্যাকারী গ্রেপ্তার হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামগুলোতে নিয়মিত টহল দেওয়া হচ্ছে, যাতে কেউ গণজমায়েত করতে না পারে।
সিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (জনসংযোগ) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, লকডাউনে দোকানপাট বন্ধ। আর্থিক অসচ্ছলতা, রমজান মাস চলছে, সামনে ঈদ সবকিছু মিলিয়ে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। এসব অপরাধ প্রবণতা কমাতে পুলিশ নাগরিকদের বিভিন্ন সহায়তাও করছে, অন্য সময়ের চাইতে টহলও জোরদার। কিন্তু তারপরও কিছু পারিবারিক কলহ আর পূর্বশত্রুতা সংক্রান্ত অপরাধ হচ্ছে।