গুগল সার্চে বেশি কিছু খুঁজে পাবেন না। ইউটিউবের বিশাল ভুবনেও টমাস কার্লোভিচের ফুটবল স্কিলের তেমন প্রমাণ নেই। পৃথিবীও তাকে চেনে না। অথচ ডিয়েগো ম্যারাডোনা বলছেন, ‘টমাস কার্লোভিচ, তুমি আমার চেয়েও বড় ফুটবলার!’
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে কোনোদিন খেলেননি কার্লোভিচ। প্রিমিয়র ডিভিশন ম্যাচ খেলেছেন মাত্র একটি। সারা জীবন খেলে গেছেন দ্বিতীয় বিভাগে। রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে মিডফিল্ডে খেলতেন। তার স্কিলে মুগ্ধ হোসে পেকারম্যান বলেছিলেন, ‘আমার দেখা সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ফুটবলার।’
কার্লোভিচের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৯ এপ্রিল রোজারিওতে। বুয়েনস আয়ার্সের এ পোর্ট সিটির খ্যাতি ম্যারাডোনার জন্য। আরেকজন ফুটবল কিংবদন্তিরও জন্ম সেখানে, লিওনেল মেসি। সেখানেই জন্ম কালোর্ভিচের, বেড়ে ওঠা। রোজারিওর মিথ ছিলেন তিনি। ৮ মে মৃত্যু হয়েছে তার। স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। ৭৪ বছরের কার্লোভিচ মারা গেছেন দুর্ঘটনায়। নিত্যসঙ্গী সাইকেল নিয়ে চলছিলেন। ছিনতাইকারী সেটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিয়েছিলেন তিনি। ফলে মার খেতে হয়। দুষ্কৃতদের হামলায় আহত হয়ে দিন দুয়েক ভর্তি ছিলেন নিউ মেক্সিকোর একটি হাসপাতালে। সেখানেই হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কার্লোভিচ। মর্মান্তিক এ খবর শোনার পর ম্যারাডোনা লিখেছেন, ‘আমি ভাবতে পারছি না। দিনকয়েক আগেও তোমার সঙ্গে দেখা হলো। আর আজ তুমি নেই। তোমার পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা রইল। আশা রাখি তুমি ন্যায়বিচার পাবে। শান্তিতে ঘুমোও প্রভু।’
ফেব্রুয়ারিতেই দেখা দুই কিংবদন্তির। ম্যারাডোনা ইন্সটাগ্রামে কার্লোভিচের সঙ্গে জার্সি হাতে ছবিও পোস্ট করেছিলেন। সেই দেখা নিয়ে কার্লোভিচ সাংবাদিকদের পরে বলেন, ‘ডিয়েগো আমার কানের কাছে এসে প্রচুর কথা বলছিল। তার বকবকানি থামতেই চাইছিল না। আমার নাম লেখা একটি জার্সিতে স্বাক্ষর করে লিখে দিয়েছে, ত্রিঞ্চে, তুমি আমার চেয়ে অনেক ভালো ছিলে। কী পাগল একটা। তবে এ প্রশংসার পর আমি শান্তিতে মরতে পারব। এটাও বলে রাখি, আমার জীবদ্দশায় মাঠে দেখা সেরা ফুটবলার ম্যারাডোনা।’
রোজারিও আদর করে কার্লোভিচের নাম দিয়েছিল ‘এল ত্রিঞ্চে’। সারা জীবন খেলেছেন আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিভাগে। রোজারিও সেন্ট্রাল থেকে একবার ধারে খেলতে গিয়েছিলেন স্পোর্টিং ডি বিগান্ডায়। সেখানেই লস আন্দেসের বিপক্ষে একমাত্র প্রিমিয়ার ডিভিশনের ম্যাচটি খেলেন। এরপর ফ্লান্ডেরিয়ায় চার মাস কাটিয়েছেন। ১৯৬৯-এ ক্লাব ফুটবলে অভিষিক্ত কার্লোভিচ ১৯৭২ সালে যোগ দেন সেন্ট্রাল কর্দোভাতে। অভিষেক ম্যাচে দুই গোল করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। দলকে শিরোপাও এনে দেন। রোজারির সেন্ট্রাল কর্দোবার হয়ে ৯ মৌসুম খেলেছেন। ২৩৬ ম্যাচে গোল করেছেন ২৮টি। আর সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে অসংখ্য গোল করিয়েছেনও। তবে এসব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয় কত বড় ফুটবলার ছিলেন কার্লোভিচ। তাই কিংবদন্তির আশ্রয় নেওয়া যাক।
১৯৯৩ সালে ম্যারাডোনা খেলতে গিয়েছিলেন রোজারিওর ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে। এক সাংবাদিক তাকে রোজারিওর সেরা ফুটবলার বলেন। একটুও খুশি না হয়ে সাংবাদিকের দিকে তাকিয়ে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘রোজারিওর সেরা আমি নই। এখানকার শ্রেষ্ঠ ফুটবলার কার্লোভিচ। আমি তার কিংবদন্তি শুনে বড় হয়েছি।’
কিংবদন্তির সঙ্গে রোমান্টিকতা হাত ধরাধরি করে চলে। কার্লোভিচ তার সেরা উদাহরণ। সারা জীবন দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাবে খেললেও তার স্কিলে মুগ্ধ হয়ে আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত ম্যানেজার সিজার লুইস মেনোত্তি একবার জাতীয় দলে সুযোগ দিয়েছিলেন। সুযোগ পেয়ে কার্লোভিচ যা করেছিলেন পেশাদার ফুটবলে কারও পক্ষে তা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। মেনোত্তির মুখেই শুনুন, ‘একবার কার্লোভিচকে জাতীয় দলে সুযোগ দিলাম। কিন্তু ম্যাচের দিন ও মাছ ধরতে কোনো এক আইল্যান্ডে চলে গিয়েছিল।’ এ কারণেই হয়তো ১৯৮৬-এর বিশ্বজয়ী দলের সদস্য জর্জ ভালদানো বলেছিলেন, ‘কার্লোভিচ হলেন রোমান্টিক ফুটবলের প্রতীক। যার এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই।’
কার্লোভিচকে ঘিরে কত গল্প ফুলে-ফলে পল্লবিত হয়ে আছে রোজারিওর মাঠে-মাঠে। এটা অবশ্য গল্প নয়, সত্যি। ফুটবল মাঠ থেকে রোমান্টিকতা যে কোনোদিন ফুরিয়ে যাবে না তার প্রমাণও। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ খেলার প্রস্তুতি নেবে আর্জেন্টিনা। ম্যানেজার ভালদিসলাও কাপ ভাবলেন দলটা নিয়ে রোজারিও গেলে কেমন হয়। তাহলে রথ দেখা, কলা বেচা দুই হবে। কার্লোভিচের খেলাও দেখা হবে সঙ্গে ফুটবলারদের প্রস্তুতিও ঝালিয়ে নেওয়া যাবে। রোজারিওতে খেলতে গিয়েছিলেন মারিও কেম্পেস, উবালদো ফিলোল, রবার্তো পারফুমোরার মতো ফুটবলাররা। আর রোজারিওতে ছিলেন শুধু কার্লোভিচ। এমন মায়াবি ফুটবল খেলেছিলেন যে, আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধেই ৩-০-তে পিছিয়ে পড়ে। লজ্জা ঢাকতে কাপ দ্বিতীয়ার্ধে কার্লোভিচকে মাঠে না নামার অনুরোধ করেছিলেন। সেই ম্যাচের পরেই অর্জেন্টিনা দলে খেলার অনুরোধ এসেছিল। তিনি প্রিয় রোজারিও ছেড়ে কোথাও যেতে চান না বলে বন্ধুর সঙ্গে মৎস্য শিকারে বেরিয়েছিলেন। বিশ্বের নামিদামি ক্লাবের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন শুধু রোজারিও ছেড়ে অন্য কোথাও যাবেন না বলে। পেলে নিজের ক্লাবে নিতে চেয়েছিলেন কার্লোভিচকে। পারেননি। পারা সম্ভবও ছিল না। কার্লোভিচ ছিলেন ফুটবলের নিভৃতচারী আর্টিস্ট। যিনি অসীম প্রতিভা থাকলেও চেনা বৃত্তের বাইরে যেতে চাননি।
গেলে কী হতো? রোজারিওর ‘এল ত্রিঞ্চে’কে নিয়ে অভিজাত পত্রিকা ‘এল গ্রাফিকো’ লিখেছিল, ‘তার স্টাইল ছিল। সঙ্গে ছিল আভিজাত্যও। পায়ে তীব্র গতির সঙ্গে এমন অলস ছন্দ খেলা করত যে মনে হতো একটা ঢেউ নাচতে নাচতে প্রতিপক্ষের দিকে বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কার্লোভিচ ছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবলের বিদ্যুৎ চমক। লাতিন আমেরিকান ফুটবলের কাব্যরূপ।’
কার্লোাভিচ যদি রোজারিও ছেড়ে কোনোদিন আর্জেন্টিনার বাইরে যেতেন তাহলে সেই কাব্যরূপটা চোখে দেখতে পেত পৃথিবী।