গীতা, কাই ও তাহমিনাদের চাপা পড়া গল্প
তাহমিনার কাহিনী সবাই জানেন। আপনাদের চোখের সামনেই মেয়েটিকে মেরেছে। কুপিয়ে। স্বামীর হাতে মরণ। মরণ-দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে ফেইসবুক লাইভে। এপ্রিলের ১৫ তারিখের ঘটনা। লকডাউনের মধ্যেই। হত্যাকারীর ‘মাথায় গোলমাল’ আছে কি না, তা নিয়ে লোকে কৌতূহলী হয়েছে। কত তাহমিনা মারা পড়ছে মাসে মাসে! বছর শেষে বেসরকারি সংস্থার তালিকায় তারা ঠাঁই পায়। পারিবারিক সহিংসতায় মৃত্যুর টালিতে যোগ হয় তারা। কেউ কেউ অবশ্য পরিসংখ্যানের অংশ হওয়ার ‘সৌভাগ্যটাও’ পায় না। জীবনের মতো, তাদের মরণটাও ইট-চাপা-ঘাস।
পারিবারিক সহিংসতায় মারা পড়ে টালি খাতায় যোগ হওয়া বা না হওয়া সেই তাহমিনাদের স্বামী ও শ্বশুরালয়ের আত্মীয়দের মাথার গণ্ডগোল নিয়ে কাউকে প্রশ্ন করতে দেখেছেন? মারলে মাথায় গণ্ডগোল নেই, সম্প্রচারেই যত শোরগোল? মারার লাইসেন্স না থাকলে সম্প্রচারের সাহস আসত কোত্থেকে? উত্তরটা খুঁজুন। আমি গীতার গল্পে যাচ্ছি। গীতার বাড়ি ভারতে। তার স্বামী বিজয়। অটোরিকশাচালক। স্বামী তাকে মাঝেমধ্যেই পেটায়। করোনাভাইরাস মহামারীতে আয় কমে গেছে। সেই ঝাল গীতার ওপর মেটাচ্ছে। পেটানো মাত্রা ছাড়িয়েছে। কয়েক ফিটের ঘুপচি ঘর। বাচ্চাদের সামনেই দেয়ালে জিনিস আছাড় মারে বিজয়। গীতার চুলের মুঠি ধরে টানে। কিন্তু গীতা পালাবে কই? পাতালে লুকাতে সীতার মতো সে কি ‘ধরণি দ্বিধা হও’ বললেই কাজ হবে!
কাইয়ের কাহিনীটা গীতার চেয়েও মর্মান্তিক। মার্কিন মেয়ে কাই। বাবা-মা বিচ্ছিন্ন। সে মায়ের সঙ্গে ছিল। ছোট কাজ করে মা। স্বল্প আয়। মহামারীতে সেটাও গেল। চাকরি হারিয়ে বেদিশা মা। কাইকে বাবার কাছে চলে যেতে বললেন। কাই ভেবেছিল, মায়ের মেজাজ ঠান্ডা হলে যেতে হবে না। কিন্তু আশার গুড়ে বালি। সত্যিই বাবার কাছে যেতে হবে জেনে কাইয়ের বুকের রক্ত হিম। সেই বাবা! বছরের পর বছর যে যৌন নির্যাতন চালিয়েছে! এ কথা মুখ ফুটে এখনো সে মাকে বলতে পারেনি। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, ট্রমাক্রান্ত কাই কমাস আগে মনোচিকিৎসকের আশ্রয় নিয়েছে। মহামারীতে সেই সেবাটাও বন্ধ। এর মধ্যেই বাধ্য হয়ে সে বাবার বাড়ি ফিরেছে। কাইয়ের থাকার কক্ষের দরজায় ছিটকিনি নেই। ভেতর থেকে আটকানো যায় না। ভয়ে রাতে ঘুম হয় না। সারাক্ষণ আতঙ্কিত কাই টয়লেট বা খাওয়া ছাড়া রুমের বাইরে আসে না।
গীতা ও কাইয়ের কথা বিস্তারিত লেখা আছে বিবিসি বাংলার ৩১ মার্চের একটি প্রতিবেদনে। দুর্ভাগা কাইয়ের জন্য বাংলাদেশ থেকে হয়তো আমরা শুধু প্রার্থনাই পাঠাতে পারি। গীতার জন্যও প্রার্থনাই। নির্যাতকের সংসার ছাড়তে সে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গোপনে কাজ শিখছিল। পায়ের নিচে গীতা যেন এক দিন মাটি খুঁজে পায় সেই প্রার্থনা করি। কিন্তু স্বদেশি তাহমিনাদের বেলায় কী করবেন? শুধু প্রার্থনাতেই কাজ সারতে করতে চান?
পুরুষতন্ত্রের বৈশ্বিক মহামারী
মহামারীর কাল। সময়ের দাবি বুঝে ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি দিয়েছে সৌদি আরব। মহাবিপদ বুঝেই কারাগার থেকে হাজার পাঁচেক বন্দি, যাদের শাস্তির বেশিটাই ভোগ হয়ে গেছে, মুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এমন করুণ দিনেও নৃশংসতায় যতি টানেনি পুরুষতন্ত্র। রক্তপিপাসু ড্রাকুলার মতো নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে উন্মত্ততায়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস গত মাসেই জানিয়েছেন, পৃথিবীর নানা দেশে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশ কলাম্বিয়ায় ১১ মে, অর্থাৎ আজই লকডাউন শেষ হওয়ার কথা। রয়টার্সের বরাতে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক খবর জানাচ্ছে, কলাম্বিয়ায় লকডাউন শুরুর প্রথম ১৮ দিনে ন্যাশনাল উইমেন্স হটলাইনে পারিবারিক সহিংসতাজনিত কলের পরিমাণ ১৩০ শতাংশ বেড়েছে। নারী নির্যাতনের সংখ্যা বেড়েছে মেক্সিকো ও ব্রাজিলেও। আর্জেন্টিনায় জরুরি হটলাইন নম্বরে গতবারের তুলনায় এ বছর এপ্রিলে কল বেড়েছে ৬৭ শতাংশ। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঁচু। গত বছরও বিরাট-বিরাট র্যালি ও প্রতিবাদ সভা হয়েছে। অথচ সেখানেও করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেই ভাইরাসের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে পুরুষতন্ত্রের আগ্রাসন ও পারিবারিক নির্যাতন। যেসব দেশে হটলাইনে রিপোর্টের সংখ্যা বেড়েছে, সেগুলো তাও ভালো। কিন্তু চিলি ও বলিভিয়াতে হঠাৎ করেই পারিবারিক সহিংসতাবিষয়ক কলের সংখ্যা কমে গেছে। এই তথ্যে শঙ্কিত হয়েছে স্থানীয় নারী অধিকার রক্ষা সংগঠন থেকে শুরু করে জাতিসংঘ।
ইউএন উইমেন বলছে, হঠাৎ করে কলের সংখ্যা কমার অর্থ হচ্ছে, নির্যাতিত নারীরা অভিযোগ করার বা সাহায্য চাইবার সুযোগটিও পাচ্ছেন না। ইউএন উইমেনের লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের পরিচালক মারিয়া নোয়েল বায়েজা রয়টার্সকে বলেছেন, ২০১৯ সালে এই অঞ্চলে ফেমিসাইড বা লৈঙ্গিক কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৩ হাজার ৮০০ নারী। এই তথ্য দিয়ে মিজ বায়েজা শঙ্কিত চিত্তে বলেছেন, ‘এ বছর না-জানি সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়’! জাতিসংঘ জানিয়েছে, লেবানন ও মালয়েশিয়ায় হেল্পলাইনে কলের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। চীনে বেড়েছে তিন গুণ। অস্ট্রেলিয়ায় পারিবারিক নির্যাতন রোধে সাহায্যকারী সংস্থার খোঁজে গুগলে সার্চের পরিমাণ বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও ডেনমার্কের অবস্থাও গুরুতর। এপ্রিলের ৬ তারিখে প্রকাশিত খবরে বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটেনে লকডাউনে ন্যাশনাল ডোমেস্টিক এবিউজ হেল্পলাইনে কল বেড়েছে ২৫ শতাংশ। সংস্থাটির অনলাইনে ভিজিটর বেড়েছে ১৫০ শতাংশ। ভয়েস অব আমেরিকার (ভিওএ) বরাতে এনপিআর জানাচ্ছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় লকডাউনের প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ৯০ হাজার ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। ভিওএর অন্য আরেক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ডেনমার্কে শেল্টার হোমে আশ্রয়প্রার্থী নারীর সংখ্যা বেড়েছে। দ্য কাউন্সিল অব ইউরোপের বরাতে ভিওএ জানিয়েছে, স্পেনের হটলাইনগুলোতে কলের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু ফ্রান্স ও ইতালিতে হঠাৎ করেই কলসংখ্যা কমে গেছে। লাতিন আমেরিকার মতোই এখানেও নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার সংস্থাগুলো বলছে, আদতে নারীরা এতটাই অনিরাপত্তায় ভুগছেন যে, তারা কলও করতে পারছেন না।
বাংলাদেশে কদিন আগে এক জরিপে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন বলেছে, এপ্রিলেই পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে ৪ হাজার ২৪৯ নারী। কিন্তু এটি যে দেশের প্রকৃত চিত্র নয়, তা আপনারা জানেন। মাত্র ১৭ হাজার ২০৩ জনের সঙ্গে কথা বলে নির্যাতনের এই তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশে মানুষ যদি আরও সচেতন ও সোচ্চার হতো, যদি হটলাইন-হেল্পলাইন থাকত, যদি গালি দেওয়ার ঘটনাও ‘ভারবাল এবিউজ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতো, ইউরোপের দেশগুলোর মতো যদি তস্য-গ্রামের ঘটনাও রিপোর্ট হতো, তাহলে সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে ঠেকত?
দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন
মহামারীতে বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে চাঙা করতে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। পাশাপাশি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধেও তারা তৎপর। লকডাউনে পৃথিবী স্থবির। আইন-আদালত-সাহায্যকারী সংস্থার কাজ সীমিত। পুলিশসহ সবাই ব্যস্ত করোনা মোকাবিলায়। ফলে, পুরুষতন্ত্রের মহামারীতে সংক্রমিত হওয়া নারীরা চটজলদি আইনি-মানসিক ও অন্যান্য সহায়তা পাচ্ছেন না। অবশ্য, এর মধ্যেও অনেক দেশ অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে। বেলজিয়ামের রাজধানীতে ভিকটিমদের জন্য খোলা হয়েছে বিশেষ হোটেল। গীতার মতো বেলজিয়াম নারীরা হয়তো সেখানে আশ্রয় পাবে। ইতালিতে পারিবারিক সহিংসতার তথ্য পেতে চালু হয়েছে ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যালার্ট’ অ্যাপ। ফ্রান্সে নির্যাতিত নারীদের ইমেল ও খুদেবার্তার মাধ্যমে কাউন্সেলিংসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। স্পেনে চালু হয়েছে পারিবারিক সহিংসতা কোড ‘মাস্ক-১৯’। অনেক সময় নির্যাতিত নারীরা বাসা থেকে ফোন করতেও ভয় পান। তখন, নিকটস্থ ফার্মেসিতে কোনো নারী গিয়ে ‘মাস্ক-১৯’ চাইলেই বোঝা যায় তার সাহায্য লাগবে। ফ্রান্সেও এই কোড চালু হয়েছে। ইংল্যান্ডে যৌন হয়রানি বন্ধে ২০১৬ থেকেই চালু ছিল ‘আস্ক ফর এঞ্জেলা’ ক্যাম্পেইন। এবারে পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলায় চালু হয়েছে ‘ইউ আর নট এলোন’। এ ছাড়া পারিবারিক সহিংসতা ঠেকাতে দুই মিলিয়ন পাউন্ডের তহবিল গঠনে উদ্যোগ নিয়েছে ইংল্যান্ড।
পুরুষতন্ত্রের মহামারী ঠেকাতে অনেক দেশই তৎপর। করোনাভাইরাস মহামারীতে অর্থনৈতিক ক্ষতি পোষাতে বাংলাদেশও নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পুরুষতন্ত্রের মহামারী ঠেকাতে কোনো উদ্যোগ কি আপনার চোখে পড়েছে?
আমাদের মা আজও অশ্রুবিন্দু
ইউএন উইমেনের এক জরিপ বলছে, লকডাউনে বাংলাদেশে নারীদের কাজ বেড়েছে। বেড়েছে মানসিক চাপ। গৃহকর্ম, রান্না-বান্না, শিশু পালন, বয়স্কদের সেবাদান। সব সামলাচ্ছে নারী। জরিপটি বলছে, গৃহকর্মে সাহায্য বলতে ‘পুরুষরা শুধু বাজারে যায় আর শিশুদের সঙ্গে খেলা করে’। নারীর সব কাজের চাপের সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যোগ হয়েছে স্বামীর মৌখিক অত্যাচার, মানসিক নিপীড়ন ও শারীরিক নির্যাতন। করোনা মহামারীতে নারীরাও চাকরি হারাচ্ছেন। নারীদেরও রোজগার কমছে। তাদেরও আছে মানসিক চাপ। কিন্তু নিজের জন্য শোক করা তো দূরে, পা পেতে তার বসারই জো নেই।
ভাববেন না, নারীর প্রতি পুরুষের এই নির্যাতন কেবল দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে। অর্থনৈতিকভাবে সবল নারীকেও স্বামী শাসায়। শারীরিকভাবেও চড়াও হয়। কর্র্তৃত্বের এই সংস্কৃতিই নারীকে রীতিনীতি- সংস্কৃতির নামে ফাঁদে আটকায়। পুরুষকে চড়াও হতে আর নারীকে সইতে শেখায়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুরও এই ফাঁদ সহজে ছিঁড়তে পারেননি। তাহলে কী করে পারবে দুর্বল তাহমিনা?
গীতা বা কাইকে হয়তো আপনার সুরক্ষা দেওয়ার উপায় নেই। কিন্তু তাহমিনাদের নিয়ে কদিন নীরব থাকবেন? তাহমিনাদের তালিকায় আপনারই বোন বা মেয়ে বা জিগরি দোস্ত বা নারী হলে আপনি নিজেও যে এক দিন ঢুকে পড়বেন না, সেই নিশ্চয়তা কে দিয়েছে?
লেখক
কবি ও সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ
afroja.shoma@gmail.com