পোশাক শ্রমিকদের মে মাসের বেতন ঈদের পর দেওয়া হবে। বিজয়নগরের শ্রম ভবনে শ্রম প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সাড়ে ৫ ঘণ্টা বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি ঈদের ছুটি তিন দিন থাকবে। সরকার-মালিক-শ্রমিকপক্ষ গতকাল বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বোনাসের বিষয়ে মালিক ও শ্রমিকপক্ষ ঐকমত্য পৌঁছতে পারেনি। আগামী সপ্তাহে আবার বৈঠক করে ঈদ বোনাসের বিষয় চূড়ান্ত করা হবে।
শ্রম সচিব কেএম আলী আজমের সঞ্চালনায় বৈঠকে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী ও শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক, বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন, বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান। এছাড়া ৪২টি শ্রমিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ফজলুল হক মন্টু, গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি লীমা ফেরদৌস, ইন্ড্রাস্টিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক চায়না রহমান ও বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি প্রমুখ।
বৈঠকে শ্রমিক নেতারা বলেন, ঈদের আগে শ্রমিকদের মে মাসের ১৫ দিনের বেতন এবং পূর্ণাঙ্গ বোনাস দিতে হবে। তা না হলে শ্রমিকদের বেঁচে থাকাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে যে বেতন দেওয়া হয়েছে ঘর ভাড়া দিয়েই তা শেষ হয়ে গেছে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় শ্রমিকরা রাস্তায় নামলে তখন নেতারাও কন্ট্রোল করতে পারবে না আর নেতাদের দোষারোপ করেও লাভ হবে না। এছাড়া আগের বৈঠকে শ্রমিক ছাঁটাই হবে না বলে মালিকরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা পালন করা হচ্ছে না। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শ্রমিকদের অনৈতিক ছাঁটাই করা হচ্ছে।
গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি লীমা ফেরদৌস বলেন, মালিকরা শ্রমিক ছাঁটাই করবে না অঙ্গীকার করলেও মাঠে বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিনিয়ত শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য কারখানাগুলো কিছুটা নিয়ম মেনে বেতন দিলেও এর বাইরে সোয়েটার ও সাব-কন্ট্রাকে কাজ করা কারখানাগুলো কোনো আইনের তোয়াক্কা করছে না। নিজেদের নিয়মমতো এক-দেড় হাজার টাকা বেতন দিচ্ছে। এ ধরনের কারখানা শ্রমিকদের বেতন নিশ্চিত করতে শ্রম প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে আলাদা কমিটি গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
শ্রমিক নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ বলেন, নারায়ণগঞ্জের বিসিকে শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে, বেতনও দেওয়া হচ্ছে না। মালিকরা বেতন দেবেন দেবেন বলেও দিচ্ছেন না। শ্রমিকরা মানবেতন জীবনযাপন করছে।
শ্রমিক নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, মে মাসের বেতন কোনোভাবেই ঈদের আগে দেওয়া সম্ভব নয়। এখনো এপ্রিল মাসের বেতন ব্যাংকগুলো শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে দিতে পারেনি। তাছাড়া বেতন শিট করাও হয়নি। আর ব্যাংকও টাকা দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া শ্রম আইনে বলা আছে, মাস শেষ হওয়ার সাত কর্মদিবসের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে। সে হিসাবে জুনের ১০ তারিখের মধ্যে বেতন দেওয়া হবে।
বেতনের বিষয়ে শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, এখন মানুষ বাঁচার চেষ্টা করছে। সব পক্ষকেই বৈশ্বিক বাস্তবতা বুঝতে হবে। সরকার-শ্রমিকদের চাপে পড়ে কাপড় ও মেশিন বিক্রি করে আগে মালিকরা ঈদ বোনাস দিয়েছে। এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কেউ কাপড় ও মেশিনও কিনবে না। কারখানা ভাঙচুর করেও লাভ হবে না। বিশ্ব বাজারে কাপড়ের চাহিদা না বাড়লে এবং নতুন অর্ডার না এলে অবস্থা সামনের দিকে আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি প্রস্তাব দিয়ে বলেন, এ দুঃসময়েও মালিকরা শ্রমিকদের বোনাস দিতে চায়। সেটা আগেরবারের ২৫-৫০ শতাংশ।
তবে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে, অন্যসব শিল্প শ্রমিকদের শতভাগ বোনাস দিতে পারলে কেন গার্মেন্টস দিতে পারবে না। ঈদের আগেই শ্রম আইন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ বোনাস দিতে হবে। যেসব শ্রমিক এক বছরের বেশি সময় কর্মরত আছে তাদের মূল বেতনের শতভাগ এবং এক বছরের সময় কর্মরতদের ৫০ ভাগ বোনাস হিসেবে দিতে হবে।
বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ১ হাজার ৬১৫টি কারখানা ৫ হাজার কোটি টাকা তহবিল থেকে ঋণের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু গতকাল (বুধবার) পর্যন্ত ৫৩৬টি কারখানা ঋণের টাকা পায়নি। এ অবস্থায় অনেক মালিক শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের বেতন দিতে পারছে না। অনেক কারখানায় শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করছে, সেটা যৌক্তিক। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সবাইকে অনুধাবন করতে হবে। মালিকদের অবস্থাও শোচনীয়।
সাড়ে ৫ ঘণ্টা আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মালিক-শ্রমিকপক্ষ দুটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে। এগুলো হচ্ছে এবার ঈদের ছুটি দেওয়া হবে তিন দিন। আর মে মাসের বেতন দেওয়া হবে জুন মাসে। তবে বোনাসের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি কোনোপক্ষই। এ নিয়ে আগামী সপ্তাহে আবারও বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান শ্রম প্রতিমন্ত্রী।