মুমিনের পরশপাথর লাইলাতুল কদর

আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব করে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তার প্রতিনিধি হিসেবে। মানুষ এক আল্লাহর জয়গান করবে, তিনি যা করতে বলেছেন, তাই করবে। যা করতে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকবে। পৃথিবীতে আরও যত প্রাণী ও সৃষ্টি আছে, তাদের সবাইকে নিয়ে শান্তি-শৃঙ্খলার সঙ্গে বসবাস করবে। কোথাও কলহ বাঁধাবে না, করবে না খুনোখুনি রক্তপাত। পৃথিবীর ইথারে ইথারে ছড়িয়ে দেবে আল্লাহর একাত্মবাদ। পৃথিবীতে মানুষ এই ইবাদতের চাষাবাদ করে, আল্লাহর রাজি-খুশি নিয়ে ফিরে যাবে আপনালয় জান্নাতে। এটিই মানুষ সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য; মানুষও আল্লাহর কাছে সেই ওয়াদা করেই এসেছিল।

কিন্তু পৃথিবীতে আসার পর শয়তান মানুষকে সে ওয়াদার কথা ভুলিয়ে দেয়। মানুষের চোখে পরিয়ে দেয় প্রবঞ্চনার চশমা। তখন মানুষের চোখে পাপাচার হয়ে উঠে রঙিন প্রজাপতি। সেই প্রজাপতির পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ গিয়ে পড়ে জাহান্নামের গর্তে। কিন্তু আল্লাহ যে চান না তার একটি বান্দাও জাহান্নামের আগুনে জ¦লুক। কেনইবা চাইবেন? তিনি যে মানুষকে বড় ভালোবেসেন, সর্বোত্তম আকৃতিতে তাকে সৃষ্টি করেছেন। চাঁদের চেয়ে অধিক সৌন্দর্যে, ফুলের চেয়েও অধিক শোভায় যে মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন, সেই মানুষ জাহান্নামের আগুনে জ¦লবে তা কি তিনি চাইতে পারেন? না, তিনি কখনোই এমনটি চান না। তিনি যে অসীম দয়াবান। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ তার দয়াকে একশ ভাগ করে নিরানব্বই ভাগ নিজের কাছে রেখেছেন এবং একভাগ দয়া পৃথিবীর সব সৃষ্টির মধ্যে ছিটিয়ে দিয়েছেন।’ (মুসলিম : ৬৭১৯)

ভাবুন! এক ভাগ দয়ার যৎসামান্য পেয়ে একজন মা যদি তার সন্তানের সামান্য কষ্ট সহ্য করতে না পারেন, তাহলে দয়ার সাগর আল্লাহ কীভাবে নিরানব্বনই ভাগ দয়া নিয়ে তার বান্দাদের জাহান্নামে পতিত হওয়া সহ্য করবেন? তার বান্দাদের যেন জাহান্নামের আগুনে জ¦লতে না হয়, সেজন্য তিনি এমন কিছু বিশেষ সময় বরাদ্দ করেছেন, সেই বিশেষ সময়ে গুনাহগার বান্দারা আল্লাহর আরাধনা করে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাদের ক্ষমা করে দেন। লাইলাতুল কদর তেমনই একটি রাত। যে রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব তুলে ধরে আল্লাহতায়ালা তার নবীকে বলেন, ‘লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আপনি জানেন? লাইলাতুল কদর হলো এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা কদর, আয়াত : ২-৩)

এ রাতে অঝোরধারায় বর্ষিত হয় আল্লাহর অপার করুণা। শান্তির পতাকাবাহী অগণন ফেরেশতা পৃথিবীতে নেমে আসেন রহমতের পেয়ালা নিয়ে। বিজয়ের উল্লাসে তখন দুলে উঠে প্রকৃতি। কবি লিখে যান কবিতা-গান

‘মাহে রমজান এসেছে যখন আসিবে শবেকদর

নামিবে রহমত এই ধূলির দরার পর।’

লাইলাতুল কদর এমনই একটি রাত, যে রাতে আল্লাহতায়ালা মোহাম্মদ (সা.)-এর ওপর পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন। সেই কোরআনেরই একটি সুরার নাম; সুরা কদর। তাফসিরের কিতাবে এ সুরার পটভূমিকায় বলা হয়েছে, একবার মহানবী মোহাম্মদ (সা.) কয়েকজন সাহাবিদের কাছে বনি ইসরাইলের কতিপয় লোক সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন যে, তারা দীর্ঘ হায়াত লাভ করার কারণে অধিক ইবাদত করেছেন। দীর্ঘ এ হায়াতে আল্লাহ নাখোশ হন, এমন একটি কাজও করেননি। নবীজি (সা.)-এর পবিত্র জবান থেকে এ কথা শোনার পর উপস্থিত সাহাবিরা এই বলে আফসোস করেন, আমরাও যদি তাদের মতো দীর্ঘ হায়াত পেতাম, তাহলে ইবাদত-বন্দেগিতে তাদের সঙ্গে এগিয়ে থাকতাম। সাহাবিদের এই আফসোস লাঘবের জন্যই আল্লাহতায়ালা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে খুশির সংবাদ দিয়ে সুরা কদর নাজিল করেন। সেই খুশির সংবাদটি হলো, ‘লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর’, অর্থাৎ হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এ রাত।

কদরের বাংলা অর্থ হচ্ছে সম্মান, মর্যাদা। আর লাইলাতুল কদরের অর্থ হচ্ছে মর্যাদার রাত। এই রাতে আল্লাহর যে বান্দা-বান্দিরা ইবাদত-বন্দেগি করবেন, আল্লাহ তাদেরই ওই হাজার মাসের চেয়েও বেশি ইবাদতের সওয়াব দেবেন। হাদিসে আরও বলা হয়েছে, ‘যদি তোমরা কবরকে আলোকময় পেতে চাও, তাহলে লাইলাতুল কদরে জাগ্রত থাক।’ অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেউ ইমানের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে লাইলাতুল কদর ইবাদতের মাধ্যমে কাটায়, তাহলে তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে।’ (বোখারি, হাদিস : ৬৭২)

পাপাচারের বিষবাষ্পে মানুষ যখন কলবকে পুুড়িয়ে ছাই করে দেয়, তখন সেই পুড়ে যাওয়া কলবকে সোনার কলবে পরিণত করতে আল্লাহতায়ালা লাইলাতুল কদরকে পরশপাথর করে পাঠান। পথভোলা আমরা নিজেদের বাড়ি জান্নাতে ফিরতে চাইলে অবশ্যই এই পরশপাথর তথা লাইলাতুল কদরকে খুঁজতে হবে। লাইলাতুল কদর পাওয়ার যে কয়েকটি আলামত নবীজি (সা.) বলে গেছেন; এর মধ্যে একটি হচ্ছে রমজানের সাতাশতম রাত। আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কদরের রাত অর্জন করতে ইচ্ছুক, সে যেন তা রমজানের সাতাশতম রাতে অনুসন্ধান করে।’ (মুসলিম)

তবে শুধু সাতাশতম রাতেই যে লাইলাতুল কদর হবে, নবীজি এমন নিশ্চয়তা দেননি। বেশির ভাগ হাদিসে রমজানের শেষ দশ রাতের যেকোনো এক বেজোড় রাতেই কদর হয়ে থাকে বলা হয়েছে। উবায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো।’ (বোখারি, হাদিস : ১০১৭)

আল্লাহ আমাদের ভালোবেসে এই লাইলাতুল কদর দান করেছেন। নবীজি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর পেল, কিন্তু ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে কাটাতে পারল না, তার মতো হতভাগা পৃথিবীতে আর কেউ নেই।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬৭)

তাই আসুন! মহামারীর এই ক্রান্তিকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাহায্যপ্রাপ্তির লক্ষ্যে লাইলাতুল কদরকে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করি। নিজের জন্য, পরিবারের, দেশের জন্য তথা সমগ্র মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে আসমানি সাহায্য চেয়ে মোনাজাত করি।