কোনোভাবেই যেন দমছে না ঘরমুখো মানুষ। সড়ক-মহাসড়কে চেকপোস্ট, তারপরও ছুটছে তারা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ, প্রাইভেট কার, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে করে ঈদ উপলক্ষে বাড়ি যাচ্ছে শত শত মানুষ। হেঁটে রাজধানীর পাশের জেলা মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও নরসিংদীতে যাচ্ছে মানুষ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বাস, লঞ্চ, রেলসহ সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ। মানুষকে বাসা-বাড়িতে রাখতে প্রাইভেট কারসহ অন্যান্য গাড়িতেও জনসাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এরপরও মানুষ ছুটছে। তবে কোথাও কোথাও পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে মানুষ গন্তব্যে যাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। আবার কেউ কেউ অ্যাম্বুলেন্সে রোগী সেজে পুলিশের চেকপোস্ট অতিক্রম করছে বলে জানা গেছে। এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, মুভমেন্ট পাস ছাড়া কেউ ঢাকার বাইরে আসা-যাওয়া করতে পারবে না। ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। চূড়ান্ত করতে কিছুদিন সময় লাগবে।
এ প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মল্লিক ফখরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাইওয়ে ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। জরুরি পরিষেবা ছাড়া কাউকে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এরপরও কিছু মানুষ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিকল্প পথে নিজ নিজ গন্তব্যে যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঢাকার বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আবার ঢাকায়ও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। অনেকে কৌশলে ঢাকার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পুলিশের চেকপোস্টগুলোতে যানবাহন আটকে ব্যাপকহারে তল্লাশি করা হচ্ছে। কেউ মিথ্যার আশ্রয় নিলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। পুলিশকে সবাই সহযোগিতা করুন। তিনি আরও বলেন, মাওয়া ও পাটুরিয়া ফেরিঘাটেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে যাওয়ার প্রতিটি প্রবেশমুখে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ৮টি, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ৭টি, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে ৫টি, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বেশ কিছু পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করছে। যারা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৩ যাত্রী নিহত হয়েছে। যারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, নিহতরা সবাই ঈদ উপলক্ষে ঢাকা থেকে রংপুরে ফিরছিলেন। তারা নানা কৌশলে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে রডবোঝাই ট্রাকে করে গাইবান্ধা যান। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দায়িত্বরত হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় লোকজন পণ্যবাহী ট্রাক, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে নিজ গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পণ্যবাহী ট্রাক ও প্রাইভেট কার থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে তারা যেখান থেকে এসেছেন, সেখানে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। কিছু গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দেওয়াসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিছু মানুষ ঢাকা থেকে হেঁটে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে। তাদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ ও শ্রমিক। তাদের কাউকে কাউকে পুলিশ মানবিক কারণে হয়তো ফেরত পাঠাচ্ছে না। তারপরও কঠোরভাবে প্রতিহত করা হচ্ছে। আবার আমরা বেশ কিছু অভিযোগ পাচ্ছি, কিছু এলাকায় পুলিশকে ম্যানেজ করে নির্দিষ্ট স্থানে চলে যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সে রোগী বানিয়ে যাত্রী আনা-নেওয়া চলছে। এসব ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কঠোর বার্তা পাঠানো হয়েছে।
এদিকে দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের চাপে গতকাল কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌপথে যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে। ঝুঁকি নিয়ে মানুষ নদী পার হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে ঘাটে মাত্র ১টি ফেরি চলছিল। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সেটিও দীর্ঘ সময় বন্ধ। ফেরিতে পার হতে না পেরে বিকল্প পথে যাত্রীরা নদী পার হচ্ছে। উত্তাল পদ্মায় অনিরাপদ নৌযানে করে তারা বাড়ি ফিরছে। মাওয়া থেকে বিকল্প নৌপথ দিয়ে শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে দূরে চরে গিয়ে নামছে যাত্রীরা। কাঁঠালবাড়ী ঘাট নৌপুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল হান্নান বলেন, ‘ফেরি চলাচল বন্ধ। তারপরও শিমুলিয়া থেকে ট্রলারে করে কিছু যাত্রী কাঁঠালবাড়ী এলাকায় এসে নামছে। আমরা বেশ কিছু ট্রলার আটক করেছি। মাঝ পদ্মা থেকেও কিছু ট্রলার ফিরিয়ে দিচ্ছি। যাত্রীদের সচেতন ও সতর্ক করছি। পুলিশের টহল নৌযান না থাকায় তারা যাত্রীদের ফেরাতে ঝামেলা পোহাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকার বাইরে আসার সময় পুলিশকে টাকা দিতে হচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রাক বা অন্য যানবাহনগুলো থেকে কৌশলে পুলিশ টাকা আদায় করছে।
বিআইডব্লিউটিসির কাঁঠালবাড়ী ঘাট ম্যানেজার আবদুল হালিম সাংবাদিকদের জানান, গত মঙ্গলবার থেকেই ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বুধবার সকালে একটি ফেরিতে সেনাবাহিনী ও কয়েকটি জরুরি অ্যাম্বুলেন্স পার করা হয়েছে। ফেরি বন্ধ রয়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটেও। সেখানেও ফেরি না পেয়ে ট্রলারে ঝুঁকি নিয়ে লোকজন পদ্মা পার হচ্ছে। নৌপুলিশ ও থানা পুলিশকে তাদের ফেরত পাঠাতে দেখা গেছে।
স্থানীয় থানা ও হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, গজারিয়া থানা পুলিশ, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ, কুমিল্লা জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়েছে। মেঘনা ব্রিজের টোলপ্লাজা থেকে বহু গাড়ি ঢাকায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহন করায় কয়েকটি যানবাহনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ধলেশ^রী ব্রিজের টোলপ্লাজায় (কুঁচিয়া মোড়া ব্রিজ) চেকপোস্ট বসিয়ে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ, হাঁসাড়া হাইওয়ে পুলিশ বহু গাড়ি ঢাকায় ফেরত পাঠায়।
মুভমেন্ট পাস পেতে কিছুদিন সময় লাগবে : করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে যাদের একান্তই বাইরে যাওয়া প্রয়োজন, তাদের জন্য মুভমেন্ট পাসের ব্যবস্থা করছে পুলিশ। তবে এই পাস দিতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মুভমেন্ট পাস এখনো প্রক্রিয়াধীন এবং পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে। আমরা এটি বিভিন্ন ইউনিটে পুলিশ সদস্যদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছি। আমরা এটি আরও উন্নত করতে কাজ করছি। এটি সম্পন্ন হলে আমরা শিগগিরই চালু করব।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশ সদর দপ্তরের আইসিটি বিভাগ মুভমেন্ট পাস তৈরির একটি প্রক্রিয়া শুরু করে। আমরা মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে তাদের মতামত নেওয়ার জন্য এই পাস ইস্যুর প্রক্রিয়ার লিংকটি পাঠাই। কিন্তু কিছু কর্মকর্তা বিষয়টি না বুঝে ফেইসবুকে অ্যাপের প্রচারণা শুরু করেন। বর্তমানে অ্যাপের অ্যাকশন বাটনটি ডিজয়েবল্ড (নিষ্ক্রিয়) করা হয়েছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে এই কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের আইসিটি উইংয়ের সমন্বয়ে শুরু হতে যাওয়া এই কার্যক্রমে জরুরি পণ্য পরিবহন, সেবাদানসহ ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের যাচাই-বাছাই করে দেওয়া হবে এই পাস।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মুদি দোকানে কেনাকাটা, কাঁচাবাজার, ওষুধপত্র, চিকিৎসা, চাকরি, কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ, ত্রাণ বিতরণ, পাইকারি বা খুচরা ক্রয়, পর্যটন, লাশ দাফন, ব্যবসা ও অন্যান্য ক্যাটাগরিতে দেওয়া হবে এই পাস। যাদের বাইরে চলাফেরা প্রয়োজন কিন্তু কোনো ক্যাটাগরিতেই পড়েন না, তাদের ‘অন্যান্য’ ক্যাটাগরিতে পাস দেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করা হবে। পাস সংগ্রহের জন্য ওয়েবসাইটে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন সনদ, স্টুডেন্ট আইডি ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে। সড়কে কোথাও চলাচলের কারণে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হলে এই পাস দেখালেই তার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে যেতে দেওয়া হবে।