করোনাভাইরাসজনিত কভিড-১৯ রোগের মহামারীর মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে ঈদ করতে ছুটছে অনেক মানুষ। এর মধ্যে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচলের সুযোগ মেলায় কিছু মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করলেও বেশিরভাগই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সামর্থ্যবানরা বাড়তি টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিচ্ছেন। যাদের এমন সামর্থ্য নেই তারা ক্ষোভ জানিয়েছেন। আর করোনা-পরিস্থিতিতে এমন চলাচলে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন অনেকে।
গতকাল শুক্রবার র্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, সবাই ঘরে থাকুন। পরিবারের কথা চিন্তা করে সবাইকে ঘরে থাকতে হবে। কোনো ঘোরাফেরা করা যাবে না। তবে যারা বাড়িতে যাচ্ছেন তারা সাবধানে থাকবেন। দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন। একই কথা বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা আক্তার। তিনি বলেন, শহর ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার কারণে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যেতে পারে। এজন্য কেউ শহর ছেড়ে না যাওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা পাওয়ার পর মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সড়ক-মহাসড়ক থেকে তল্লাশি চৌকিগুলো তুলে নেয়। শুধু গণপরিবহন ও পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী পরিবহনে বাধা দেয় পুলিশ। পুলিশের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর গতকাল বিপুলসংখ্যক মানুষ ব্যক্তিগত গাড়িতে, মোটরসাইকেলে করে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে ফেরিঘাটগুলোও।
এদিকে ব্যক্তিগত গাড়িতে গ্রামে যেতে দেওয়ার ঘোষণায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বেশিরভাগ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করলেও অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতেই বাড়ি ফেরার পথে পুলিশি বাধা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সরকার ঘরমুখো মানুষকে বাড়ি যেতে বাধা না দিয়ে নিরাপত্তা দিতে পুলিশ সদর দপ্তরকে এ নির্দেশ দিয়েছে। সায়েদাবাদ এলাকায় দেখা গেছে, বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার পরিবহন ছাড়ছে না। তবে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে অনেকেই টার্মিনালের আশপাশে এসে অবস্থান নিয়েছেন। অনেকেই মাইক্রোবাস ভাড়া করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। আবার একটি অংশ নিজস্ব গাড়ি নিয়ে ঢাকা থেকে বাড়ি যাচ্ছেন। তবে বড় একটি অংশ ভাড়া করা গাড়িতে করেই ঢাকা ছাড়ছেন। যাত্রাবাড়ী থেকে প্রাইভেট কার ভাড়া করেন মোজাম্মেল হক। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঈদ করতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। আমরা তিনজন মিলে ১৫ হাজার টাকায় মাইক্রোবাসটি ভাড়া করেছি। টাকা একটু বেশি খরচ হচ্ছে, তারপরও পরিবারের সবার সঙ্গে ঈদ করতে পারব এটাই বড় কথা। ঢাকায় অনেক দিন ধরেই বন্দিজীবন কাটাচ্ছি। কতদিন হয়ে গেছে বাবা-মা, ভাই-বোনের মুখ দেখতে পাই না। সবাই পথের দিকে চেয়ে আছে, কবে বাড়ি যাব।’ করোনার ভয় করছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভয় তো করছেই। তারপরও এভাবে আর কতদিন থাকা যায়? তাই আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বাবা-মায়ের কাছে যাচ্ছি।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার অনেককে দেখা গেছে কিছুটা পথ হেঁটে এবং কিছুটা পথ ছোট ছোট পরিবহনে করে রাজধানী ছেড়ে গ্রামের পথে ছুটেছেন অসংখ্য মানুষ। সড়কপথে পুলিশি বাধা কাটলেও খুব একটা ভিড় দেখা যায়নি। শিমুলিয়া, মাওয়া ও পাটুরিয়া ফেরিঘাটে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। ওইসব স্থানে পা রাখার জায়গা নেই। নিষেধাজ্ঞা ওঠার পর গতকাল সকাল থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে করেও কিছুসংখ্যক মানুষ রাজধানী ছেড়ে গেছেন। কিছু প্রাইভেটকার ঢাকা ছেড়েছে। তবে হেঁটে বা ভেঙে ভেঙে রাজধানী ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা অনেক।
দারুস সালাম থানার ওসি তোফায়েল আহমেদ বলেন, গাবতলী পয়েন্টে গাড়ির ফ্লো কম। দুয়েকটা করে গাড়ি ঢাকা ছাড়ছে। হেঁটেও মানুষজনকে ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে। তাদের সংখ্যাই বেশি।
এর আগে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে ঈদে যাতে নিজ অবস্থান ছেড়ে কেউ গ্রামের বাড়ি না যেতে পারেন, সে ব্যাপারে বিভিন্ন জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলামও জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যাতে কেউ ঢাকায় ঢুকতে কিংবা বের হতে না পারে, সে ব্যাপারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তল্লাশি চৌকি (চেকপোস্ট) জোরদার করার নির্দেশ দেন।
গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকারের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যারা ঈদে বাড়িতে যেতে চান, পুলিশ যেন তাদের চলাচলে বাধা না দেয়। তারা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন। তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকবে।
ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. ওয়ালিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যারা বাড়ি যেতে চান, তারা বাড়ি যেতে পারবেন। তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা জানান, গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহার করে বাড়ি ফেরা যাবে। পুলিশ সদস্যরা রাস্তায় থাকবেন। কেউ যেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি না ফেরেন, তা নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।