ঢাকা থেকে ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফেরার পথে মারা যাওয়া এক তরুণী পোশাকশ্রমিকের মরদেহ দাফন নিয়ে তুলকালাম হয়েছে লালমনিরহাটে। করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে সন্দেহে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মৌসুমী আক্তার (২২) নামে ওই তরুণীর মরদেহ এলাকায় এনে দাফনে বাধা দেন। এ পরিস্থিতিতে মেয়ের মরদেহ দাফনে এক অ্যাম্বুলেন্সচালকের সঙ্গে ৫ হাজার টাকায় চুক্তি করেন বাবা গোলাম মোস্তফা। সে জন্য চুক্তির টাকাও পরিশোধ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ওই অ্যাম্বুলেন্সচালক মৌসুমীর মরদেহ দাফন না করেই ফেলে দেয় তিস্তা নদীতে। এর দুই দিন পর ওই মরদেহ তিস্তার পানিতে ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয়রা। পরে আদিতমারী থানা পুলিশ মৌসুমীর মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর প্রথমে এবারও বাবা গোলাম মোস্তফার কাঁধে চাপে লাশ দাফনের দায়িত্ব। কিন্তু পুরো ঘটনা জানতে পেরে পুলিশই দায়িত্ব নেয় লাশ দাফনের। আদিতমারী থানা পুলিশ গত রবিবার সন্ধ্যায় উপজেলার গোবর্ধন এলাকায় তিস্তা নদী থেকে মৌসুমীর মরদেহ উদ্ধার করে। পরদিন সোমবার বিকেলে জানাজা শেষে নিজ গ্রামে তাকে যৌথভাবে দাফন করে আদিতমারী ও পাটগ্রাম থানা পুলিশ।
মারা যাওয়া পোশাকশ্রমিক মৌসুমী আক্তার লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারী ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা গোলাম মোস্তফার মেয়ে। তিনি একই উপজেলার বাউড়া ইউনিয়নের সরকারেরহাট এলাকার মিজানুর রহমানের স্ত্রী।
পুলিশ ও মৌসুমীর স্বজনরা জানান, সরকারেরহাট এলাকার আবুল কালামের ছেলে মিজানুর রহমানের সঙ্গে ছয় মাস আগে বিয়ে হয় মৌসুমীর। বিয়ের পরপরই স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ নেন মৌসুমী। সেখানে অসুস্থ অনুভব করলে ২১ মে একটি ট্রাকে চড়ে পাটগ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। ট্রাকটি ২২ মে রংপুরের তাজহাট এলাকায় পৌঁছালে চালক আজিজুল ও হেলপার রতন মৌসুমীকে মৃত অবস্থায় কেবিনে পড়ে থাকতে দেখেন। তারা মরদেহ রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যান। অজ্ঞাত মরদেহ হিসেবে তাজহাট থানা পুলিশ মৌসুমীর মরদেহ উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। অবশ্য ট্রাকের চালক ও হেলপার পালিয়ে গেলেও মৌসুমীর বাবার সঙ্গে পরে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানায়। এরপর মৌসুমীর বাবা গোলাম মোস্তফা তাজহাট থানায় গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন। ২৩ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে মেয়ের মরদেহ বুঝে নেন তিনি। পরে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাতকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানিয়ে নিজ এলাকায় মেয়ের মরদেহ দাফনের অনুমতি চান গোলাম মোস্তফা। কিন্তু করোনা আক্রান্ত হয়ে মৌসুমীর মৃত্যু হয়েছে এমন সন্দেহ থেকে চেয়ারম্যান মরদেহ এলাকায় আনতে নিষেধ করেন। এমনকি চেয়ারম্যান মরদেহ এলাকায় আনলে তার পরিবারের সদস্যদের ও মরদেহবাহী গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন গোলাম মোস্তফা। নিরুপায় হয়ে মেয়ের মরদেহ দাফন করতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার লাশবাহী একটি অ্যাম্বুলেন্সের চালকের সঙ্গে ৫ হাজার টাকায় চুক্তি করেন তিনি। ওই চালক মৌসুমীর মরদেহ দাফনের আশ^াস দিয়ে গোলাম মোস্তফাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে মরদেহটি তিস্তা নদীতে ফেলে দেন। এর দুই দিন পর স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে গত রবিবার সন্ধ্যায় মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন গ্রামে তিস্তা নদী থেকে সরকারি ব্যাগে মোড়ানো মৌসুমীর মরদেহ উদ্ধার করে আদিতমারী থানা পুলিশ। এরপর সোমবার ঈদের নামাজ শেষে আদিতমারী থানা পুলিশ অজ্ঞাত মরদেহ হিসেবে জানাজা শেষে আদিতমারী কেন্দ্রীয় কবরস্থানে মৌসুমীকে দাফনের প্রস্তুতি নেয়। ঠিক সেই মুহূর্তে খবর পেয়ে মেয়ের পরিচয় শনাক্ত করেন গোলাম মোস্তফা। এরপর লালমনিরহাটের পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় আদিতমারী থানা পুলিশ পাটগ্রাম থানা পুলিশের সহায়তায় পাটগ্রামে নিজ গ্রামে ওই দিন বিকেলে মৌসুমীকে দাফন করে।
মৌসুমীর বাবা গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাতে-পায়ে ধরতে চেয়েও লাশ গ্রামে নিতে দেয়নি চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাত। বাধ্য হয়ে একজন ড্রাইভারকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছি লাশ দাফন করতে। তারাও দাফন না করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। অবশেষে আবারও মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করতে হলো আদিতমারী থানায়। আমার মেয়ের মরদেহ নিয়ে যারা ব্যবসা করেছে, তাদের বিচার দাবি করছি।’
তবে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাত গত বুধ ও বৃহস্পতিবার পরপর দুদিন সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, মৌসুমীর মরদেহ গ্রামে এনে দাফন করতে তিনি নিষেধ করেননি। লাশ দাফনে তিনি সহায়তা করতে চেয়েছিলেন।
আদিতমারী থানার ওসি সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও দুঃখজনক। সরকারি ব্যাগে মোড়ানো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় একটি ইউডি মামলা করা হয়েছে। মৃতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তার বাবার আকুতি জেনে পুলিশ সুপারের নির্দেশে দুই থানা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে মরদেহ তার গ্রামে দাফন করা হয়েছে।’
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর দেখে ঘটনা তদন্তে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’
অন্যদিকে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আদিতমারী থানায় একটি জিডি করা হয়েছিল। সেটি নিয়ে পুলিশ তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোনের কল লিস্ট যাচাই করে দেখা হচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই ঘটনার জন্য যারা দায়ী তাদের খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।’
এদিকে গত মঙ্গলবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবের রিপোর্টে বলা হয়, পোশাককর্মী মৌসুমী করোনা সংক্রমিত ছিলেন না। লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার এ তথ্য জানিয়েছেন।