ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। বাড়ি যশোরের চৌগাছার নারায়ণপুর ইউনিয়নের পেটভরা গ্রামে। থাকতেন রাজধানীর আজিমপুরের একটি মেসে। গত ২০ মার্চ থেকে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় অবস্থান করছেন বাড়িতে। দীর্ঘদিন মেসে না থাকলেও মাস শেষে ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন বাসার মালিক। তিনি জানান, টিউশনির টাকায় চলত পড়াশোনা ও মেস খরচ। এখন টিউশনির আয় নেই। এদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে বাড়িতে থাকার কুঁড়েঘরের ছাউনি গেছে উড়ে। ঈদ কেটেছে খোলা আকাশের নিচে। আর এরই মধ্যে মেসমালিক মোবাইলে কল করে ভাড়া পরিশোধের তাগাদা দিচ্ছেন। বলেছেন, বকেয়া সব টাকা পরিশোধ না করলে মেসের কক্ষের দরজায় তালা ঝোলাবেন। শুধু সাঈদ নন, একই অবস্থা রাজধানী ঢাকার শত শত মেসের বাসিন্দা লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর। তারা বলছেন, করোনাকালে প্রশাসন তথা সিটি করপোরেশনের নীরবতা আর সুনির্দিষ্ট নিয়ম না থাকার সুযোগে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছেন মেসমালিকরা। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের মেস ভাড়া কমাতে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্র্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলেও ঢাকায় এখনো তা করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে মেস ভাড়া সহনীয় করতে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশ চান ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয় খালিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় দুই বছরে হলে সিট মেলেনি। বাধ্য হয়ে মেসে থাকি। স্কলারশিপেই চলে পড়াশোনার খরচ। তা-ও এখন ওঠানো অসম্ভব। দীর্ঘদিন আছি বাড়িতে। দিনমজুর বাবার পক্ষে দুবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। মেস ভাড়া না দিলে মালিক বাসা ছেড়ে দিতে বলছেন। বই-খাতাসহ সবকিছু মেসে। টাকা দিতে না পারলে সেগুলো আটকে দেবেন বলে জানিয়েছেন।’
কেবল আবু সাঈদ বা খালিদই নন, তাদের মতো লক্ষাধিক শিক্ষার্থী এখন একই সমস্যায় ভুগছেন। কীভাবে মেস ভাড়া দেবেন তা বুঝতে পারছেন না। এ অবস্থায় বাড়ির মালিকদের কাছে ভাড়া মওকুফ বা কমিয়ে দেওয়ার দাবি তাদের।
কয়েকজন বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নজরুল ইসলাম নামে এক বাড়িওয়ালা বলেছেন, বাড়ি ভাড়ার ওপর নির্ভর করে সংসারের খরচ। রয়েছে বাড়ির ওপর ব্যাংক ঋণ। ভাড়ার টাকায় হয় কিস্তি পরিশোধ। যদিও তাদের দাবি, সিটি করপোরেশনের কাছে বাড়ির মালিকদের তথ্য থাকে। যেসব বাড়ির মালিকের ব্যাংক ঋণ আছে, তাদের হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাড়ির মালিকরা মেসে থাকা শিক্ষার্থীসহ সব ভাড়াটের ভাড়া কমিয়ে নিতে পারবেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ড (নীলক্ষেত আবাসিক এলাকা) কাউন্সিলর মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবস্থানগত কারণে আমার ওয়ার্ডে ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, বুয়েট ও ঢাকা কলেজর বহু শিক্ষার্থী থাকেন। আমার জানামতে এখন পর্যন্ত কোনো বাড়িওয়ালা ভাড়াটেদের চাপ দেননি। কোনো ভাড়াটেও অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে আসেননি। যদি কোনো ভাড়াটে ভাড়া মওকুফের দাবি নিয়ে আমার কাছে আসেন, তখন আমি বাড়ির মালিককে ভাড়া কমিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করব। যদিও সিটি করপোরেশন থেকে এ সময়ে শিক্ষার্থীদের মেস ভাড়া নির্ধারণ করে দিলেই সমস্যা অনেকাংশেই সমাধান হবে।’
শিক্ষার্থীদের সার্বিক সমস্যা নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের এ সময়ে সবাই কমবেশি সমস্যায় আছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার্থীদের খরচ সরকারিভাবে বহন করা হয়। শিক্ষার্থীদের সব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নজর রাখবে।’
করোনার থাবায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন অনাবাসিক জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। একদিকে টিউশনি বন্ধ, অন্যদিকে মেস মালিকদের ভাড়ার জন্য চাপাচাপিতে বিপাকে তারা। ইতিমধ্যে জবি শিক্ষার্থীরা বাড়ি ভাড়া মওকুফের জন্য ফেইসবুক গ্রুপ খুলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন।
শিক্ষার্থীদের বাড়ি ভাড়াসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে জবি উপাচার্য ড. মীজানুর রহমানের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যক্তিমালিকানায় থাকা মেস মালিকদের আমরা অনুরোধ করতে পারি যে যারা দরিদ্র, তাদের ভাড়াটা মওকুফ করেন। কিন্তু সরকার নিষেধ করতে পারে, আমরা পারি না। আর মেসে এখন কেউ নাইও। মেস ভাড়া দিতে প্রশাসন থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এরপরও কোনো মেস মালিক ভাড়া চাইলে আমাদের জানাবে। আমরা পুলিশ দিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
জবি উপাচার্য আরও বলেন, ‘এখন মেসভাড়া সমস্যা না, আমি মনে করি, বেঁচে থাকাটাই আসল সমস্যা। যারা খাবার পাচ্ছে না বা আর্থিক সমস্যায় আছে, এ রকম শতাধিক শিক্ষার্থীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে হেল্প করেছি।’
করোনাভাইরাসের কারণে দেশব্যাপী সৃষ্ট সংকটে ঢাকা কলেজ অধ্যক্ষ নেহাল আহমেদ মেস মালিকদের প্রতি ভাড়া মওকুফের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থ সংকটের দরুন রাজধানীর সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাসা বা মেসগুলোর ভাড়া সহনীয় মাত্রায় নিতে হবে।’
শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কথা হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি এই প্রতিবেদককে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের ভাড়া কমানোসংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো সিটি করপোরেশন নেয়নি। তবে আমি মনে করি ভাড়াটে ও বাড়িওয়ালাদের উইনিং সিসুয়েশনে আসতে হবে।’