এক বলে অমরত্ব পাওয়া বোলার একজনই। উইলিয়াম এরিক হোলিস। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানকে যিনি শেষ টেস্টে শূন্য রানে বোল্ড করেছিলেন। যে আউটে বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানের গড় ১০০ হতে পারেনি।
ক্রিকেট বিশ্বকে আক্ষেপে পোড়ানো বোলার হোলিস আসলে কেমন ক্রিকেটার ছিলেন। এর উত্তর পরিসংখ্যান দেবে কি না জানা নেই, তবে আগ্রহ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। ১৯১২’র এই দিনে স্ট্যাফোর্ডশায়ারের জন্ম নেওয়া হোলিস সারা জীবন কাউন্টি খেলেছেন ওয়ারউইকশায়ারে। ৫১৫ ম্যাচে ২৩২৩ উইকেট নিয়েছেন। গড় ২০.৯৪। ইনিংসে উইকেট নিয়েছেন ১৮২ বার। ৪০ বার পেয়েছেন ম্যাচে দশ উইকেট।
এমন বোলার শুধু ডনকে শূন্যতে বোল্ড করার জন্যই আলোচিত হন, কেমন লাগে? নিশ্চয় খারাপ লাগার কথা। ১৩ টেস্টে ৫৫ উইকেটও নয়, বহির্বিশ্ব তাকে চেনে ব্র্যাডম্যান সংহারক বলে। হোলিস নিজে অবশ্য এই পরিচিতিকে বেশি পাত্তা দিতেন না। বলতেন, ‘ডনের উইকেটটা নিছকই একটা মূল্যবান উইকেট ছিল। সারা জীবনে আমি দুই হাজারের ওপর উইকেট নিয়েছি। নটিংহ্যামশায়ারের বিরুদ্ধে তো একবার ৪৬ রানে দশ উইকেট নিয়েছিলাম। সেগুলো লোকে কেন ভুলে যায় বুঝি না!’
ভুলে যায় মানুষ, কারণ ব্যাটসম্যানটির নাম ডন ব্র্যাডম্যান। ১৯৪৮ সালে ওভালে যখন তিনি ব্যাট করতে নামেন তখন অস্ট্রেলিয়ার রান ১ উইকেটে ১১৭। ফরোয়ার্ড শর্ট লেগ, দুটি সিøপ রেখে বোলিং শুরু করেন লেগ স্পিনার হোলিস। অফস্টাম্পের সামান্য বাইরে পড়া প্রথম বলটি ব্যাকফুটে গিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন ডন। পরের বলটি একটু শর্ট পিচ ছিল। বোল্ড। ‘ব্র্যাডম্যান বোল্ড জিরো’। ৯৯.৯৪-এ আটকে গেলেন স্যার ডন। আর এভাবেই ক্রিকেটের সবচেয়ে বিখ্যাত শূন্যটির সঙ্গে নাম জড়িয়ে গিয়েছিল হোলিসের। অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে বিরক্তি নিয়ে বলতেন, ‘প্রথম বলেই ডনের আউট হওয়ার কথা। পুরনো ভিডিও ফুটেজটা গিয়ে দেখো। অফস্টাম্পে বাতাস লাগিয়ে বলটা চলে গিয়েছিল। বলটা ডন বুঝতে পারেননি।’ ওয়ারউইকশায়ার কাউন্টির জাদুঘরে ছবি আছে হোলিসের। সেই ছবির নিচে লেখা আছে ছোট্ট একটা ক্যাপশন, ‘ডনকে বোল্ড করার পর টম ভোলারি নামের এক সহ-খেলোয়াড়কে ফোন করে হোলিস বলেন টম, বলটা ডন দেখতেই পায়নি।’
ওয়ারউইকশায়ার কাউন্টির অন্যতম সেরা বোলারকে এটুকু সম্মান দিয়ে থামেনি ইংল্যান্ড। হোলিসের নামে বিশাল স্ট্যান্ড আছে এজবাস্টন মাঠে। ব্র্যাডম্যানকে আউট করার বলটিও সংরক্ষিত ছিল ওয়ারউইকশায়ার কাউন্টির জাদুঘরে। ১৯৫৬তে তা হারিয়ে যায়। ক্রিকেট নিয়ে কোনো আলোচনায় গেলে হোলিস বলটি সঙ্গে নিতেন। দর্শকের অনুরোধে তা দেখাতে হতো। কোনো এক শো-তে যাওয়ার পথে বলটা হারিয়ে ফেলেন হোলিস। আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন পর্যন্ত দিয়েছিল ওয়ারউইকশায়ার ‘কারও কাছে যদি এই দুর্মূল্য বলটি থেকে থাকে দয়া করে ফেরত দিন। এই বল শুধু বার্মিংহামের নয়, ইংল্যান্ডের জাতীয় সম্পদ।’
১০০ গড় একটা বাউন্ডারি মারলেই হয়ে যেত। না হওয়ার দায় শুধু হোলিসের নয়। অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তির সতীর্থ নীল হার্ভেও মনে করেন তার জন্যই পারেননি স্যার ডন। সেই দলের একমাত্র জীবিত সদস্য (বয়স ৯১) এখনো অপরাধ বোধে ভোগেন। স্যার ডনের শেষ টেস্টের ঠিক আগের টেস্টটি হয়েছিল হেডিংলিতে। প্রথম ইনিংসে ১১২ রান করা হার্ভে দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ নম্বরে নেমেছিলেন। জিততে অস্ট্রেলিয়ার দরকার মাত্র ৪ রান। অন্য প্রান্তে ব্র্যাডম্যান অপরাজিত ১৭৩। ক্রিজে গিয়ে প্রথম বলেই চার মারেন হার্ভে। জিতে যায় অস্ট্রেলিয়া। ডনের অপরাজেয় দলের সদস্য এখনো আক্ষেপ করে বলেন, ‘যদি ওই চার রান ব্র্যাডম্যান করতেন, তাহলেই গড় ১০০ হতো। ল্যাঙ্কাশায়ারের সিম বোলার কেন ক্র্যান্সটন আমার পায়ের দিকে বল করেছিল। আমি মিড উইকেট দিয়ে বাউন্ডারি মেরেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে দর্শক মাঠে ঢুকে পড়েছিল। এখনো মনে আছে, ব্র্যাডম্যান আমাকে দ্রুত প্যাভেলিয়নে ফেরার জন্য ডাকছিলেন।’
ব্র্যাডম্যান-হার্ভেদের সময় কেউ পরিসংখ্যান নিয়ে এত মাথা ঘামায়নি। তাছাড়া জীবনের শেষ ইনিংসে ডন ব্র্যাডম্যান শূন্য করবেন তাইবা কে ভেবেছিল। হার্ভে পরে বলেন, ‘আমি নিজের ঘাড়ে দোষ নিচ্ছি। তবে শেষ টেস্টে উনি যে শূন্য করবেন, তা কেউ ভাবিনি। লিডসে ডনের যে চার রান দরকার, সেটাও জানতাম না। ওভালে চার রান করলেই ১০০ গড় হবে, এটাও অজানা ছিল। আসলে তখন পরিসংখ্যানের চর্চা ছিল কম। টিভি ছিল না। প্রেসও এখনকার মতো সংখ্যার পেছনে ছুটত না। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডকে আমরা ৫২ রানে আউট করেছিলাম। তাই ডন আউট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপারটায় ইতি ঘটেছিল। আর ব্যাট করার সুযোগ আসেনি।’
আর আসেনি বলেই বিখ্যাত শূন্য নিয়ে ৯৯.৯৪ গড়ে চিরস্থির হয়ে আছেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান।