এক যুগের সর্বোচ্চ ঘাটতির বাজেট আসছে

আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ ঘাটতি বাজেট আসছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে তা ৫.৮ শতাংশ হতে পারে। এই ঘাটতির আকার হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। গত এক যুগের মধ্যে এত বিশাল ঘাটতি বাজেট আর আসেনি। এর আগে ২০২৭-০৮ অর্থবছরে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতির রেকর্ড ছিল ৬.২ শতাংশ। এর আগে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে ধরে রাখাকে আদর্শ মানদণ্ড ধরা হতো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এত বিশাল ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নের উৎস নিয়ে কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী ১১ জুনের প্রস্তাবিত ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটে এর বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি ও বিদেশি দুই উৎস থেকেই বাজেট ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় উৎসে থাকে ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্র বিক্রির টাকা। আগামী বাজেটের ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাতের ওপর বেশি নজর রয়েছে। চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) এ খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭ হাজার কোটি টাকা। সেখানে আগামী অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে।

সাধারণত ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দুই খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত। অভ্যন্তরীণ খাত আবার দুই ভাগে বিভক্ত। এর একটি হলো, ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়া। আর অন্যটি হলো সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ নেওয়া।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া হলে বেসরকারি খাত ঋণ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কিন্তু সরকারের হাতে ঘাটতি পূরণের জন্য সহজ উপায় হিসেবে আর কোনো দ্বিতীয় পন্থা এখন আর চোখে দেখা যাচ্ছে না। কারণ করোনা পরিস্থিতির ফলে আসন্ন ২০২০-২০২১ অর্থবছরে রাজস্ব আয় কেমন হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রক্ষেপণ এখন পর্যন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের পরামর্শক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বাড়তি ঋণ নিলে করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বিঘœ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ এ প্যাকেজ ব্যাংকের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এখন ঝুঁকি ও অন্যান্য বিষয় চিন্তা করে ব্যাংকগুলো সরকারকেই বেশি ঋণ দিতে আগ্রহ দেখাবে। কেননা ব্যক্তি খাতের চেয়ে সরকারি ঋণে সুদহার ভালো আর ঝুঁকিও নেই বললেই চলে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি কবে উন্নতি ঘটবে কেউ জানে না। ফলে আগামীতে কী পরিমাণ রাজস্ব আহরণ হবে সেটাও প্রেডিক্ট করা মুশকিল। এ অবস্থায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনা উচিত। এজন্য উচ্চাভিলাষী খাতে ব্যয় কমাতে হবে। রাজস্ব আহরণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

চলতি অর্থবছরে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি রয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জন্য অনুদান ছাড়া সার্বিক বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছিল জিডিপির ৫ শতাংশ বা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ৭৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পুরো অর্থবছরে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। যদিও ছয় মাসেই সরকার ৫৩ হাজার কোটি টাকা নিয়ে ফেলেছে। আর সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ মাসে সরকার সংগ্রহ করেছে ৭ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। ধরে নেওয়া যায় যে করোনাভাইরাসের প্রভাবে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে আরও ভাটা পড়বে এবং ব্যাংকঋণ বাড়বে আরও।