কভিড-১৯ মহামারী দেশের শ্রেণি কাঠামোকে পাল্টে দিয়েছে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ৬৬ দিনে বিশাল এক ‘নব দরিদ্র’ গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। লকডাউনের আগে দরিদ্র মানুষের মোট সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪০ লাখ, যা লকডাউনের মাত্র ৬৬ দিনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৫ কোটি ৮০ লাখ। গতকাল এক ভিডিও কনফারেন্সে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপনকালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত এই দাবি করেন।
২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সময়টাতে লকডাউন হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে অর্থনীতি সমিতি। তাদের দাবি, বাংলাদেশ এখন ‘উচ্চ আয় বৈষম্য’ এবং ‘বিপজ্জনক আয় বৈষম্যের’ দেশে পরিণত হয়েছে।
গতকালের ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ১২ লাখ ৯৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট প্রস্তাব দেয় বাংলদেশ অর্থনীতি সমিতি, যা জিডিপির ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রস্তাবিত বিশাল আকারের এ বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার জোগান আসবে বন্ড বাজার, সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ গ্রহণ এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্ব থেকে। মোট বরাদ্দ ও আনুপাতিক বরাদ্দে উন্নয়ন বাজেট হবে পরিচালন বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি, যা এখন ঠিক উল্টো।
বিকল্প বাজেট উপস্থাপনায় আবুল বারকাত বলেন, ‘কভিড-১৯-এর কারণে দরিদ্র মানুষের বেহাল অবস্থা। লকডাউনের ৬৬ দিনে নবদরিদ্র ও অতিদরিদ্র সৃষ্টি হয়েছে ৫ কোটি ৯৫ লাখ। শ্রেণি কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তবে অতিধনী শ্রেণির ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি।’
তিনি দাবি করেন, লকডাউনে অতিধনী শ্রেণির ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের আর্থিক অবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়নি, বরং কোনো ধনী আরও ধনী হয়েছে। তবে আগের ৩ কোটি ৪০ লাখ উচ্চ মধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ, ৩ কোটি ৪০ লাখ মধ্যম পর্যায়ের মধ্যবিত্ত থেকে ১ কোটি ২ লাখ হয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত, ৫ কোটি ১০ লাখ নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে ১ কোটি ১৯ লাখ দরিদ্র এবং ৩ কোটি ৪০ লাখ দরিদ্র থেকে ২ কোটি ৫৫ লাখ অতি দরিদ্র হয়েছে। ৬৬ দিনে সব মিলিয়ে ৫ কোটি ৯৫ লাখ নতুন করে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত উল্লেখ করেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব এখন মহাবিপর্যয়কাল অতিক্রম করছে। ২১৩টি রাষ্ট্র ও ৮০০ কোটি মানুষ আজ মহাসংকটে। এ ভাইরাসের কারণে অর্থনীতির হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৭ জুন পর্যন্ত ৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আইএলওর হিসাবে বিশ্বের ৫০ শতাংশ মানুষ জীবিকা হারাবে। বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষও একই পথের পথিক। তাই আসন্ন বাজেট হবে কভিড থেকে মুক্তির বছর।’
শুরুতে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ স্বাগত বক্তব্য দেন। এবারের ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। এতে করোনার (কভিড-১৯) মহাবিপর্যয় থেকে মুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের বিষয়টি প্রাধান্য পায়।
অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত বলেন, সরকার ঘোষিত ৬৬ দিনের লকডাউনে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। এছাড়া নতুন করে ২ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ হতদরিদ্র হয়ে গেছে। করোনাভাইরাসের আগে আমাদের কর্মে নিয়োজিত ছিল ৬ কোটি ১০ লাখ মানুষ।
লকডাউনে বহুমাত্রিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য। বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অণু-ব্যবসা (ফেরিওয়ালা, হকার, ভ্যানে পণ্য বিক্রেতা, চা-পান স্টল), ক্ষুদে দোকান-মুদি, মনিহারি ও সমজাতীয়, ক্ষুদ্র হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি পাইকারি ব্যবসায়ী। দেশে এ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮৬ লাখের ওপরে। লকডাউনে এদের মধ্যে ৬৫ লাখের অধিক ‘সম্পূর্ণ নিঃস্ব’ হয়ে গেছে (যারা ‘নবদরিদ্র’ গ্রুপে যেতে বাধ্য হয়েছে), অন্যরাও ধসে গেছে। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সচলতার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল ৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা (দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৬ শতাংশ)। এদের পুনরুদ্ধার করতে হবেÑ করতে হবে পুনরুজ্জীবিত। এ লক্ষ্যে আমরা অণু-ব্যবসায়ীদের জন্য এককালীন অনুদান ও অন্যদের জন্য স্বল্প সুদে চলতি মূলধন ঋণ প্রস্তাব করেছি।
তিনি বলেন, গিনি সহগ (অর্থনীতি শাস্ত্রে আয় বৈষম্য পরিমাপের বহুল ব্যবহৃত পরিমাপক) যদি দশমিক ৫-এর বেশি হয় সেটা মারাত্মক। আর একটা সহগ আছে পালমা। পালমা সহগ দেখা হয় সর্বোচ্চ আয় যে ১০ শতাংশ আছে এবং সর্বনিম্ন আয় যে ৪০ শতাংশের আছে, এই দুইয়ের মধ্যে যে পার্থক্য। এই পার্থক্য যদি ৩ গুণ হয় তাহলে বিপজ্জনক।
তিনি বলেন, ‘লকডাউনের আগে আমাদের গিনি সহগ ছিল দশমিক ৪৮। এটি মে মাসের শেষে দশমিক ৬৩৫ হয়েছে। বিপদ মাপার রেশিও পালমা আমাদের ছিল ২ দশমিক ৯২, এখন ৭ দশমিক ৫৩। অতএব মহাবিপজ্জনক। বাংলাদেশ এখন উচ্চ আয় বৈষ্যমের দেশ এবং বিপজ্জনক আয় বৈষ্যমের দেশে পরিণত হয়েছে।’