সারা বিশ্ব যখন কৃষি যান্ত্রিকতায় এগিয়ে আছে, সেখানে বাংলাদেশে এখনো শ্রমিক নির্ভরতা কাটেনি। ধান কাটার মৌসুম এলেও কৃষিশ্রমিকের ব্যাপক সংকট দেখা দেয়। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন। এই অবস্থায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দে প্রকল্প অনুমোদন হতে যাচ্ছে। ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পে ব্যয় হবে ৩ হাজার কোটি টাকা। এ টাকা দিয়ে কৃষকদের অর্ধেক মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করবে সরকার। পরিকল্পনা কমিশনে ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের ওপর মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, থ্রেসার, রিপার, কম্বাইন হার্ভেস্টারের মতো যন্ত্রপাতি কেনা হবে। বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা বাদে সব জেলার কৃষকরা এই সুবিধা পাবেন। প্রকল্পের আওতায় হাওর ও লবণাক্ত জেলায় ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হবে। অন্যান্য জেলায় দেওয়া হবে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি। এক্ষেত্রে দেশজুড়ে কৃষকদের যে গ্রুপ রয়েছে তারা অগ্রাধিকার পাবেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) শাহ মোহাম্মদ আকরামূল হক বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে সব থেকে বড় প্রকল্প। এটা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা অনেক এগিয়ে যাবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ছোঁয়া দেশব্যাপী ছড়িয়ে যাবে। ফলে শ্রমিক সংকট থাকবে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, একটি কম্বাইন হার্ভেস্টার ২৮ লাখ টাকা দাম হলে কৃষক দেবে ১৪ লাখ টাকা বাকি ১৪ লাখ টাকা সরকার পরিশোধ করবে। স্থানীয় কৃষি অফিসের মাধ্যমে কৃষকের নাম ঠিক করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ৫০ হাজার কম্বাইন হার্ভেস্টার দেওয়া হবে কৃষকদের। এছাড়া ভুট্টা মাড়াইয়ের জন্য ১৫ হাজার মেইজ শেলার কেনা হবে। ধান রোপণের জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ আলু উত্তোলনের যন্ত্রপাতি ভর্তুকি মূল্যে পাবেন কৃষকরা।
প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। প্রথমে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পের ব্যয় ২০০ কোটি টাকা কমিয়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে। প্রকল্পটি চলতি বছর থেকে ২০২৫ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) প্রশান্ত কুমার চক্রবর্ত্তী বলেন, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার প্রকল্প নিয়ে একবার সভা হয়েছে। ব্যয় কমানোসহ কিছু সংশোধনী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আমাদের হাতে এলে একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে। সূত্র জানায়, কৃষকের খরচ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে ট্রান্সপ্লান্টার ও হারভেস্টার মেশিন। ৪ সারিবিশিষ্ট রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের এক মেশিনেই ঘণ্টায় ২ দশমিক ৫ বিঘা জমিতে চারা রোপণ করা যায়। অন্যদিকে জিপিএস প্রযুক্তি সুবিধা সম্পন্ন হারভেস্টার দিয়ে একই সঙ্গে প্রতি ঘণ্টায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দি করা যায়। হারভেস্টারের মাধ্যমে খরচের পরিমাণ ৭০-৮০ শতাংশ, সময় ৭০-৮২ শতাংশ বাঁচানো সম্ভব।