ঔপনিবেশিক চিহ্ন মোছার ডাক ইউরোপে

পুরনো পাথরের বন্দরনগরী ইংলিশ শহর ব্রিস্টল। বেঁকে যাওয়া রেলিংয়ের তীরে জড়ো তরুণদের পানিতে গভীর মনোযোগ। সেখানে ১৭ শতকের দাস ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড ক্লস্টনের ভাস্কর্য খোঁজা হচ্ছে এবং সম্ভবত একটি যুগের বিদায় দেখলেন তারা। গত সপ্তাহে বিক্ষোভকারীরা স্তম্ভমূল থেকে ক্লস্টনের ভাস্কর্য আলাদা করে টেনেহিঁচড়ে এনে সেই পানিতে ফেলেন, যেখানে কয়েকশ বছর আগে ক্লস্টনের জাহাজগুলো ভিড়ত। যে জাহাজে আমেরিকায় ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রির জন্য ক্লস্টন আফ্রিকা থেকে শেকলে বাঁধা নারী-পুরুষ ও শিশুদের বহন করতেন।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শে^তাঙ্গ পুলিশ নৃশংসভাবে হত্যা করে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সিএনএন বলছে, আন্দোলনের মুখে ইউরোপ তার ঔপনিবেশিক ইতিহাস পুনঃপরীক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি জাতীয় পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খুব কমসংখ্যক ইউরোপীয় তাদের দেশে দাসদের ব্যবহারের ইতিহাসের পক্ষে অবস্থান নেবে। তবু এখনকার আলাপে দাস ব্যবসার মাধ্যমে লাভবান নেতা ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে উপনিবেশের মতো ভয়াবহতা চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রসঙ্গ কম।

ব্রিস্টলে স্কুল, সড়ক, পাব, সিনেমা হল কী নেই ক্লস্টনের নামে? ব্যবসায়ীদের অর্থে নির্মিত শহর এসব ব্যক্তিদের পরোপকারীর স্বীকৃতি দেয়। নিউ ইয়র্কের রকফেলার কিংবা প্যারিসের আইফেলের মতোই ব্রিস্টলের সঙ্গে জড়িত ক্লস্টন। আর এখানেই মূলত সমস্যা। কারণ কোনো জাতির পক্ষের এই স্বীকৃতি দেওয়া খুবই কঠিন, তাদের বীররা দাস ব্যবসা করত অথবা বর্ণবাদী কিংবা অন্য সভ্যতার ওপর অত্যাচার চালিয়েছে এমনকি গণহত্যা।

দাস ব্যবসায় ক্লস্টনের ভূমিকা ব্রিস্টলে গোপন কিছু নয়। যদিও অনেকেই তিনি ঠিক কী করেছেন, তা জানেন না। ক্লস্টন রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানির সদস্য, যে প্রতিষ্ঠান পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ১ লাখের বেশি দাস আমেরিকাতে এনেছিল। যাত্রাকালীন ২০ হাজার মানুষ মারা গেলে পথেই তাদের ছুড়ে ফেলা হয়।

ব্রিস্টলের প্রখ্যাত কবি মাইলস চেম্বারস বলেন, ‘প্রত্যেক দিন ভাস্কর্য পেরিয়ে যাচ্ছি, বর্ণবাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক জেনেই। আমার পূর্বপুরুষ, পরিবার শোষণ, হত্যা এমনকি ধর্ষণ করেছে, তারই প্রতীক বহন করা বড় অপরাধও।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০ বছর ধরে মানুষ ভাস্কর্যটি সরানোর জন্য কাউন্সিলে আবেদন করছে। এখন কাজটি নিজেরাই করল, এটিকে টেনে ছুড়ে ফেলে দিল।’

এটাই আসলে যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ মানুষের মনের আকুতি। এমনকি ব্রিস্টলের পুলিশ প্রধান অ্যান্ডি মার্শ স্বয়ং ভাস্কর্য উৎপাটনের সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ছিলেন। যদিও ক্ষমতাসীন রক্ষণশীলদের অনুভূতি উল্টো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ‘আইন ভঙ্গকারী ও স্মৃতিস্তম্ভগুলো ধ্বংসে আমি সমর্থন দিতে পারি না। ক্লস্টনের ভাস্কর্য ভেঙে ব্রিটেনের ইতিহাসই মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে।’

ওয়েস্টমিনস্টারে না হলেও দেশজুড়ে পরিবর্তন হচ্ছে। গত বুধবার স্কটিশ পার্লামেন্ট দাসত্বের ইতিহাস জানার জন্য একটি জাদুঘর বানানোর প্রস্তাব পাস করে। লন্ডনের মেয়র সাদিক খান রাজধানীর বৈচিত্র্যতা ও অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ যেসব স্থাপনা রয়েছে, তা পর্যালোচনার নির্দেশন দিয়েছেন। বিরোধী লেবার পার্টিও স্থানীয় ১৩০ কাউন্সিলকে একই নির্দেশনা দিয়েছে। ইতিমধ্যে বর্ণবাদবিরোধী গোষ্ঠী যুক্তরাজ্যের এমন ৬০টি ভাস্কর্য চিহ্নিত করেছে। পূর্ব লন্ডনে ১৮ শতকের দাস ব্যবসায়ী রবার্ট মিলিগানের ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বেলজিয়ামও সড়কের ঔপনিবেশিক নামকরণ মুছে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে।