মহামারীতেও তুঙ্গে যাদের বৃহস্পতি

বৈশ্বিক মহামারীতে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। কাজ হারিয়েছে হাজারো কর্মী। বাজারঘাট বন্ধ থাকায় লোকসানও গুনতে হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিক্রিবাট্টা বেড়েছে। তাদের লাভের অঙ্ক ছুটছে তীব্রগতিতে। অনেক মানুষ নতুন কাজ পেয়েছে, গ্রাহকরাও পেয়েছে প্রয়োজনীয় সেবা। করোনার সময় যেসব প্রতিষ্ঠানের রমরমা, তেমন চার প্রতিষ্ঠান নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

আমাজন

ই-কমার্সে যদি বৃহৎ কোনো কোম্পানির নাম বলতে হয়, সে তালিকায় শুরুর দিকেই উঠে আসে আমাজনের নাম। এ মুহূর্তে আমাজন অনলাইন শপের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। আমেরিকায় যখন থেকে কোয়ারেন্টাইন জীবন শুরু হয়েছে, ঠিক তখন থেকেই লকডাউনে প্রতিটি জরুরি জিনিস নিয়ে মানুষের দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছে আমাজন। ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিস, খাবার, গেমিং, স্ট্রিমিং, ক্র্যাফটস, খবর এবং বিনোদন প্রতিটি সেক্টর নিয়ে তারা কাজ করেছে। এমনকি নেটফ্লিক্স, পিন্টারেস্ট, ফেইসবুকসহ যে সাইটগুলোতে এত দিন মানুষ অভ্যস্ত ছিল, তারাও এখন আমাজনের ওয়েব সিরিজগুলো নিয়মিত দেখছে। করোনাভাইরাসে জর্জরিত হয়ে যখন শপিং সেন্টার এবং পাইকারি বিক্রেতাদের ব্যবসা এক রকম স্থবির হয়ে পড়েছে, ঠিক তখন মানুষের কাছে আমাজনের চাহিদা বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। শুধু মার্চ মাসেই তাদের ওয়েবসাইটে ঢুকেছিল দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষ। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা ৬৫ শতাংশ বেশি। মহামারীতে আমাজনে গ্রাহকদের চাহিদায় শীর্ষে ছিল ফেস মাস্ক, গ্লাভস ও টয়লেট পেপারের। মাসখানেকের ভেতর এ ধরনের চাহিদা এতই বেড়ে গিয়েছিল, দেশজুড়ে ৫০০টিরও বেশি যে ওয়্যারহাউজ থেকে আসবাবপত্র এবং খেলনার নতুন শিপমেন্ট বন্ধ রেখে শুধু মেডিকেলের সরঞ্জাম এবং ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য জায়গা করা হয়। তবে এটাও সত্য, চাহিদার তুলনায় তাদের গ্রাহককে সেবা দিতে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ তাদের সঙ্গে যে পাইকারি বিক্রেতারা কাজ করেন, তারাও চাহিদামতো পণ্য আমাজনে পৌঁছাতে পারছেন না। বিক্রেতারা কীভাবে ব্যবসা ধরে রাখতে পারেন, তা নিয়ে আমাজনের থার্ড পার্টি যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো আছে তারা নিয়মিত ফেইসবুক এবং টেলিগ্রাম গ্রুপগুলোতে বিভিন্ন পরামর্শ শেয়ার করেছেন। আমাজনের সাবেক একজন কর্মচারী এবং থার্ড পার্টি সেলার কনসালট্যান্ট ক্রিস ম্যাকবি বলেন, ‘ব্যবসা শেষ হয়ে যাবে এমন কেউ চান না। আমাকে প্রচুর মানুষ ফোন করেছেন কীভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যায় শুধু সেটি জানতে। বেঁচে থাকার তাৎক্ষণিক কোনো কৌশল ছাড়া এমন পরিস্থিতে তারা বিপদে পড়ে গেছেন।’ আমাজনে অন্তত ৫৮ শতাংশ থার্ড পার্টির ব্যবসায়ীরা ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন। আমাজন জানিয়েছে, কভিড-১৯-এর কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং এ সময়ে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে কাজ করা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নতুন আরও অনেক আইডিয়া সামনে এসেছে তাদের। আমাজনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হচ্ছে, পণ্যের দাম আগের তুলনায় কিছুটা কমিয়ে দেওয়া। আমাজনকর্মীদের নিয়েও কিছু সংকটে ছিল। এই মহামারীতেও ট্রেনিং দিয়ে তারা ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে চাকরিতে নিয়োগ করেছে। হাইজিন নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে আগের কিছু শ্রমিককেও। অর্ডার আসার সঙ্গে সঙ্গে দুদিন বা তার চেয়েও কম সময়ে পণ্য হাতে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। তবে হ্যাঁ, তারা পণ্যের ওজন এবং পরিমাপ অনুযায়ী পণ্য বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার চার্জ কমায়নি।

কঠিন এই পরিস্থিতিতে মানুষকে সেবা দেওয়ায় জেফ বেজোসের প্রতিষ্ঠান আমাজন দেখেছে বিস্তর লাভের মুখও। ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে এসেই তাদের আয় ৭৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। গত বছর এ সময় তাদের আয়ের পরিমাণ ছিল ৫৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। খাবারের খাতে ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন থেকে আয় দাঁড়িয়েছে ৮ বিলিয়নে, প্রথমবারের মতো ১০ বিলিয়ন আয় হয়েছে ক্লাউড কমপিউটিং বিজনেসে। আমাজন ঘোষণা দিয়েছে চার বিলিয়ন ডলার তারা খরচ করবে কভিড-সম্পৃক্ত বিভিন্ন খাতে। এর মধ্যে আছে ব্যক্তিগত সুরক্ষার নানা সরঞ্জাম, পরিষ্কারকরণের নানা জিনিস, ঘণ্টায় কাজ করা শ্রমিকদের জন্য উচ্চ বেতন এবং টেস্ট করার জন্য কয়েক লাখ কীট। জেফ বেজোস বলেন, ‘আপনি যদি আমাজনের একজন শেয়ারহোল্ডার হন এবং এখানে যদি আপনি টিকে থাকতে চান, তবে আপনাকে বড় করে ভাবতেই হবে। কারণ আমরা ছোট করে ভাবতে পারি না।’ গত কয়েক সপ্তাহে আমাজনের এমন বাধাবিহীন বৃদ্ধি তাদের নিয়ে চলমান সব বিতর্ককে ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে।

জুম

করোনাকালে জুম কীভাবে সেবা দিয়েছে, সেটি জানার আগে এর প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্পটা জেনে রাখা ভালো। ২০১১ সালে চীনা বংশোদ্ভূত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এরিক ইউয়ান জুম শুরু করেন। জুমের যাত্রা শুরুর কয়েক বছর আগে ২০০৫ সালে আমেরিকার প্রথম ভিডিও কনফারেন্স কোম্পানি ওয়েবএক্সকে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয় সিসকো। এরিক যখন জুম শুরু করেন, তখন থেকেই বিভিন্ন ইনভেস্টরের কাছ থেকে বেশ তিক্ত কথা শুনতে হয়েছে তাকে। তাদের মতে, যেখানে মার্কেটে ইতিমধ্যেই মাইক্রোসফট ও সিসকোর মতো কোম্পানি রয়েছে, সেখানে জুমের আসা এক রকম খেয়ালিপনাই বটে। তবে এরিক এসবে খুব বেশি পাত্তা দিলেন না। কারণ তিনি যখন কাজের জন্য পরিবার ছেড়ে দূরে যেতেন, তখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য সিসকোকে তার মোটেও ভালো লাগত না। তিনি তখনই বুঝেছিলেন ব্যবসায়িক এই বিশ্বে মোবাইল ফোনে কথা বলা যায়, এমন সফটওয়্যারের প্রয়োজন কখনো না কখনো হবেই। এরিক ভুল ভাবেননি। তার সেই লেগে থাকাই আজ তাকে পরিশ্রমের ফল ফিরিয়ে দিচ্ছে।

কভিড-১৯-এর প্রকোপে বিশ্বজুড়ে লকডাউন শুরু হলে, বাড়িতে বন্দি অবস্থায় অসংখ্য মানুষ আপনজনদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলেন জুমের মাধ্যমে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে পরিবারের সব সদস্যের একসঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা, বার্থডে পার্টিসহ আনন্দের অনেক মুহূর্ত কেটেছে জুমে। সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে শিক্ষার্থী এবং অফিসে কর্মরত ব্যক্তিরা। লকডাউন শুরু হলে চীন, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য জুম ডাউনলোডকে ফ্রি করে দেওয়া হয়। অবশ্য এর পেছনে মূল কারণ ছিল জুমের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা। করপোরেট হাউজগুলোতে ব্যবহারের জন্য অবশ্য মূল্য পরিশোধ করতে হয়। এপ্রিল থেকে শুরু করে মে মাস পর্যন্ত জুমের আয় হয়েছে ৩২৮ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। গত বছরের তুলনায় আয় বেড়েছে ১৬৯ শতাংশ। বর্তমানে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ জুম ব্যবহার করছে। ডিসেম্বর মাসে যেখানে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ বিলিয়ন। প্রতি ২ লাখ ৬৫ হাজার ৪০০ মানুষের জন্য বর্তমানে কর্মী আছে ১০ জন। এ সংখ্যা বেড়েছে আগের চেয়ে ৩৫৪ শতাংশ।

আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও চ্যাট সফটওয়্যারটিকে বেশ সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে। সইতে হয়েছিল গ্রাহকের তথ্য চুরি করে ফেইসবুককে পাঠাচ্ছে এমন অপবাদও। তবে এসব কথায় জুম পিছিয়ে পড়েনি। জুম কেন এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠল তা নিয়ে শীর্ষ গ্লোবাল টেকনোলজি মার্কেট এনালিস্ট ফার্মের সিনিয়র ডিরেক্টর অ্যালেক্স স্মিথ বলেন, ‘জুম মানুষের ভেতর গণতন্ত্রের মতো একটি বিষয় তৈরি করে দিয়েছে। সব ধরনের বিজনেসের কনফারেন্সিং থেকে শুরু করে বোর্ড রুমের এক্সিকিউটিভদের সঙ্গে মিটিং, ইয়োগা প্রশিক্ষক থেকে শুরু করে স্কুলের শিক্ষার্থী সবাই সেবা নিতে পারছে ঘরে বসেই। ঘরের মধ্যেই এত সহজে কাজ হচ্ছে বলেই জুম খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।’ মহামারী চলে গেলেও জুম এই সফলতা ধরে রাখতে চায়। বছরের বাকি সময় এই আয়কে তিন গুণ করার কথা ভাবছে তারা। জুম এ মুহূর্তে যেভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে, সেটি পরিবর্তনের ইচ্ছা নেই এরিক ইউয়ানের। তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শুধু সেবা দিয়ে যাওয়া। সেটি আপনি যেকোনো জায়গা বা যেকোনো ডিভাইস থেকেই করুন না কেন। এ মুহূর্তে জুমের লক্ষ্য শুধু যথাযথ সেবা দিয়ে যাওয়া। কারণ অসংখ্য মানুষ এখন জুমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছেন।’

নেটফ্লিক্স

মহামারীর মধ্যে বেশ ভালো আয় করা কোম্পানির মধ্যে আছে নেটফ্লিক্সের নামও। কারণ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের বাড়িতে বসে সময় কাটানোর নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখা এ মুহূর্তে সবচেয়ে সহজ। করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে তারাও সাইটে যুক্ত করে ফেলে জনপ্রিয় অনেক অনুষ্ঠান ও সিনেমা। বছরের শুরুতেই অসংখ্য মানুষ সাবস্ক্রাইব করে নেটফ্লিক্স। তারা ভেবেছিল এ সময়ে খুব বেশি হলে ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ যুক্ত হতে পারে তাদের সঙ্গে। কিন্তু তাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে এ সংখ্যা হয়ে যায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ১৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন। বিশ্বজুড়ে এখন নেটফ্লিক্সের গ্রাহক ১৮২ মিলিয়ন। বছরের প্রথম তিন মাসে আয় হয়েছে ৫ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। নেটফ্লিক্স জানিয়েছে, তাদের গ্রাহকসংখ্যা বাড়লেও করোনাভাইরাসের কারণে তাদের নতুন প্রোডাকশন বন্ধ। নতুন গ্রাহকের কারণে তাদের আয় খুব বেশি বাড়েনি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সব ধরনের ছবির কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। মুদ্রা মানের বিবেচনায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গ্রাহক বাড়ায় করোনা পরিস্থিতির আগের তুলনায় এখন তাদের আন্তর্জাতিক আয় কম। সিনেমা যুক্ত করার কাজ খুব বেশি না চললেও বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান নিয়ে তারা বেশ আশাবাদী। বিনিয়োগকারীরা নেটফ্লিক্সে আগ্রহ দেখানোয় এর শেয়ারের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। নেটফ্লিক্সের চাহিদা এত বেড়েছে যে মার্চ মাসে তারা ভিডিওর মান কমাতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই হাজার গ্রাহকসেবা কর্মীও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নেটফ্লিক্সে। চলতি মাস নাগাদ আরও ৭৫ লাখ গ্রাহক তাদের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হবে বলে তারা আশাবাদী। সিনেমা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান ছাড়াও নেটফ্লিক্স দর্শকসংখ্যা বাড়াতে যুক্ত করেছে ডকুসিরিজ। তাদের এ মুহূর্তে ৩৮৩টি ডকুসিরিজ রয়েছে, যা অন্য স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলোর এখন পর্যন্ত নেই। এর মধ্যে আছে ২০১৫ সালের বিখ্যাত ডকুসিরিজ ‘মেকিং এ মার্ডারার’সহ এ বছরের আলোচিত ‘টাইগার কিং : মার্ডার, ম্যায়হেম অ্যান্ড ম্যাডনেস’। কভিড-১৯ চলাকালে আরও কিছু নতুন সংযোজন করার কথা রয়েছে তাদের।

আলিবাবা

চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি চীনের উহানকে সম্পূর্ণ লকডাউন করে দেওয়া হয়। ১১ মিলিয়ন মানুষ একসঙ্গে কোয়ারেন্টাইনে চলে যায়। প্রধান সব হাইওয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘোষণার সময়ও কেউ বুঝতে পারেনি এই লকডাউনের সময় কতটা দীর্ঘ হতে পারে। লকডাউনের এ সময়টুকু ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জের। উহানের মতো একটি শহরে দরকারি জিনিস অনলাইনে অর্ডার করে হাতে হাতে পেয়ে যাওয়া মানে হচ্ছে শরীরের সব অঙ্গ ভালোভাবে কাজ করছে এ রকম একটি বিষয়। লকডাউনে সব কাজে বিঘœ চলে আসে। স্থবির হয়ে যায় সবকিছু। দোকানে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় মানুষের, বাড়িতে সবাই বন্দি, ঝুঁকির ভয়ে কেউ বাইরেও যায় না, দরকারি জিনিস কিনতে তাই ভরসা তখন অনলাইনই। কীভাবে এই কঠিন সময়ও মানব দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে, প্রযুক্তির সাহায্যে, নতুন নতুন আইডিয়া উদ্ভাবন করে মানুষকে সাহায্য করেছিল আলিবাবা?

লকডাউনের শুরুতেই আলীবাবা ডিজিটাল দিকে নজর দিয়েছিল সবার আগে। ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তারা সব ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। চীনের নতুন বছরের ছুটিতে ৫৪টি শহরে এন৯৫ মাস্ক এবং বিভিন্ন মেডিকেলের সরঞ্জাম তৈরির জন্য কাজ শুরু করে। উহানের ওয়্যারহাউজে যত জিনিসের স্টক ছিল, সব ফাস্ট-ট্র্যাক শিপিংয়ে পাঠিয়ে দেয় যেন জায়গা খালি হয়। কারণ সে মুহূর্তে বিটুসি ও সিটুসি মার্কেটপ্লেস থেকে প্রচুর পরিমাণে ফেসিয়াল মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ জরুরি জিনিস আসা শুরু হয়ে গিয়েছিল। একই সময় পুরো দেশে অনলাইন ডোনেশনের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট ‘আলিপে’ চালু করে দেয়। যেখানে প্রথম আট ঘণ্টায় এক মিলিয়ন ডলার জমা পড়ে। সরাসরি ডেলিভারি দেওয়ার জন্য আলিবাবা নতুন অটোমেটেড টেকনোলজি চালু করে। উহান বর্ডারে দাঁড়িয়ে স্মার্ট গাড়িগুলোতে পণ্য নিয়ে স্থানীয় এলাকাগুলোর ম্যাপ তাতে লোড করে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট এলাকা অনুযায়ী গাড়িগুলো বিভিন্ন হাসপাতাল এবং বাড়ি বাড়ি জিনিস নিয়ে পৌঁছে যায়। লকডাউনে প্রধান সড়কগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে খুচরা বিক্রেতারা পণ্য সরবরাহ করতে পারছিল না। হুবেই রাজ্যের বাইয়াংডিয়ান গ্রামে পণ্য ডেলিভারি করতে গেলে ছোট রাস্তা বা ফেরি পার হয়ে যেতে অন্তত ছয় ঘণ্টা লাগত। এ পরিস্থিতিতে আলিবাবার সঙ্গে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় জেডিডটকম। তারা ড্রোনের সাহায্যে মাত্র ২০ মিনিটে পণ্য পৌঁছে দিত।

চাল, গম, ময়দা, তেল, সবজি, মাছ, মাংস এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক খাবার গ্রহণ করা সবচেয়ে বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল লকডাউনে। দোকান থেকে যেখানে মানুষ এসব পণ্য কিনতে অভ্যস্ত, সেখানে রাতারাতি তাদের এ ধরনের পণ্য পৌঁছে দিতে হিমশিম খেয়ে যায় চীনের ই-কমার্স সাপ্লাই চেইন প্রতিষ্ঠানগুলো। আলিবাবার গ্রোসারি নিয়ে কাজ করা ‘ফ্রেশিপ্পো’ এই কাজটিকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া রেস্টুরেন্ট এবং বিভিন্ন মার্কেট থেকে তারা বেশ কয়েকজন কর্মীকে কাজে নিয়োগ দেয়। খাবার রান্না ও পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করে ফেলে তারা।

আলিবাবা যে শুধু কর্মীদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে, তাই নয়। নিয়মিত তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বিশেষ করে তাপমাত্রা পরীক্ষা, ভাইরাসে আক্রান্ত হলো কি না সেগুলোর খোঁজ রাখা, ফেসিয়াল মাস্ক, গ্লাভস, সুরক্ষার জন্য যা যা দরকার তার সবই ব্যবহার করে কাজে নিয়োগ করেছে। শেষ অবধি যদিও ডেলিভারি প্রসেস নিয়ে তাদের ভাবতে হয়েছে। কারণ গ্রাহক সরাসরি ডেলিভারি ম্যানের হাত থেকে পণ্য নিতে চায়নি। স্বাস্থ্য খাতেও ভূমিকা ছিল আলিবাবার। অনলাইন কনসালটেশন ‘আলিহেলথ’ ‘টাওবাও’ এবং ‘আলিপে’র মাধ্যমে কভিড-১৯-এর সব তথ্য প্রদান করত। ভাইরাস পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে তারা অনলাইন কনসালটেশন ফ্রি করে দেয়।

করোনার এ পরিস্থিতিতে আলিবাবার আয়ও বেড়েছে অনেক। বছরের এক চতুর্থাংশে এসে তাদের ২২ শতাংশ আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। আলিবাবার চেয়ারম্যান এবং প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা ডেনিয়েল ঝাং বলেন, ‘এই মহামারী ক্রেতাদের ক্রয়ের ইচ্ছা, প্রযুক্তিগত ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয়তাকে একদম পরিবর্তন করে দিয়েছে।’ বিশ্বজুড়ে প্রতি আটজন মানুষের মধ্যে একজন এখন তাদের গ্রাহক। আয় হয়েছে ১৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক মহামারীতে বিভিন্ন জায়গায় যখন কর্মী ছাঁটাই চলছে, তখন নিজেদের উদীয়মান ক্লাউড প্রযুক্তি বিভাগে পাঁচ হাজার নতুন নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে আলিবাবা। নেটওয়ার্ক, ডেটাবেইস, সার্ভার, চিপ ও আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ক্ষেত্রগুলোর কর্মী নিয়োগ করা হবে।