মহামারী মোকাবিলার বাজেট হয়নি এটা : সানেম

করোভাইরাসের মহামারী মোকাবিলার জন্য যে ধরনের প্রত্যাশা ছিল তা না হয়ে গতানুগতিক বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)।

গতকাল শনিবার ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে ভার্চুয়াল মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এই প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট কভিড-১৯ মোকাবিলায় যেমন হওয়া দরকার ছিল, তেমন হয়নি। বাজেট অন্যান্য বছরের মতো গতানুগতিক ধারাতেই প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এটি যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও সেটি যথেষ্ট নয়।’

ড. সেলিম বলেন, অতীতের চেয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও সেটির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাজেট বাস্তবায়নের ওপর, বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে নিয়মিত তথ্য দেওয়া উচিত। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের সঠিক ব্যবহারে উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও সক্ষমতার অভাব নিয়ে আলোচনা করা দরকার ছিল। ‘নতুন করে দরিদ্র হয়েছে যারা, তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ কিছু নেই এবং এ ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃতভাবে নগদ ও খাদ্য সহায়তা, বেকার ভাতা দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া যেত।’ কালোটাকা সাদা করার বৈধতা দেওয়া নিয়ে অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অতীতে কোনো সুফল বয়ে আনেনি; বরং সৎলোকদের নিরুৎসাহিত করেছে। এটি সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, সেটিও ভেবে দেখা দরকার। দেশের রপ্তানি খাত পুনরুদ্ধার নিয়ে তিনি বলেন, বাজেটে পোশাকশিল্পকে যে পরিমাণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অন্য রপ্তানি শিল্পকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব উল্লেখ করে ড. সেলিম বলেন, এটা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেশি। স্বার্থান্বেষী মহলের চাপ মোকাবিলা করে রাজস্ব আদায়ের কৌশল নিতে হবে। ব্যয় কমাতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কর্তনের চিন্তা করার পরামর্শ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের অর্থায়ন কমিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তবে বিশ^ ব্যাংক, আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ রাখেন তিনি।

বাজেটে দেশীয় ব্যাংকব্যবস্থা থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা ব্যাংকিং খাতের সংকটের এই সময়ে সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই অর্থনীতিবিদ। ‘আগামী অর্থবছরের জন্য মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব।’ সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘বাজেটে শহরের ভাসমান দরিদ্রদের জন্য তেমন কিছুই নেই। যুব এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মহামারীর এই সংকটে দুরবস্থায় পড়া নারীদের জন্য সুর্নিদিষ্ট তেমন কিছু নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন ব্যবসায় প্রণোদনা ও মোবাইল ব্যবহার সুবিধাজনক করার জন্য বাজেটে ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি। প্রশিক্ষণের ওপর আরও জোর দেওয়া উচিত ছিল।’ তবে বাজেটে ন্যানো টেকনোলজি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ওপর মনোযোগ দেওয়ায় প্রশংসা করেন তিনি। ড. বিদিশা বলেন, জাতীয় পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধন যেমন অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কর্তন ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় ভাতা কর্তন ইত্যাদি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার ছিল।