হাঁটুর ব্যবহার ও অপব্যবহার

চরণ মানে পা। যাকে কথ্য ভাষায় ঠ্যাং বলে। এই চরণেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে হাঁটু। এটা অস্থিসন্ধি (ঔড়রহঃ), ঊরুর সঙ্গে পায়ের সংযোগস্থল। যেহেতু সব বোঝা শেষ পর্যন্ত হাঁটুর ওপরে গিয়েই পড়ে, তাই তুলনামূলকভাবে হাঁটু বেশ শক্ত হয়।

হাঁটু আমাদের শরীরের খুবই প্রয়োজনীয় একটা অংশ। হাঁটুর ওপর ভর দিয়েই আমরা দাঁড়াই, চলাচল করি। আমাদের সমাজে কাউকে অচল বানিয়ে দিতে চাইলে বা উচিত শিক্ষা দিতে চাইলে হাঁটু ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। প্রায়ই শোনা যায়, ‘বেশি তেড়িবেড়ি করলে হাঁটু ভেঙে দেব।’ সে এক ভয়াবহ ব্যাপার। ভাবতেই হাঁটুটা কেমন অবশ হয়ে আসে!

হাঁটু খুব সহজেই আক্রান্ত হয়। দেশে হাঁটু ভাঙেনি বা হাঁটুতে আঘাত পায়নি এমন মানুষ খুব কম আছে। সুন্দরবন যেমন সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলে বাংলাদেশকে আগলে রাখে, ঠিক তেমনি হাঁটুও আমাদের প্রাথমিক সব ধরনের আঘাত সামলে আমাদের রক্ষা করে।

আর্থরাইটিস বা বাতের রোগীরা হাঁটু নিয়ে খুব সমস্যায় ভোগেন। অমাবস্যা-পূর্ণিমায় হাঁটুর ব্যথায় তারা কাতর হয়ে পড়েন। অনেকে হাঁটুর ব্যথায় হাঁটতেও পারেন না। এ এক দুঃসহ পরিস্থিতি।

হাঁটুর আরেক নাম ‘জানু’। আমাদের দেশে ভালোবাসার মানুষকেও ‘জানু’ বলে সম্বোধন করার রীতি আছে। এর কারণ হতে পারে হাঁটু ছাড়া যেমন চলা যায় না, সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায় না, দৌড়ানো যায় না, তেমনি ভালোবাসার মানুষ ছাড়াও চলা যায় না, দাঁড়ানো বা দৌড়ানো যায় না। তাই প্রিয়তমাকে ঘন ঘন ‘জানু’ বলে সম্বোধন করা হয় (কেউ কেউ অবশ্য ‘জান’ থেকে ‘জানু’ বলা হয় বলে মতপ্রকাশ করেন। তাহলে প্রাণকে কেন প্রাণু বলা হয় না, সে প্রশ্ন ওঠে)!

হাঁটু অনেক শক্ত হলে কী হবে, ভয়ে, উত্তেজনায় সবার আগে এটাই কাঁপা শুরু করে। এমনকি শীতেও সবার আগে হাঁটু কাঁপে। তাই তো কবি কঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লিখেছেন : জানু-ভানু- কৃশানু শীতের পরিত্রাণ (জানু=হাঁটু, ভানু=সূর্য বা সূর্যালোক, কৃশানু=আগুন)। অর্থাৎ শীত থেকে রেহাই পেতে হলে হাঁটু ঢাকতে হবে, সূর্যালোক বা আগুনের সান্নিধ্যে যেতে হবে।

আমরা ছোটকালে যখন অক্ষর চিনতে ও লিখতে শিখেছি, তখনো হাঁটুর উদাহরণ পেয়েছি। ‘দ’ বর্ণটি শেখাতে সেই সময়ের অভিভাবকরা ভাঙা হাঁটুর সঙ্গে তুলনা করতেন। বলা হতো ‘হাঁটু ভাঙা দ’। আমরা সুর করে পড়তাম, ‘তেলি পাকি ত, থলের মতো থ, হাঁটু ভাঙা দ।’

এরপর প্রাইমারি ও হাইস্কুলে আমরা হাঁটুর নির্মম ব্যবহার করতে শিখেছি। তখন বেশির ভাগ স্যারেরই কমন শাস্তি ছিল হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা বা ‘নিলডাউন’। বাঁদরামির জন্য, বেয়াদবির জন্য, হোমটাস্ক না করার জন্য, এমনকি লেখাপড়া না পারার জন্য কমন শাস্তি ছিল নিলডাউন। সে শুধু হাঁটু গেড়ে বসে থাকাই নয়, কানও ধরতে হতো। বড় ধরনের বেয়াদবির শাস্তি ছিল ‘নিলডাউন’ অবস্থায় কিছুটা স্থান প্রদক্ষিণ! তখন ‘নিলডাউন’ এতটাই অনিবার্য ছিল যে, অনেক সময় আমরা ক্লাসে স্যার আসার আগে নিলডাউন প্র্যাকটিস করতাম। স্যারের টেবিলের দুই পাশের মেঝেটা হাতের তালু দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে রাখতাম যেন হাঁটুতে ধুলা-বালু না বিঁধে!

স্কুলে নিলডাউনের শাস্তির যুগ অবশ্য আমাদের শৈশবের মতোই বিদায় নিয়েছে। তবে সেটা আসলেই ছিল এক কষ্টকর অভিজ্ঞতা!

এরপর আমরা বড় হতে থাকলাম আর ছড়া মুখস্থ করতে থাকলাম, আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। ‘হাঁটু জলের’ মধ্যে কী একটা যেন মাহাত্ম্য আছে। বৃষ্টির পর অধিকাংশ সংবাদপত্রের পাতায় হেডলাইন করা হয় : আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাজধানীতে হাঁটু জল! বাংলা সিনেমার গানেও হাঁটু জলের উল্লেখ আছে : ‘হাঁটু জলে নাইমা কন্যা হাঁটু মাজন করে।’

আমাদের রাজনীতিতেও হাঁটু-সংক্রান্ত উদাহরণ দেওয়া হয়। বিগত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘হাঁটু ভাঙা দল বিএনপির সঙ্গে জোট করেছে কোমর ভাঙা দলের বুড়ো নেতারা।’

যা হোক, হাঁটু আকস্মিকই বিশ্বরাজনীতিতে ব্যাপক আলোচিত হয়ে উঠেছে। গত ২৫ মে একটি দোকানে জালনোট দেওয়ার অভিযোগে আমেরিকার পুলিশের হাঁটুর চাপে জর্জ ফ্লয়েড নামে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকা উত্তাল হয়ে উঠেছে। হাতকড়া পরতে না চাওয়ার অভিযোগে তাকে গাড়ির পেছনের চাকার ঠিক পাশে মাটিতে ঠুসে ধরে পুলিশ অফিসার ডেরেক শওভিন। আট মিনিটেরও বেশি সময় ধরে ঘাড়ের ওপর হাঁটুর চাপ সবাই দেখেছেন ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে। হাঁটুর বাড়াবাড়িতে মৃত্যু ঘটল একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির। এ ঘটনার পর ‘আই কান্ট ব্রিদ’, ‘স্টপ রেসিজিম’, ‘লেট মি ব্রিদ’, ‘ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটারস’ ইত্যাদি সেøাগান পেরিয়ে সবশেষে স্লোগান উঠে এসেছে ‘আমার ঘাড় থেকে তোমার হাঁটু সরাও’।

ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর তার স্মরণ এবং শেষকৃত্যে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের মূল শপথ ছিল, ‘চলো, জর্জ ফ্লয়েডের নামে উঠে দাঁড়াই আর গর্জে উঠি, আমার ঘাড় থেকে তোমার হাঁটু সরাও।’

শাসকদের বশংবদ শান্ত্রিসেপাইদের হাঁটু অবশ্য সব সময়ই শাসিতের ঘাড়কে তাড়া করে ফেরে। হাঁটু দিয়ে ঘাড়ের ওপরটা ডলে দেওয়া, চেপটে যাওয়া মানুষ যত ক্লান্ত হয়ে পড়বে তত তাকে আরও বেশি করে রাস্তার সঙ্গে লেপটে দেওয়া, যত তার নড়াচড়া কমবে, তত জয়ের উপলব্ধি, এই জায়গাটিতেই একটা অংশের মানুষের পরিতৃপ্তি। সেখানে কিন্তু ডান-বাম নেই। হিটলার কিংবা মুসোলিনির অত্যাচার অথবা স্টালিন কিংবা চাওসেস্কুতে কোনো ভেদ নেই।

শাসকদের রক্তচক্ষু অবশ্য মাথা থেকে পা পর্যন্ত লম্বা। যেকোনো অঙ্গ ব্যবহার করে চেপে ধরতে পারে শাসিতের ঘাড়। বিশ্লেষকদের মতে, ‘সেখানে ক্ষমতা পেলেই অন্যকে অত্যাচার করার যে তীব্র আকাক্সক্ষা, তা মানুষেরই চরিত্র। আর শাসক তো আরও বেশি করে মানুষ, আরও অনেকটা বড় আকারের মানুষ শরীরের মাপে না হলেও হিংস্রতায়। একটু গুছিয়ে ভাবলে দেশের রাজা, গজা, মন্ত্রী, পারিষদ, পুলিশ, প্রশাসক, তাদের চেলাচামুণ্ডা সব মিলেমিশে বেশ কয়েকটা লোক, যাদের সংখ্যা শতাংশের হিসেবে নগণ্য, কিন্তু ক্ষমতা অসীম। এরাই তিয়েন আন মেন স্কয়ার থেকে হংকং পর্যন্ত কমিউনিস্ট নামে লোক ঠ্যাঙ্গায়। এরাই আফগানিস্তানের তালেবান, মধ্যপ্রাচ্যের আইএসএস, সংস্কারের নামে সরকারি সাহায্যকে চুলোয় পাঠানো ফ্রান্সের ম্যাক্রোঁ, ক্ষমতা দখলের পথে প্রচুর বিরোধী লাশের ওপর দিয়ে হাঁটা তুর্কির এরদোয়ান, নিজের দেশে বিরোধীদের ভ্যানিশ করে দেওয়া পুতিন সাহেব ইত্যাদি ইত্যাদি।’

সংবেদনশীলতা, নাগরিকদের সম্মান-মর্যাদা-অধিকারের বিষয়টি ক্রমেই শাসকদের অভিধান থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। খোদ আমেরিকায় এখন ঘাড় থেকে হাঁটু নামানোর দাবিতে উত্তাল। রাশিয়ায় মানুষের স্বাধীনতা দিন দিন কমছে। চীন, কঙ্গো, উত্তর কোরিয়া এসব দেশে গণতন্ত্রের সূচক নিয়ে আলোচনা করা বৃথা। অর্থাৎ ঘাড়ের ওপর হাঁটুর সার্বিক ব্যাপ্তি যে বিশ্ব ইতিহাসের মূল বিষয়, তা নিয়ে কোনো ধন্দ নেই। তবে ইউরোপের কয়েকটি দেশ, বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়া, আবার দক্ষিণ গোলার্ধে নিউজিল্যান্ড এ রকম কয়েকটি জায়গা আছে যেখানে হাঁটুর চাপ সত্যিই কম।

শেষে ফিসফিস করে নিজের দেশ নিয়ে আলোচনা করার দায় থাকে। আমাদের দেশেও শাসকের অভাব নেই। মন্ত্রী, শান্ত্রি, আমলা, কামলা, গুণ্ডা, রাজনীতির চাঁই, এই চাঁইয়ের সমর্থক-ভাড়াটে আরও কত কী! এদের একজন আসে একজন যায়। অত্যাচার নির্মূল হয় না কখনো। গোপালগঞ্জে নিখিল নামের এক কৃষককে স্থানীয় পুলিশ হাঁটুর ঘায়ে ভবলীলাই সাঙ্গ করে দিয়েছেন। আমেরিকান পুলিশের হাঁটুর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বিশ্ব জুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঢেউ উঠলেও নিখিলের পিঠে আমাদের পুলিশের হাঁটুর আঘাতের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো ‘টুঁ’ শব্দটিও নেই! আমেরিকা ও বাংলাদেশের পুলিশ উভয় ক্ষেত্রে হাঁটুর ব্যবহার অভিন্ন হলেও প্রতিক্রিয়ায় আসমান-জমিন ফারাক! কারণ জাতি হিসেবে আমরা ক্রমেই হাঁটুভাঙা জাতিতে পরিণত হচ্ছি।

অন্যায়ের হাঁটু আমাদের কাঁধ, গলা, মাথা পর্যন্ত উঠলেও আমাদের মধ্যে কোনো হেল-দোল নেই। একটু একটু করে আমাদের সামষ্টিক হাঁটুর জোর কমছে। এর বিপরীতে শান্ত্রিসেপাই লুণ্ঠনকারী ও তাদের দোসরদের হাঁটুর জোর বাড়ছে। আজকাল অবশ্য অনেকে হাঁটুকে ছাতি বলেন।

দেশ চালাতে হাঁটুর জোর যে লাগে সে কথা হাড়ে হাড়ে বোঝেন সবাই। আমাদের আহাম্মকি হচ্ছে, ঘাড় শক্ত না করেই হাঁটুকে ওয়েলকাম করছি। তবে এখানে স্বীকার করা দরকার যে, বর্তমানে দেশ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে দূর দেশের জর্জ ফ্লয়েডকে নিয়ে মাথা ঘামানোটাই নিরাপদ। সোশ্যাল ডিসটেন্সিংয়ের দিনগুলোতে ঘাড়ের ওপর হাঁটুর চাপের ঝুঁকি বাড়ানোর কোনো মানে হয় না!

লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com