রাতে ভয়ংকর ‘ভাসমানরা’

রাজধানীর ফুটপাত, ফ্লাইওভার, বাস-লঞ্চ টার্মিনাল কিংবা রেলস্টেশনে আশ্রয় নেওয়া ছিন্নমূল বা ভাসমান মানুষরা রাত বাড়লে ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এসব মানুষ সারা বছর ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও করোনার কারণে এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এদের বেশিরভাগই মাদকাসক্ত। মাদকদ্রব্য কেনার জন্য যেকোনো অপরাধ সংঘটিত করতে তারা দ্বিধা করে না। ছিনতাই, চুরি, ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অনেকে আবার খুন পর্যন্ত করছে। ফলে ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে রাতের রাজধানী।

পুলিশের ভাষ্য, ছিন্নমূল মানুষের বেশিরভাগই মাদকাসক্ত। কিছুদিন আগে ফুটপাতসহ বিভিন্ন স্থাপনার খোলা জায়গায় রাত যাপন করা এই মাদকাসক্তদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকটকালে এরা ফের অবস্থান নিয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তবে কেউ অপরাধ করলে তাৎক্ষণিক খুঁজে বের করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগ) মো. আবু আশরাফ সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালে কিছু ছিন্নমূল মানুষ ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকে। টহল পুলিশ সতর্ক অবস্থায় আছে। কোনো ছিনতাই এবং চুরির ঘটনা যেন না ঘটে তার জন্য টহল পুলিশকে আরও সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।’

গত রবিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদ থেকে ২০০ গজ পূর্বে হেয়ার রোডে রিকশায় আরোহীর বেশে ওঠা দুই ছিনতাইকারী রিকশাচালকের চোখে গুল ছিটিয়ে ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে রমনা থানার টহল পুলিশের হাতে আটক হয়। 

রিকশাচালক সুদীপ রায়হান জানান, গুলিস্তান থেকে মহাখালী যাওয়ার উদ্দেশে ৫০ টাকা ভাড়া মিটিয়ে ছিনতাইকারীরা রিকশায় ওঠে। হেয়ার রোডে এসে পেছন থেকে চোখে গুল ছিটিয়ে দেওয়ায় রিকশা থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। ফলে রিকশাও উল্টে যায়। এ সময় পুলিশ এসে ওই দুই ছিনতাইকারীকে আটক করে।  

পুলিশ জানায়, মো. আরিফ (২২) ও হৃদয় (১৮) নামের দুই ছিনতাইকারী ফুটপাতে রাত যাপন করে। এক সময় তারা সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলার কাজ করত। টোকাইও ছিল। কিন্তু করোনার কারণে এখন কাজ নেই তাদের। পেটের তাগিদে ছিনতাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রিকশাটি ছিনতাই করে বিক্রি করে দেওয়া। চালকের কাছে থাকা টাকাও ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল তারা।

রমনা থানার পরিদর্শক তদন্ত মো. জহিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আটকদের বিরুদ্ধে থানায় আগের কোনো মামলা নেই। তারা গুলিস্তানে স্টেডিয়াম, মাজার এলাকায় ফুটপাতে রাতযাপন করে। ময়লা ফেলার কাজ করে খেত তারা। করোনার কারণে কাজ বন্ধ থাকায় এ পথ বেছে নিয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। তারা আরও এ ধরনের ছিনতাই করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণত রিকশাচালকের কাছ থেকে টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেয় এরা। 

করোনার কারণে এর আগেও রাজধানীতে ছিন্নমূল মানুষ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করেছে। গত ৭ এপ্রিল ভোরে রাজধানীর মগবাজার আউটার সার্কুলার রোডে খুন হন রানা নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব ভাসমান এক ব্যক্তি। তার গলায় গুরুতর জখম ছিল। শরীর ছিল রক্তাক্ত। সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে খুনের সঙ্গে জড়িত রিপন (২১) নামে এক ব্যক্তি, সেও ছিন্নমূল। তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, নেশার টানেই এই হত্যাকাণ্ড। মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে একসঙ্গে ঘুমায়, একসঙ্গে নেশা করত তারা। তারা দুজনই ভাঙ্গারির টোকাই। রানার কাছ থেকে বেশ কিছুদিন আগে ১০০ টাকা ধার নেয় রিপন। ঘটনার দিন ভোররাতে নেশার টানে রিপনের কাছে পাওনা টাকা চায় রানা। এ নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে বিবাদ হয়। একপর্যায়ে রাস্তার পাশে থাকা টিউবলাইট দিয়ে রানার গলায় আঘাত করে রিপন। এতে গুরুতর আহত হয় রানা। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হতে থাকে। ভোরে টহল পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের ফুটপাতে দেখা গেছে ছিন্নমূল বা ভাসমান মানুষের অবস্থান। এদের অনেকেই দিনের বেলা মরার মতো পড়ে ঘুমায়। গতকালও বাংলামোটর, মগবাজার, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন সড়কে এদের দেখা গেছে। মূলত সন্ধ্যা নামার পর এদের উপস্থিতি বাড়ে। ফুটপাতে কাপড় বিছিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয় এরা।

ডিএমপির রমনা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার শেখ মোহাম্মদ শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার সড়ক ও ফ্লাইওভারের নিচে বাস করা ভাসমান মানুষের বেশিরভাগই মাদকাসক্ত। এরা একটা সিগারেটের জন্যও মানুষ খুন করতে পারে। কিছুদিন আগে এই মাদকাসক্তদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকটের সময় এরা ফের রাস্তায় অবস্থান নিয়েছে। এদের অনেকেই গভীর রাতে নানা অপকর্মে জড়াচ্ছে। এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।’