বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত ব্যাংকের : বিএবি

আগামী দেড় বছরের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও ১৫ শতাংশ বেতনভাতা কমানোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর পরামর্শ বাস্তবায়নের বিষয়টি সমালোচনার মুখে ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়েছে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। বিএবি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এ কথা জানিয়েছেন।

ব্যাংকারদের বেতন কমানোসহ স্থায়ী সম্পদ ক্রয় বন্ধ রাখা, নতুন শাখা খোলার প্রক্রিয়া বন্ধ করাসহ ব্যাংকের খরচ কমানোর জন্য ১৩ পরামর্শ দিয়ে গত ১৪ জুন ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠায় বিএবি। যদিও এমন পরামর্শে ব্যাংক খাতে সমালোচনার জন্ম নেয়। ব্যাংকাররা অভিযোগ করেন, ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার হচ্ছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের। বিএবি এমন পরামর্শ দিয়ে বেতন কমাতে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদকে প্ররোচিত করছে।

বিএবি নেতারা জানিয়েছেন, ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদ ৯ শতাংশ নামিয়ে আনায় ব্যাংকের আয় কমে গেছে। এছাড়া করোনার কারণে ঋণের কিস্তি আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলো বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই না করে বেতন কমানোসহ বিভিন্নভাবে ব্যয়সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে ব্যাংকগুলো। বিএবির সদস্যরাও এমন পদক্ষেপে সম্মতি জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।

গতকাল এ বিষয়ে বিএবি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা কোনো সার্কুলার বা প্রস্তাব নয়। কোনো সিদ্ধান্তও জানাইনি আমরা। আর্থিক খাতে বর্তমানে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে টিকে থাকতে হলে ব্যাংকগুলো হয়তো খরচ কমাবে। কোনো কোনো ব্যাংক হয়তো জনবলের খরচ কমাবে, কোনো ব্যাংক হয়তো অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় ব্যয় কমাবে। যে যেভাবে পারে সেভাবে ব্যয় কমাবে। ব্যাংকের মূল আয় হচ্ছে সুদ থেকে। কিন্তু ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনায় ব্যাংকগুলোর আয় কমে গেছে। এর মধ্যে করোনা পরিস্থিতির কারণে ঋণ ও সুদ আদায় বন্ধ থাকায় ব্যাংকগুলোর আয় একেবারেই নেই। যেখানে কোনো আয় নেই, সেখানে কীভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেব। এখন কি গ্রাহকের আমানত থেকে আমরা বেতনভাতা বহন করব।

নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, করোনার কারণে ঋণের টাকা ফেরত আসছে না। এর মধ্যে ঋণের কিস্তি না দিয়ে কাউকে খেলাপি করা যাবে না। এটি জুন পর্যন্ত ছিল, যা এখন সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি, কিস্তি না দিলে খেলাপি না করার সুবিধা ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ কারণে ব্যবসা আরও খারাপ হয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে ব্যয় কমানোর খাত নিয়ে আমরা ব্যাংকমালিকরা আলোচনা করেছিলাম, যার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি এসেছে। ইতিমধ্যেই ব্র্যাক, সিটি, এবিসহ কয়েকটি ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কমিয়েছে। আমরাও সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ৪০ হাজার টাকার ওপরে যাদের বেতন তাদের ১৫ শতাংশ কমানো হবে। ছাঁটাইয়ের চেয়ে বেতন কমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তখন আবার বেতন কাঠামো ঠিক করা হবে।

ব্যাংকগুলোকে পাঠানো বিএবির ওই চিঠিতে বলা হয়, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব গ্রেডের যেসব কর্মকর্তা ও নির্বাহীর মাসিক গ্রস বেতন ৪০ হাজার টাকার বেশি তাদের সবার ১৫ শতাংশ কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এ সময়ে পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট ও ইনসেনটিভ বন্ধ রাখা। ব্যাংকের চলমান নিয়োগসহ সব নিয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। নতুন শাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা এবং সাব-ব্রাঞ্চ খোলা যাবে না। সব ধরনের স্থায়ী সম্পদ কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। এখন থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রিন্ট ও অনলাইন পত্রিকা এবং টেলিভিশনে সব ধরনের বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখতে হবে।

সব বিদেশি ট্যুর বন্ধ রাখা পাশাপাশি স্থানীয় ও বিদেশে প্রশিক্ষণ বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে বিএবির চিঠিতে। এছাড়া সব ধরনের সিএসআর, ডোনেশন, চ্যারিটি বন্ধ রাখা, সব গ্রাহক ‘গেট টুগেদার’ বন্ধ রাখা; অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ‘গেট টুগেদার’ ও ম্যানেজার কনফারেন্স বন্ধ থাকবে। প্রয়োজনে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে করতে হবে। বড় ধরনের ব্যয় যেমন তথ্য প্রযুক্তিবিষয়ক, সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার কেনা আপাতত সীমিত পর্যায়ে নামিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে অন্যসব ব্যয় সীমিত পর্যায়ে রাখতে হবে। কর্মী ছাঁটাই না করে ব্যাংক সচল রাখার জন্য এসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেতন কমাতে হবে। এ বিষয়ে বিএবির সব সদস্যই একমত। এখন কে কত শতাংশ কমাবে সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা হচ্ছে। এটা না করলে আমাদের ব্যাংক তো চলবে না। কারণ যেভাবে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে তাতে করে ব্যাংকগুলোর আয়ে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের কারণে এখন কোনো আয় নেই বললেই চলে।